যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র: জনগণের চেয়েও যেখানে গুরুত্বপূর্ণ লবিস্টদের প্রভাব
Advertisement
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
ইসরাইলি লবির বিরুদ্ধে যাওয়ায় দলীয় প্রার্থী আবদুল এল সায়েদকে (ডানে) বয়কট করে রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসম্যান হ্যালি স্টিভেন্স (বামে)/সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমেরিকার রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অধিকার বা জনকল্যাণের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় লবিস্টদের প্রভাব এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। সম্প্রতি মিশিগান অঙ্গরাজ্যের মার্কিন সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই নির্মম বাস্তবতাই আবারও স্পষ্টভাবে সামনে চলে এসেছে। ডেমোক্র্যাট দলের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং ইসরাইলি লবিস্টদের ভূমিকা আমেরিকার তথাকথিত ‘গণতন্ত্রের’ আসল রূপকে উন্মোচন করেছে।
প্রাথমিক নির্বাচনে বড় অর্থের খেলা
মিশিগানের ডেমোক্র্যাট পার্টির সিনেট নমিনেশনের জন্য লড়াই করেছিলেন আব্দুল সায়েদ এবং কংগ্রেসম্যান হ্যালি স্টিভেন্স। আব্দুল সায়েদ মার্কিন জনগণের করের কোটি কোটি ডলার বিদেশে, বিশেষ করে ইসরাইলে সামরিক সহায়তার নামে পাঠানোর প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে আসছেন। তার যুক্তি ছিল—আমেরিকান নাগরিকরা যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন, চিকিৎসা ও আবাসন সংকটে ভুগছেন, তখন সেই কষ্টার্জিত অর্থ কেন অন্য দেশে বিলিয়ে দেওয়া হবে?
অন্যদিকে, হ্যালি স্টিভেন্স ছিলেন ইসরাইলের জোরালো সমর্থক। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট দলের অভ্যন্তরীণ প্রাইমারি নির্বাচনেই তাকে জয়ী করতে ইসরাইলি লবিস্টরা প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। তা সত্ত্বেও মিশিগানের সাধারণ ডেমোক্র্যাট ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেন এবং আব্দুল সায়েদ সেই প্রাইমারিতে জয়লাভ করে ডেমোক্র্যাট দলের মূল টিকেটের প্রার্থী হন।
শেষ মুহূর্তের নাটক ও হ্যালি স্টিভেন্সের দলবদল
ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর হ্যালি স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মুখোমুখি হওয়ার কথা থাকলেও, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তিনি এক অভাবনীয় ঘোষণা দেন। তিনি তার দলের বিজয়ী প্রার্থী আব্দুল সায়েদকে বয়কট করে সরাসরি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান।
এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি আব্দুল সায়েদের এক সমর্থকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন। ওই ভিডিওতে ইসরাইলে মার্কিন অর্থ সহায়তা বন্ধের দাবির সমালোচনা করে হ্যালি স্টিভেন্স জানান যে তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে এমন অবস্থান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে বিরোধী দলীয় প্রার্থীকে এই সমর্থন দেওয়া ডেমোক্র্যাট শিবিরে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। খোদ সাবেক হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি একে মিশিগানের পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সঙ্গে এক ধরনের ‘বিপজ্জনক বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া ডেমোক্র্যাট দলের শীর্ষ নেতারাও তার এই অবস্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
লবিস্ট ও এলিট শ্রেণির কবজায় মার্কিন রাজনীতি
এই ঘটনা আমেরিকার মূলধারার রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান—উভয় দলেরই সিংহভাগ সদস্য বিলিয়নিয়ার লবিস্টদের আর্থিক অনুদান দ্বারা প্রভাবিত। ফলে বৈদেশিক নীতি বা ইসরাইল ইস্যুতে দুই দলের মূল নেতৃত্বের ভেতর কোনো মৌলিক ফারাক থাকে না। এমনকি মূলধারার অনেক গণমাধ্যমও এই লবিস্টদের প্রভাবের বাইরে নয়।
আব্দুল সায়েদের মতো গুটিকয়েক প্রগতিশীল নেতা যখন দলীয় বৃত্তের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জনকল্যাণের কথা বলেন, তখন পুরো লবিস্ট ও বুর্জোয়া শ্রেণি তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন নীতি বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তার এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়। মিশিগানের এই নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে যে আমেরিকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত কণ্ঠস্বর প্রকাশের সুযোগ কতটা সীমিত। দিনশেষে এই ব্যবস্থা এলিট শ্রেণি ও লবিস্টদের স্বার্থই রক্ষা করে চলেছে। তবে এতকিছুর পরও মিশিগানের সচেতন সাধারণ মানুষের রায়ের দিকেই তাকিয়ে আছেন পরিবর্তনকামী মানুষেরা—যেখানকার ভোটাররা সব বাধা পেরিয়ে নিজেদের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র

