Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

পিতামাতার ভরণপোষণ : আইন ও নৈতিকতা

Advertisement

Icon

মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পিতামাতার ভরণপোষণ : আইন ও নৈতিকতা

সংগৃহীত ছবি

Advertisement

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের এক ফ্ল্যাটে একাকী বসবাসরত এক বৃদ্ধার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সামনে এসেছে। বৃদ্ধ ও অসহায় পিতামাতার ভরণপোষণ সন্তানের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে বলতে হয়, অনেক সন্তানই এ দায়িত্ব পালন করেন না। শিক্ষিতদের মধ্যে এ প্রবণতা একটু বেশি দেখা যায়। শিক্ষিত ও উপযুক্ত সন্তান থাকার পরও অনেক অসহায় বাবা-মাকে আশ্রয় নিতে দেখা যায় বৃদ্ধাশ্রমে। উপার্জনক্ষম সন্তান থাকা সত্ত্বেও বৃদ্ধ বয়সে পিতামাতাকে যদি বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাতে হয়, এর চেয়ে হৃদয়বিদারক ও নিষ্ঠুর আর কিছু হতে পারে না। প্রত্যেক সন্তানেরই উচিত বৃদ্ধ পিতামাতার দেখাশোনা ও ভরণপোষণ করা এবং তাদের সঙ্গ দেওয়া।

আমরা জানি, বৃদ্ধ বয়সে যাতে সন্তানের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার না হন, সেজন্য পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ গৃহীত হয়েছে। কোনো সন্তান যদি বৃদ্ধ পিতামাতাকে বাধ্য করে বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও বসবাস করতে অথবা কোনো সন্তান যদি পিতামাতার ভরণপোষণ না করে, তাহলে তারা ভরণপোষণের জন্য এ আইনের আশ্রয় নিয়ে তাদের অধিকার আদায় করতে পারেন।

পিতামাতার ভরণপোষণের আইনটি একটি জনকল্যাণকর আইন। এ আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যেহেতু সন্তান কর্তৃক পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়, সেহেতু আইনটি প্রণয়ন করা হলো। কোনো সন্তান যদি কোনো যুক্তিসংগত কারণে পিতামাতার ভরণপোষণ না করেন, তাহলে তারা ভরণপোষণের জন্য এ আইনের অধীনে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে তাদের অধিকার আদায় করতে পারবেন।

কোনো সন্তান পিতামাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও একত্রে বা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। প্রত্যেক সন্তানকেই তাদের পিতামাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে এবং চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। পিতামাতা একত্রে বা আলাদা বসবাস করলে প্রত্যেক সন্তানকে সাধ্যমতো তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। পিতামাতা যদি সন্তানের সঙ্গে বসবাস না করেন, তাহলে তারা নিজ নিজ উপার্জন থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ দেবে।

আইনটি শুধু পিতামাতার ভরণপোষণ বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এতে পিতামাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের ব্যাপারেও জোর দেওয়া হয়েছে। পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদিকে এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানিকে পিতামাতার মতো ভরণপোষণ দিতে হবে।

আইনে কেউ অপরাধ করলে তা অবশ্যই আমলযোগ্য। এ আইনের অধীনে করা মামলায় জামিনও পাওয়া যেতে পারে। মামলায় আপস মীমাংসারও সুযোগ রয়েছে। অপরাধের অভিযোগ দায়ের ও বিচার হবে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। অপরাধের লিখিত অভিযোগ পিতামাতাকেই করতে হবে। অন্যথায় আদালত তা গ্র্রহণ করবেন না। আদালত সংশ্লিষ্ট অভিযোগের আপস নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা মেম্বার বা কাউন্সিলর কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে প্রেরণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে তবেই নিষ্পত্তি করতে হবে এবং তখনই তা উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে।

আইনে ভরণপোষণ অর্থ-ক. খাওয়া-দাওয়া; খ. বস্ত্র; গ. চিকিৎসা; ঘ. বসবাসের সুযোগ-সুবিধা এবং সঙ্গ দেওয়া। এ আইনের ৩ ধারা মতে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে নিজেরা আলোচনা করে পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ধারায় আরও উল্লেখ আছে, সন্তানকে পিতামাতার সঙ্গে এবং একই স্থানে বসবাস করতে হবে। পিতামাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কোনো বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোনো স্থানে একত্রে বা আলাদা বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। প্রত্যেক সন্তানকে পিতামাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান ও পরিচর্যা করতে হবে। পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তান থেকে পৃথকভাবে বসবাস করলে সন্তানকে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। পিতামাতা সন্তানদের থেকে পৃথক বসবাস করলে সন্তান মাসিক বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, ক্ষেত্রমতে উভয়কে দিতে হবে।

এ আইনের ৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, সন্তান পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদিকে এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানিকে ভরণপোষণ করবে। এ আইনের ৫ ধারা মোতাবেক পিতামাতার ভরণপোষণ না করলে অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ৫(২) ধারা মোতাবেক, কোনো সন্তানের স্ত্রী বা ক্ষেত্রমতে স্বামী, পুত্র, কন্যা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় ব্যক্তি পিতামাতা বা দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণপোষণ করতে বাধা দিলে বা অসহযোগিতা করলে তিনি অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং ওই দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আইনের ৭ ধারা মোতাবেক, পিতামাতার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এ অপরাধের জন্য মামলা করা যাবে। আইনে আপস মীমাংসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের চেয়াম্যান, মেম্বার, কমিশনারদের আপস করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এ আপস মীমাংসা আদালত কর্তৃক স্বীকৃতি দেওয়ার বিধান আইনে রাখা হয়েছে।

মা-বাবা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন, তখন তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব কার ওপর অর্পিত হবে, তা একটি যুক্তিসংগত প্রশ্ন। এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর এ আইনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। তবে প্রশ্নটি শুধু আইনগত নয়, নৈতিকতারও। কার্যত সব পিতামাতাই সন্তানের মঙ্গল চান। কোনো পিতামাতাই সন্তানের বিরুদ্ধে যেতে চান না। কিন্তু পরিস্থিতি যদি সন্তানের বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য করে, তাহলে সন্তানের বিরুদ্ধে না গিয়ে উপায় থাকে না। অনেক সন্তান পিতামাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বাধ্য করে। আবার কোনো সন্তান যদি পিতামাতার ভরণপোষণ না করে, তাহলে পিতামাতা এ আইনের মাধ্যমে ভরণপোষণের জন্য আইনের আশ্রয় নিয়ে তাদের অধিকার আদায় করতে পারেন।

মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়ে?

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়ে?

সংশোধন হচ্ছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

সংশোধন হচ্ছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

নতুন বাবাদের মনের যে দুশ্চিন্তা কেউ দেখে না

নতুন বাবাদের মনের যে দুশ্চিন্তা কেউ দেখে না

বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তান কার কাছে থাকবে

বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তান কার কাছে থাকবে

বাবা-মা কীভাবে জান্নাতে প্রবেশের প্রথম দরজা?

বাবা-মা কীভাবে জান্নাতে প্রবেশের প্রথম দরজা?

আরও পড়ুন

অন্যমত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

রংপুরের আলুচাষিদের দরকার বাজার, সহানুভূতি নয়

রংপুরের আলুচাষিদের দরকার বাজার, সহানুভূতি নয়

শিক্ষা খাতের গলদ থেকে যে বিস্ফোরণ

শিক্ষা খাতের গলদ থেকে যে বিস্ফোরণ

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম