Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

পুতুল থেকে দেশমাতা হয়ে ওঠার গল্প

Advertisement

Icon

ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পুতুল থেকে দেশমাতা হয়ে ওঠার গল্প

ফাইল ছবি

Advertisement

বাংলাদেশের আকাশ কদিন থেকেই ধূসর। সূর্যের দেখা নেই চার-পাঁচ দিন। এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কোণার বেডটা আলো-আঁধারির মায়ার খেলায় এক অপার্থিব পবিত্রতায় জড়ানো। শৈশব থেকে প্রৌঢ়তার সব স্মৃতি যেন আজ প্রকাশিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অস্থির। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো আজ সকাল থেকেই বারবার এলোমেলো। মনিটরের অ্যালার্ম বারবার জানান দিচ্ছে, সময় আর বেশি নেই। শীতের তীব্রতায় অসার করা ভোঁতা অনুভূতিগুলো বুঝতেও পারছে না, কী মর্মান্তিক সত্যি গুটিসুটি মেরে এগিয়ে আসছে এক ভয়ানক খবর হয়ে।

দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ির তৈয়বা ভিলার সামনের ছোট্ট সবুজ লনে এক্কা-দোক্কা খেলা কিশোরী পুতুলের জীবনের বর্ণিল আটটা দশক পেরিয়ে আজ অসার শুয়ে আইসিইউর কোণার বিছানায়।

দিনাজপুরে কর্মরত কেতাদুরস্ত ক্যাপ্টেন জিয়ার চোখে এমন গভীরভাবে আটকে যাবেন কে জানত। স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পেরোতেই বন্দি লাল বেনারসিতে।

১৯৬৫ তে যুদ্ধ শুরু ভারত-পাকিস্তানের। কিসের যুদ্ধ আর কেনই বা যুদ্ধ, সেটা তেমন না বুঝলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কোয়ার্টারে যুদ্ধের পুরোটা সময় একাকী কাটিয়েছেন যুদ্ধে যাওয়া স্বামীর মঙ্গল কামনায়।

ভীষণ রাশভারি, স্বল্পভাষী স্বামী, ভালোবাসার উচ্চারণে প্রগলভ নয়, কিন্তু ভীষণ অন্তর ছোঁয়া। সংসারে নেই কোনো বাহুল্য আর প্রাচুর্যের ছোঁয়া, শুধু আছে সততা আর ভালোবাসার গর্ব।

দিনাজপুরের ছোট্ট বাড়িটা বারবার হাতছানি দেয় হাজার মাইল দূর থেকে। আকাঙ্ক্ষার বদলির খবরে আকাশছোঁয়া আনন্দ নিয়ে হঠাৎই জন্মভূমিতে ফেরত। ততদিনে কোলজোড়া তারেক-আদরের ছোট্ট পিনো আর পরপরই আরেক ছোট্ট সোনা আরাফাত, দুটোই স্বামীর দেওয়া পছন্দের নাম।

সবাই তখন চট্টগ্রামে, একাত্তরের শুরু দেশজুড়ে আন্দোলন দিয়ে। স্বামী তখন তরুণ মেজর, সারা দেশের মতো বাড়ির আবহাওয়াও বেজায় থমথমে।

পঁচিশে মার্চের বিকালে তখন, হন্তদন্ত হয়ে বাসায় স্বামীর খোঁজে তার ইউনিটের এক সৈনিক। বাসায় নেই শুনে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে হঠাৎই কৌতূহলী প্রশ্ন, কী হয়েছে? ‘ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি অফিসার এসেছে আমাদের সব অস্ত্র নিয়ে যেতে, সেটাই জানাতে।’ এসব বিষয়ে কোনো দিনই নাক না গলানো খালেদা হঠাৎই নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন, ‘স্যারকে না বলে ওগুলো দেবেন না।’ সেদিন পাকিস্তানিরা অস্ত্রগুলো নিতে পারেনি।

সে রাতে স্বামী ঘরে ফেরেননি। খবর পেলেন, সারা দেশে পাকিস্তানিরা আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরীহ দেশবাসীর ওপর, শুরু হয়েছে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। শুনলেন রেজিমেন্টে বিদ্রোহ হয়েছে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারই স্বামী।

