শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব
Advertisement
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যে বয়সে একটি শিশুর নির্ভয়ে পড়াশোনা, খেলাধুলা ও বেড়ে ওঠার কথা, সে বয়সে তাকে যদি যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন কিংবা ভয়ের পরিবেশে দিন কাটাতে হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থারও ব্যর্থতা। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকের কাছ থেকে দূরে থাকা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও বেশি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একটি প্রথম সারির ইংরেজি জাতীয় দৈনিকের অক্টোবর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৮ থেকে ২৩ অক্টোবরের মধ্যে দেশের ছয়টি মাদ্রাসায় শিশুদের ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনাগুলো গাজীপুর, সাভার, কুষ্টিয়া ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকার। ভুক্তভোগীদের মধ্যে সাত বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ও তদন্তের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
এ ধরনের ঘটনা যে কেবল মাদ্রাসা শিক্ষাধারার সমস্যা, বিষয়টি তেমনও নয়। আবাসিক হোস্টেল, পরিবার, ক্রীড়া প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয়, সুনাম কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। একইভাবে বিচ্ছিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো সম্প্রদায় বা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করাও ন্যায়সংগত নয়।
শিশু নির্যাতনের ঘটনা অনেক সময় প্রকাশ পায় না। ভুক্তভোগী শিশু ভয়, লজ্জা, হুমকি কিংবা অবিশ্বাসের আশঙ্কায় মুখ খুলতে পারে না। নির্যাতনকারী যদি শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কেউ হন, তবে শিশুর পক্ষে অভিযোগ জানানো আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কখনো পরিবার সামাজিক মর্যাদা, বিয়ে বা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিষয়টি গোপন রাখতে চায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান নিজের সুনাম রক্ষার নামে অভিযোগ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী শিশুকে একাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের দ্বারা বারবার যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত নিউজ পোর্টাল ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রতিবেদন প্রকাশ করে; ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হয়।
শিশুটির বাবার করা মামলার ভিত্তিতে অভিযোগের তদন্ত চলছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এ ঘটনায়ও শিশুর অভিযোগ শোনা, তাকে নিরাপদ রাখা এবং দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের তদন্তের ফল যা-ই হোক, প্রতিটি শিশুর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের কর্তব্য।
শিশুর নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করা কিংবা কোনো অভিযোগ দাখিল হয়নি বলে সেটিকে নির্যাতন না ঘটার প্রমাণ হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। শিশুদের বয়সোপযোগী ভাষায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়ার বিষয়ে শেখাতে হবে। তবে নির্যাতন প্রতিরোধের দায় শিশুর ওপর চাপানো যাবে না। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং অভিযোগের পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া বড়দেরই দায়িত্ব।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও যৌন অপরাধ মোকাবিলায় আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইন এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আইন অনুযায়ী অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় তদন্ত ও বিচার হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু আইন ও নির্দেশনা কাগজে থাকা যথেষ্ট নয়; সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
একটি জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছেলেশিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ১৩১টি ঘটনায় ১৭১ জন ভুক্তভোগীর তথ্য সংগঠনটি নথিভুক্ত করেছে; এর মধ্যে ৭২টি ঘটনা মাদ্রাসায় সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এসব তথ্যের পরিধি ও সংগ্রহপদ্ধতি এক নয়।
এগুলোকে দেশের সব ঘটনার কিংবা মাদ্রাসায় নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তবু এগুলো সমস্যাটির গুরুত্ব উপলব্ধি করার যথেষ্ট কারণ।
সরকারের উচিত শিশু নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্ত, মামলা, বিচার ও নিষ্পত্তি সম্পর্কে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে কী অভিযোগ উঠছে, কতটি তদন্তাধীন, কতটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং ভুক্তভোগীরা কী ধরনের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন পাচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।
আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের সময় শুধু সনদ যাচাই করলেই চলবে না। শিক্ষক ও কর্মচারীদের আচরণ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ এবং অভিযোগ মোকাবিলার পদ্ধতিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা কমিটি, গোপনীয়ভাবে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য থাকা জরুরি। অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কার, তদন্ত কীভাবে হবে এবং প্রয়োজনে কোন সরকারি সংস্থার কাছে যেতে হবে—তা স্পষ্ট থাকতে হবে।
অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রভাব বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম বিবেচনা করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। আবার অভিযোগ উঠলেই প্রমাণ যাচাইয়ের আগে কাউকে দোষী ঘোষণা করাও ঠিক নয়। ভুক্তভোগী শিশুকে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা, প্রয়োজনে চিকিৎসা ও মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়া এবং প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে দ্রুত আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। অভিযোগ গোপন করতে চাপ দেওয়া, শিশুকে হুমকি দেওয়া কিংবা তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে।
সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো এক নয়। তাই তদারকির ব্যবস্থাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার অনুযায়ী সমন্বিতভাবে সাজাতে হবে। তবে ব্যবস্থাপনার পার্থক্য কোনো প্রতিষ্ঠানের শিশু সুরক্ষার দায় কমাতে পারে না। শিক্ষা বোর্ড, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, সরকারি তদারকি সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করতে হবে। শুধু পরিপত্র জারি কিংবা কমিটি গঠনের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে সেগুলো কাজ করছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, কোনো ব্যক্তির কাছে বা প্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা, অস্বাভাবিক ভয় কিংবা মানসিক বিপর্যয়ের লক্ষণ দেখা গেলে অভিভাবকের উচিত শান্তভাবে কথা বলা। শিশুকে দোষারোপ করা, অবিশ্বাস করা কিংবা বারবার জেরা করে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। তার কথা মনোযোগ দিয়ে ও আন্তরিকতার সঙ্গে শুনতে হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, শিশু মনোবিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে।
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অভিযোগ গ্রহণ না করলে বা ব্যবস্থা না নিলে অভিভাবককে বিকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হবে। অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীর পরিচয় বা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা কিংবা ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। গণমাধ্যমেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। সংবাদ প্রকাশ করতে হবে এমনভাবে, যেন শিশুর পরিচয়, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
অন্যদিকে, অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড কোনো সমাধান নয়। এসবের ফলে নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হতে পারে এবং বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচারই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ।
ইসলাম শিশু, এতিম ও দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আমানতদারিতা, দয়া, ন্যায়বিচার ও জুলুম থেকে বিরত থাকার শিক্ষা কেবল বক্তব্যে নয়, প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া দরকার। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও পরিচালকদের জন্য শিশু সুরক্ষা, পেশাগত নৈতিকতা এবং নির্যাতনের অভিযোগ মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে আইন প্রয়োগ, তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত পরিদর্শন, দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অভিভাবকদের শিশুর কথা শোনার এবং সমাজকে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার চেয়ে বড়, কোনো ব্যক্তির প্রভাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনো সামাজিক সংকোচের চেয়ে অগ্রাধিকারযোগ্য। অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্যাতনের শিকার শিশুকে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দিতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা শুধু সরকারের কাজ নয়—এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গণমাধ্যম ও সমগ্র সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
লেখক: ইসলামী ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মানবাধিকারকর্মী

