স্বামীর নির্যাতনে স্ত্রীর মৃত্যু
‘আমার বাবাও নাই আম্মুও নাই’
Advertisement
ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। মায়ের নির্মম মৃত্যুর পর কারাগারে বাবা। মা-বাবা ছাড়া দুই শিশু সাফওয়ান শিকদার ও তাসফিয়া শিকদারের পৃথিবী এখন অন্ধকার -সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘আম্মু যামু, আম্মুর কাছে যামু। আম্মু কই?’ রাত হলেই মায়ের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়ে পাঁচ বছরের সাফওয়ান শিকদার ও চার বছরের তাসফিয়া শিকদার। মায়ের শূন্যতার মমার্থ যে কত গভীর সেটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না দুই সন্তান। শুধু জানে, যাকে ঘিরে তাদের ছোট্ট পৃথিবী ছিল, তাদের সেই মা হারিয়ে গেছে।
কখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকছে তারা। আবার কখনো নানিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘আমার বাবাও নাই, আম্মুও নাই। এখন আমরা কোথায় যামু?’
বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে যুগান্তরের কাছে কথাগুলো বলছিলেন নিহত মুক্তার ইসলাম মাওয়ার মা মিনারা বেগম। মেয়েকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন তার সামনে আরও বড় দুশ্চিন্তা-অসুস্থ শরীর নিয়ে কীভাবে দুই নাতি-নাতনিকে মানুষ করবেন। মিনারা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাগো স্কুলে ভর্তি করামু কীভাবে? ওদের জন্মনিবন্ধনও বানানো হয়নি। ওর বাবা স্কুলে ভর্তি করায় নাই। আমার মাইয়াডার ভোটার আইডি কার্ডও করায় নাই। এখন আমি নিজেই অসুস্থ, চলতে পারি না। এই বাচ্চাগো কেমনে রাখমু, কেমনে পালমু-আল্লাহ জানে।’
গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতের একটি বাসা থেকে মুক্তার ইসলাম মাওয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী সোহেল শিকদারের নির্যাতনের শিকার ছিলেন মুক্তা। লাশের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মুক্তার ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন। মামলায় চারজনকে আসামি করা হয়েছে। স্বামী সোহেলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
নিহতের ভাই তারেক হাওলাদার বলেন, প্রায় সাড়ে সাত বছর আগে পারিবারিকভাবে সোহেলের সঙ্গে মুক্তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই টুকটাক ঝগড়া-বিবাদ ছিল। তবে মুক্তা সবসময় সব কথা পরিবারের কাছে বলতেন না। তিনি ছিলেন অনেকটা চুপচাপ স্বভাবের। তারেক বলেন, কোরবানির ঈদের সময়ও তার বোনকে মারধরের ঘটনা ঘটে। ওই সময় তাদের মা সামনে ছিলেন। পরে মায়ের দেওয়া একটি চাদর শ্বশুরবাড়ির লোকজন কয়েল দিয়ে পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে মুক্তা তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করলে মায়ের সামনে মুক্তাকে মারধর করে স্বামী সোহেল। ঘটনার আগের রাতের কথাও তুলে ধরেন তারেক।
তিনি বলেন, ২ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে সোহেল ফোন করে তাকে বলেন, ‘তোমার বোনরে নিয়া যাইও।’ কী হয়েছে জানতে চাইলেও সোহেল বিস্তারিত কিছু বলেননি তারেককে। পরে মুক্তার সঙ্গে কথা বলেও তিনি কোনো বড় সমস্যার কথা জানতে পারেননি।
তারেকের ভাষ্য, রাত ১২টার দিকে তার মোবাইলে কয়েকটি ভিডিও আসে।
ভিডিওতে মুক্তাকে মারধরের দৃশ্য দেখা যায় এবং তিনি (মুক্তা) কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমি কিছু করি নাই।’ ভিডিও দেখে পরদিন সকালে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু পথেই জানতে পারেন, তার বোন আর বেঁচে নেই। তারেক বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম ঢাকায় গিয়ে বোনরে নিয়ে আসব। কিন্তু যাওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। বোনের দুইটা বাচ্চা এখন আমার সামনে। ওরা যখন কয়, ‘আমার বাবাও নাই, আম্মুও নাই’ তখন কী উত্তর দেব, আমি জানি না।’
পরিবারের অভিযোগ, মুক্তাকে যৌতুক ও দাম্পত্য কলহের জেরে কয়েক মাস ধরে নির্যাতন করা হচ্ছিল। স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল বলে দাবি পরিবারের।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব ভৌমিক বলেন, সোহেল পুলিশকে খবর দিলে বাসার মেঝে থেকে মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। সোহেলের দাবি, মুক্তা সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন।

