ককরোচদের ঠেকাতে ব্যাপক প্রস্তুতি
দিল্লি যেন দুর্গ, নামানো হচ্ছে ২৩ হাজার সেনা
‘দিল্লি চলো’ যাত্রা কাল, যোগ দিয়েছেন ধ্রুব রাঠি * তৃতীয় দিনের মতো কংগ্রেসের বিক্ষোভ ধরপাকড়
Advertisement
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে বৃহস্পতিবার বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে আন্দোলনে ইনফ্লুয়েন্সার ধ্রুব রাঠি, অভিনেতা প্রকাশ রাজ ও সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ অন্যরা -এএফপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ককরোচদের আন্দোলন যত এগোচ্ছে, ততই যেন অস্বস্তি বাড়ছে দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রতিবাদ এখন আর শুধু কয়েকটি ছাত্র সংগঠন কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অভিনেতা প্রকাশ রাজ, জনপ্রিয় ইউটিউবার ও অধিকারকর্মী ধ্রুব রাঠি থেকে শুরু করে দেশের বিশিষ্ট লেখক, সমাজকর্মী, শিক্ষাবিদ ও আন্দোলনকর্মীদের একাংশের সমর্থন এ আন্দোলনের পরিসরকে আরও বড় করে তুলেছে। বৃহস্পতিবার বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত সেই বার্তাই দিয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়-আন্দোলনের অভিঘাত যে দিল্লির সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, তার দৃশ্যমান প্রমাণ মিলছে রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেই। ১০ অক্টোবর ককরোচ জনতা পার্টির বড় কর্মসূচি (দিল্লি চলো) সামনে রেখে দিল্লিতে ২২১ কোম্পানি আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। সংখ্যার হিসাবে প্রায় ২৩ হাজার সদস্য। জম্মু ও কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে আধা-সামরিক বাহিনী আনা হচ্ছে। পাশাপাশি দিল্লি পুলিশও বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করছে। শুধু তাই নয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। তিনি আগে থেকেই জেড প্লাস নিরাপত্তা পেতেন। নতুন করে তার বাসভবন এবং নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তিকে সরানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাকে ঘিরেই এখন আরও শক্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হচ্ছে সরকারকে।
এ পরিস্থিতিকেই ককরোচ আন্দোলনের শক্তির অন্যতম প্রমাণ হিসাবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা। কারণ, কয়েক মাস আগেও এ তরুণদের আন্দোলনকে নিছক সামাজিকমাধ্যমের ক্ষোভ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ঘটেছে। এবার একই শক্তি সরাসরি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার দিকে প্রশ্ন ছুড়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা ও ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে আন্দোলন এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে।
বৃহস্পতিবার বেঙ্গালুরুর মঞ্চে প্রকাশ রাজ এবং ধ্রুব রাঠির উপস্থিতি সেই আন্দোলনকে আরও দৃশ্যমান করেছে। ধ্রুব রাঠি বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের তথ্য তুলে ধরে ভোটার তালিকায় জীবিত মানুষকে মৃত বা অনুপস্থিত দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ করেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি ‘ভোট চোর’ বললে সমবেত জনতা ‘গদি ছোড়’ বলে আওয়াজ তোলেন। তিনি বলেন, যারা জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে চাইছে (বিজেপি) তারা ‘দেশদ্রোহী’। তাকে পদত্যাগ করতেই হবে। প্রকাশ রাজের বক্তব্যও ছিল সরাসরি। তার অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণের ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বেঙ্গালুরুর সভায় ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি আরও জোরালো করেন। এ আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে বিরোধী শিবিরের অবস্থান থেকেও। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াংকা গান্ধীসহ বিরোধী দলের একাধিক নেতা টানা কয়েক দিন ধরে দিল্লির রাজপথে নেমেছেন। তাদের বারবার আটক করা হয়েছে। বুধবারও রাহুল ও প্রিয়াংকাকে পুলিশ আটক করে। বৃহস্পতিবারও রাজধানীতে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। রাজঘাটে জমায়েত ঠেকাতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করেছে দিল্লি পুলিশ। আর এখানেই ককরোচ আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশিষ্ট লেখিকা অরুন্ধতী রায় সম্প্রতি ককরোচ আন্দোলন নিয়ে সরাসরি বলেন, এ আন্দোলনের পর এতদিন যারা নরেন্দ্র মোদির সরকারের চাপে ভয়ে চুপ করে ছিলেন, তাদের অনেকেই ফের প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন। তার বক্তব্য, এ আন্দোলন ক্ষমতার ভয় ভেঙে দিয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি বলেন, দেশে কিছু একটা পুঞ্জীভূত হচ্ছে এবং তার মনে হচ্ছে সরকার এখন চাপে রয়েছে।
অরুন্ধতী রায়ের এ মন্তব্যকে নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। কারণ, ককরোচ আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মীদের তালিকাও ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। শিক্ষাবিদ জয়তী ঘোষ, তনিকা সরকার, নিবেদিতা মেনন, অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ, চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় কাক, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও রত্না পাঠক শাহসহ বহু বিশিষ্ট নাগরিক আগের পর্যায়েই ককরোচ আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। লাদাখের পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকও এ আন্দোলনের সঙ্গে আগেই প্রকাশ্যে সংহতি জানান। এবার সেই লড়াইয়ের লক্ষ্য নির্বাচন ব্যবস্থা। আর সেখানেই বিজেপি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জটা অন্য রকম। কারণ, শিক্ষা বা নিয়োগের প্রশ্নের সঙ্গে ভোটার তালিকা এবং ভোটাধিকার সরাসরি গণতন্ত্রের প্রশ্নকে যুক্ত করে। ফলে ককরোচ আন্দোলন যদি তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে বিরোধী রাজনীতি, নাগরিক সমাজ এবং বুদ্ধিজীবীদের সমর্থনকে দীর্ঘমেয়াদে এক জায়গায় আনতে পারে, তাহলে চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিরোধীদের তৃতীয় দিনের বিক্ষোভ আটকাল পুলিশ : প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির রাজপথে টানা তৃতীয় দিনেও বিক্ষোভ করল বিরোধী জোট। মঙ্গলবার সংসদ থেকে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের দিকে মিছিল, বুধবার যন্তর মন্তরের দিকে অভিযান, আর বৃহস্পতিবার মধ্যাহ্নভোজের পর রাজঘাটের দিকে যাত্রা। প্রতিদিনই নতুন কর্মসূচি নিয়ে পথে নামছেন বিরোধী সংসদ-সদস্যরা। আর প্রতিদিনই তাদের পথ আটকে দিচ্ছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজের পর রাহুল গান্ধী, প্রিয়াংকা গান্ধীসহ বিরোধী সাংসদরা বাসে রাজঘাটের দিকে রওয়ানা দেন। রাজঘাটের কাছে পৌঁছানোর আগেই ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয় পুলিশ। পরে সেখানে একাধিক বিরোধী নেতা ও কর্মীকে আটক করা হয়।