পরদিন রেডিওতে শুনলেন তার স্বামী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এত কাছে থেকেও জানতে পারেননি যে মানুষটা এমন কিছু একটা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একদিকে গর্ব হচ্ছে অকল্পনীয়, আবার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ে-আতঙ্কে শিউরে উঠছেন। এখন আর ফেরার পথ নেই, পরাজয় মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। হালকা অভিমান মনের কোণায় এলেও সামাল দিলেন। একবার বলে গেলে কী হতো? তারেক-আরাফাত তখন গভীর ঘুমে। মাসের শেষ, হাতে তেমন টাকাও নেই। খবর পাচ্ছিলেন, স্বামীর বাহিনী কালুরঘাটে লড়ছেন শত্রুর বিরুদ্ধে।

মেজর জিয়া তখন সারা দেশে সবচেয়ে পরিচিত নাম, আর সঙ্গে সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষ হলো এ তিনজন। যাদের দুজনের বিপদ কাকে বলে বোঝার ক্ষমতাই নেই আর আরেক তরুণী সেই দুই ছোট্ট শিশুদের নিয়ে পরিজন থেকে শত মাইল দূরে। আর এটাও বুঝতে পারলেন, একমাত্র দেশ স্বাধীন হলেই স্বামীর দেখা পাবেন, নইলে আর কোনোদিনই নয়।

শুরু হলো গন্তব্যহীন অজানা যাত্রার, আজ এখানে তো, কাল আরেক জায়গায়। এভাবে আর কতদিন, জুলাইয়ে একদিন ধরা পড়লেন পাকিস্তানিদের হাতে, সবাই একসঙ্গে। ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি রইলেন দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে ডিসেম্বরের বিজয় অবধি।

১৬ ডিসেম্বরে এলো সেই বহু আকাঙ্ক্ষার বিজয়, ঘরে ফিরলেন জেড ফোর্স অধিনায়ক জিয়া। কষ্টের নয় মাস তাদের কেমন কেটেছে সেটাও বলার সময় যেমন হলো না, তেমনি শোনাও হলো না যুদ্ধের বীরত্বগাথা। তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের মিটিং, কামালপুরের যুদ্ধ, মুক্তাঞ্চল রৌমারী, সিলেটের সালুটিকর আর শমসের নগরের যুদ্ধ, বিজয়ের দুই দিন আগে সিলেট মুক্ত করার গল্প, যমুনার চর-চা বাগানের খোলা আকাশের নিচে রাতের পর রাত কাটানোর গল্পগুলোও শোনা হলো না আসল বীরের নিজ কণ্ঠে।

যোগ্যতা আর প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও সেনাপ্রধান না হওয়ার কোনো আক্ষেপ শুনলেন না স্বামীর কাছে। কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় এলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধানের স্ত্রী হয়ে। সময় গড়াল নিজের মতো, দেশে তখন নিদারুণ দুর্ভিক্ষ, প্রতিদিনই অনাহারে মৃত্যুর খবর আসে। চারদিকে একটা পরিবর্তনের গুমোট বাতাবরণ। ১৯৭৫-এর আগস্ট-নভেম্বর দেশকে এক নতুন ক্রান্তিকালে দাঁড় করিয়ে দিল। স্বামীর কাছে শেষ আগস্টে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব এলেও নভেম্বরই কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো পরিবার গৃহবন্দি হলো খালেদ মোশাররফ বাহিনীর হাতে। পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক অনিশ্চিত দিন গণনা। হঠাৎই দেখলেন সৈনিকদের গগনবিদারী উল্লাসে আর বিজয় আনন্দে স্বামীকে একরকম কাঁধে করে সৈনিক-জনতার নেতৃত্বের আসনে। একাত্তরের মতো আরেক ক্রান্তিলগ্নে জাতির দিশারি জিয়াউর রহমান। এরপর সেনাপ্রধানের স্ত্রী, রাষ্ট্রপতির স্ত্রী, তাতে কী? সব সময়ই রইলেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। স্বামীর সময় কাটে দেশের কাজে, অসম্ভব জনপ্রিয় স্বামীর গল্পগাথা মানুষের মুখে মুখে ফেরে, কিন্তু নিজে সেটার অংশ হতে পারেন না। আটপৌর গৃহবধূর জীবন কাটে সন্তানদের নিয়ে। রাষ্ট্রপতির খাবার টেবিল আলোকিত হয় রেশনের মোটা চালের বিকর্ষক গন্ধ, সবজি-ডাল, ছোট মাছ আর কদাপি মুরগির ঝোলে। ছেলেদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় বাবার পুরোনো শার্ট-প্যান্ট নিজেদের মাপে মানানসই করে বানিয়ে।

মাঝে-মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে বাধ্য হয়ে জনসমক্ষে যেতে হয়, বরাবরের মতো সলজ্জ নিরাভরণ, কিন্তু সেই স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের অপরূপ ঔজ্জ্বল্যের দ্যুতি ছাপিয়ে যায় সবকিছু।

৮১ সালের ২৯ মে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন, রাতে জিয়া ফোনে জানিয়েছেন ফিরছেন সকালেই। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের সকাল আর কোনো দিনই এলো না। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির সেই রাতে তাদের গভীর ঘুমের মাঝে সবার অজান্তেই ঘটে গেল হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হলেন জিয়া। শুরু হলো অনিশ্চিত দীর্ঘ যাত্রাপথ। আঘাতে আঘাতে ততদিনে একাকী পৃথিবীর পথচলা তিনি রপ্ত করে ফেলেছেন।

স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তখন বিপর্যস্ত। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে এরশাদ ক্ষমতায়; দলের শীর্ষ নেতারা একে একে দল ছাড়ছেন। এমনি অনিশ্চিত দিনে নেতাকর্মীদের ক্রমাগত চাপ এড়াতে পারলেন না। হাল ধরলেন দলের। অনভিজ্ঞ এক আটপৌরে গৃহবধূর জন্য রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে রইলেন কর্মীদের সারিতে দাঁড়িয়ে। পুলিশের লাঠির আঘাত, গ্রেফতার কিছুই টলাতে পারল না। বিভিন্ন প্রলোভনে আন্দোলনের সহযাত্রী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন পথভ্রষ্ট, তখন সবার অজান্তেই আপসহীন শব্দটা তার নামের সমার্থক হয়ে উঠল। আর সেটা যখন তার একক পরিচিতি হয়ে উঠল, তখন সেটাতে বিশ্বস্ত থাকতে সর্বতোভাবে রইলেন আপসহীন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে তখন বিজয়ী জনতা আর বলতে গেলে অপ্রত্যাশিত বিজয় তার দলের। জীবনে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাঁচটি আসনেই জয়ী, সেটাও আবার দেশের বিভিন্ন আসন থেকে। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১৮টি আসনের সবকটিতেই নিরঙ্কুশ শতভাগ জয়। এ এমন এক কীর্তি, যা স্পর্শ করে সাধ্য কার।

মুখে দেওয়া কথার প্রতিশ্রুতি রাখলেন কোনো টালবাহানা ছাড়া। যে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা তাকে দিতে পারত বারবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার নিশ্চিত সুযোগ, রাজনীতিতে নীতির দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত করে নির্দ্বিধায় মেনে নিলেন আপাত চ্যালেঞ্জিং সংসদীয় ব্যবস্থা। পরের সুযোগে আরও জনমুখী সিদ্ধান্তে অবাধ আর সুষ্ঠু ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রবর্তন করলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, অধিক স্বচ্ছতায় নির্বাচিত হয়েও পদত্যাগ করলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

পরের মেয়াদে নারীশিক্ষা সহজতর করতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মেয়েদের জন্য সেটা করলেন সম্পূর্ণ অবৈতনিক।

এরপর এলো ভয়াবহ এক-এগারো। তছনছ হলো তার দল। বন্দি হলেন অন্যায়ভাবে, দুই সন্তানের ওপর চালানো সীমাহীন নির্যাতনের সাক্ষী হলেন পরম ধৈর্যে। এর মাঝে মাকে হারালেন, নির্যাতনে প্রায় পঙ্গুত্বের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া জ্যেষ্ঠপুত্র তারেককে দেখলেন নির্বাসিত হতে।

মঞ্চস্থ হতে শুরু করল প্রহসনের পরিকল্পিত নাটক একে একে। ভোটারবিহীন নির্বাচন, নিশিরাতের নির্বাচন আর সবশেষের আমি ডামির নির্বাচন ২৪-এ।

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর, মুখোমুখি হলেন এক অমানবিক হিংসার, পরশ্রীকাতরতায় দগ্ধ এক স্বৈরিণী তার বিষাক্ত নিশ্বাসে তাকে চরম অসম্মানজনকভাবে জগতের সব অনাচারকে লজ্জায় ফেলে সৃষ্টি করল জিঘাংসার নতুন উদাহরণ। স্বামী-সন্তান আর দীর্ঘ সংসারের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হলেন অমানবিকভাবে। দরজা ভেঙে শুধু বলপূর্বক উচ্ছেদেই থেমে থাকল না, কদর্য মানসিকতায় তার চরিত্র হননে বাথরুমে মদের বোতল সাজিয়ে পৈশাচিকতার ষোলোকলা পূর্ণ করল তারা।

৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ হাসিনার রোষানলে পড়লেন মরণঘাতী আক্রোশে। সম্পূর্ণ সাজানো মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ হলেন নাজিমুদ্দিন রোডের নির্জন কারাবাসে। পরিত্যক্ত, অস্বাস্থ্যকর আর জনমানবহীন সেই নির্জন কারাবাসের একমাত্র সঙ্গী পরিচারিকা ফাতেমা। তার সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন আহার্য, সময় আর প্রক্ষালন কক্ষ। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক রাষ্ট্রপতি আর সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রীর কী নির্মম জীবনযাপন। কারাবাসে গেলেন সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ আর ফিরলেন লিভারের দুরারোগ্য অসুখ নিয়ে।

বছরের পর বছর রইলেন চিকিৎসাবঞ্চিত। বারবার শিকার হলেন অশ্লীল আর কদর্য বাক্যবাণে, একবার-দুবার নয়, বারবার। দেশের বরেণ্য চিকিৎসকরা সেবা দিলেন সাধ্যমতো, নিজেদের জ্ঞান আর শ্রদ্ধা উজাড় করে। স্বৈরাচারী হাসিনা আর তার ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ নির্যাতন, মামলা, হামলা, গুম, খুন আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মহোৎসব চালিয়ে নিজেদের যখন অজেয় ভাবতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই বিস্ফোরণ হলো আগ্নেয়গিরির, সতের বছর ধরে পুঞ্জীভূত লাভা প্রচণ্ড অগ্নুৎপাতে উদ্গীরণ করল তার সব বঞ্চনা, ক্ষোভ আর ক্রোধকে একীভূত করে। এ সুদীর্ঘ সময় তার অবর্তমানে সুদূর প্রবাস থেকে বিচক্ষণতার সঙ্গে দলের হাল ধরে আন্দোলনকে সাফল্য দিতে প্রধান সেনাপতির ভূমিকা রাখলেন পুত্র তারেক রহমান। স্বৈরাচারী হাসিনা জনরোষ আর প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে গেল তার আশ্রয়দাতার দেশে। সব অহংকার বিচূর্ণ হলো এক পলকে।

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তখন আর শুধু দেশনেত্রী নন, কৃতজ্ঞ জাতির সামনে তিনি তখন তাদের অভিভাবক-দেশমাতা।

বিজয়ী বাংলাদেশে তিনি মুক্ত হলেন সব অন্যায় মামলা থেকে। প্রথমবারের মতো বিদেশে গেলেন উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায়, ততক্ষণে দেরি হয়েছে অনেক। কাতারের আমিরের সৌজন্যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তাকে হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পেলেন বহু আকাঙ্ক্ষার পুত্রসান্নিধ্য, সঙ্গে যুক্ত হলো পুত্রবধূর সেবা আর নাতনিদের মধুর শাসন। ফিরলেন দেশে লিভার প্রতিস্থাপন, ততদিনে আর নিরাপদ নয় তার জন্য। ফিরলেন দেশে, কিন্তু স্বৈরাচারের দেওয়া নিষ্ঠুর অসুস্থতা তাকে বারবার টেনে নিল হাসপাতালের শয্যায়। চিকিৎসকদের নিষেধ অমান্য করে এ বছরের ২১ নভেম্বর গেলেন সশস্ত্র বাহিনী দিবসে, তার সেই চিরচেনা অঙ্গনের হাতছানি উপেক্ষা না করতে পেরে। গুণগ্রাহীদের শ্রদ্ধায় বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলেন ভিড়, নিষেধের মাস্ক নাক-মুখ থেকে সরে গেছে ততক্ষণে। বিদায় বেলায় বাহিনী প্রধানদের স্মরণ করিয়ে দিলেন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তাদের করণীয়।

বাড়ি ফিরে আক্রান্ত হলেন ফুসফুসের সংক্রমণে। ২৩ তারিখে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট আবারও টেনে নিল হাসপাতালে। এবারের যুদ্ধ একটু অন্যরকম, একের পর এক জটিলতাগুলো তার বাড়ি ফেরা বিলম্বিত করছিল। চিকিৎসকরা যখন প্রায় হাল ছেড়েছেন, ঠিক তখনই সারা দেশের আপামর জনগণ তাদের পরমাত্মীয়ের জন্য শুরু করলেন ক্লান্তিহীন দোয়া, সদয় হলেন মহান আল্লাহ, সংকট কাটতে লাগল একে একে। এদিকে পুত্রের দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো ২৫ ডিসেম্বর। অবস্থার উন্নতি-অবনতি তখন সময়ের সুতায় বাঁধা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব ব্যাখ্যা আর অভিজ্ঞতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তার হৃৎপিণ্ড দিব্যি জানিয়ে দিল ওটাও আপসহীন। পুত্রসান্নিধ্যের প্রতীক্ষার শেষ হলো ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। পুত্রের হাতের স্পর্শে মাতৃভক্তির অনুভূতি সঞ্চারিত হলো সন্তুষ্ট মায়ের হাসিতে।

আপসহীন বলে বলে দেশের মানুষ সামান্যতম বিচ্যুতির ব্যাপারটাও অসম্ভব করে তুলেছিল তার জন্য। জীবনের কোনো পর্বেই আপসকামিতার লজ্জা তাকে আনত করেনি এতটুকুও।

কনকনে শীতের দীর্ঘ রাতও শেষ হয়ে আসছে, আলো ফুটলেই আরেক নতুন দিন-ডিসেম্বর ৩০। এভারকেয়ারের আইসিইউতে তখন হিমশীতল নীরবতা। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো ক্লান্তিতে তখন এলোমেলো। যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে, শক্ত করে ধরে রাখা পুত্রের হাতের স্পর্শ কেন জানি আস্তে আস্তে অনুভূতির দেওয়াল পেরিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূরে-অনেক দূরে। দূর থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজান-আর কুয়াশা ঘেরা ভোরে জিয়া উদ্যানে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা প্রিয়তমের পাশে নিশ্চিন্ত অনন্ত নিদ্রার আহ্বান, সেটাই বা উপেক্ষা করবেন কী করে। পরিজনদের প্রিয় মুখগুলো একটু পরেই বিষণ্নতর হবে তিনি জানেন। সঙ্গে এটাও জানেন, এখন তার প্রিয়জনের সংখ্যা নিযুত পেরিয়ে কোটির গুণিতক ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। দূর আকাশ থেকে তিনি দেখবেন, কনকনে শীতের তীব্রতা কমাতে আজ অকৃপণ সূর্য তার সবটুকু উষ্ণতা নিয়ে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়, তাকে শেষ বিদায় জানাতে জনতার স্রোত আজ ঢাকার কোন রাজপথ, এমনকি অলিগলিকেও অভিমানী রাখেনি এতটুকুও, প্রত্যেককে ভরিয়ে দিয়েছে কাণায় কাণায়, গুণমুগ্ধের অগণিত সংখ্যায়। শুধু ইতিহাস দিয়ে এর পরিমাপ অসম্ভব, নিছক কল্পনার নয়, রাজনীতি, সভ্যতা আর ত্যাগের এ এক জীবন্ত মহাকাব্য।

তার শেষ শয্যা এ মাটিতেই, কথা রেখেছেন দেশমাতা, এ দেশের বাইরে তার কোনো ঠিকানা নেই। মা আমাদের, তোমার শোধ আমাদের সাধ্যাতীত, শুধু উজাড় করা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা-এটুকুই যা দেওয়ার, আমাদের ভান্ডার শূন্য না-ও তার সবটুকু। আজ আর কিছুই চাই না আমাদের।

অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল : আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর: জিয়া-খালেদার উত্তরাধিকার ও তারেক রহমানের বার্তা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর: জিয়া-খালেদার উত্তরাধিকার ও তারেক রহমানের বার্তা

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান

খালেদা জিয়ার পাঠানো শুভেচ্ছা চিঠিটি আজও পরম যত্নে রেখেছেন ছাইফুল্লাহ

খালেদা জিয়ার পাঠানো শুভেচ্ছা চিঠিটি আজও পরম যত্নে রেখেছেন ছাইফুল্লাহ

বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দিন আজ

বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দিন আজ

‘আমরা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কোনো জাতিগোষ্ঠী নই’

‘আমরা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কোনো জাতিগোষ্ঠী নই’

বিএনপির ৩৪ বছরের রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

বিএনপির ৩৪ বছরের রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম