যশোর-২ আসন
‘নারী প্রার্থী’ পরিবর্তন করে পুরুষকে দেওয়ার দাবি
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৫৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে বিএনপির প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। ১৮ নভেম্বর যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা বাসস্ট্যান্ডে মনোনয়নবঞ্চিতদের আহ্বানে ‘তারুণ্যের সমাবেশে’ সেই দাবির তীব্রতা এতটাই প্রখর যে, বক্তারা এ আসনে ‘নারী প্রার্থী’ পরিবর্তন করে একজন পুরুষ প্রার্থীকে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন দলের হাইকমান্ডের কাছে।
মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির একজন নেতা বলছেন, আমাদের আসনে ধার্মিক মানুষের সংখ্যা একটু বেশি। তারা এ আসনে নারী প্রার্থীর প্রতি তেমন একটা সন্তুষ্ট নয়। সেই কারণে এ আসনে একজন পুরুষ প্রার্থীর নাম পুনর্বিবেচনার জন্য কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবিরা সুলতানা বলেন, আমাদের দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া একজন নারী। তিনি কয়েক দফা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ-বিদেশের সুনাম কুড়িয়েছেন। নারী ইস্যুতে কথা বলা- দলকেই হেয় করার সামিল।
সমাবেশে বলা হয়, ঝিকরগাছা-চৌগাছা আসনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ও চারদলীয় জোট প্রার্থীর দখলে ছিল। এ আসনের বিএনপি নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ কখনো বিএনপি এমপির সেবার স্বাদ নিতে পারেনি। ১৬ বছর বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামের ফলে দেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হওয়ার পর মানুষের আকাঙ্ক্ষা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করা। এ নিয়ে দুই উপজেলার নেতারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
তারা বলেছেন, এ আসনে প্রাথমিকভাবে সাবিরা সুলতানাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। দুই উপজেলায় মাঠ জরিপ, ভোটের হিসাব ও জনপ্রিয়তা এবং সাধারণ ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন, সেই সঙ্গে জামায়েতের শক্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে ধানের শীষকে বিজয়ের বিষয়ে সংশয় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘোষিত প্রার্থীর ক্ষীণ জনপ্রিয়তা, উগ্র আচরণ, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা ইত্যাদি কারণে চৌগাছা-ঝিকরগাছা বিএনপিসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশার ছাপ দেখা যাচ্ছে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী উল্লসিত। তাকে দিয়ে এ আসনটি উদ্ধার করা বিরাট চ্যালেঞ্জ। সেই কারণে তাকে পরিবর্তন করে পুরুষদের মধ্য থেকে নতুন প্রার্থী দেওয়ার দাবি করেন তারা।
এদিকে তারুণ্যের এ সমাবেশ ও মনোনয়নবঞ্চিতদের নারী প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়ে কথা হয় ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনোনয়নপ্রত্যাশী ইমরান সামাদ নিপুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা আসলে দলের পক্ষে, ধানের শীষের পক্ষেই সমাবেশ করছি। সেখানে যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন, তারাও চাইছেন দল পুনর্বিবেচনা করুক। কিন্তু নারী প্রার্থী বলে পরিবর্তন- এই কথা আমি বলিনি। অনেক নেতাই তো বক্তব্য দিয়েছেন, হয়তো কেউ বলে থাকতে পারেন; কিন্তু এই দাবিতেই যে আমরা স্থির থাকব, এমন কোনো কথা নেই। যদি চূড়ান্তভাবেই সাবিরা সুলতানা ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে থেকে যান, আমরা অবশ্যই ধানের শীষের পক্ষেই থাকব।
অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলাম বলেন, বিগত সময়কালে চৌগাছা থেকে কোনো দলই কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। চৌগাছা এলাকার দলমত নির্বিশেষে সব মানুষ একাট্টা, তারা স্থানীয় কাউকে প্রার্থী হিসেবে চান। আপনাদের দোয়ায় আমি সেই মানুষ, যাকে সবাই ভালোবাসে। এছাড়া আমার রাজনীতির ৪৭ বছরে আমি ঝিকরগাছার প্রত্যেক কর্মীর নাড়ি-নক্ষত্র চিনি, তাদের বাড়িতে যাতায়াত রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঝিকরগাছা-চৌগাছা উপজেলার মানুষ আসলে বেশ ধার্মিক। এখানে জামায়াতের যিনি প্রার্থী, তিনিও বেশ শক্তিশালী প্রার্থী। তার বিপরীতে সাবিরা সুলতানাকে এখানকার মানুষ প্রার্থী হিসেবে পছন্দ করছেন না। সেই কারণে আমরা প্রার্থী পুনর্বিবেচনার জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে প্রতিনিয়ত নানা প্রোগ্রামের মাধ্যমে জানাচ্ছি।
এ আসনে মনোনয়ন চেয়ে আসছেন এলাকায় ১৬-১৭ বছর ধরে দলীয় কাজ করা যশোর চেম্বারের সভাপতি মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘নারী প্রার্থী’ পরিবর্তন করার কথা আমি বলিনি। যে বা যারা এ বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করেন। ওই মঞ্চে এ ধরনের বক্তব্য হয়েছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি খেয়াল করিনি।
তিনি বলেন, আমার স্পষ্ট বক্তব্য- প্রার্থী ঘোষণার আগেই দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে এলাকায় কাজ করতে বলেছেন। সেই অনুযায়ী কাজ করছি। যেহেতু প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত নয়, সেই কারণে আশা করছি দল সঠিক সিদ্ধান্ত দেবে।
জানতে চাইলে যশোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত সাবিরা সুলতানা মুন্নী বলেন, যশোর-২ আসনে ৫ লাখের বেশি ভোটার। তার মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এই দুই উপজেলার নারীদের ভোট নিয়ে যে আশঙ্কায় ছিলেন, আমি প্রার্থী হওয়াতে সেটি আরও বেড়েছে। কেননা যেখানেই গণসংযোগে যাচ্ছি, উঠান বৈঠকে কিংবা পথসভায়- সেখানে পুরুষ ভোটারের পাশাপাশি নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের আশান্বিত করেছে। আমি নির্বাচিত হলে তারা সহজেই আমার কাছে পৌঁছতে পারবেন, যা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জন্য অত্যন্ত দুরূহ।
তিনি বলেন, আমাদের দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া একজন নারী। বারবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন দেশ পরিচালনায় তিনি কতটা সিদ্ধহস্ত। এখন যারা নারী প্রার্থী বলে জেন্ডার ইস্যুকে সামনে আনছেন, পক্ষান্তরে তারা দলকেই হেয় ও অবজ্ঞা করছেন বলে মনে করি। তারা মনোনয়ন চাইতেই পারেন, দলীয় হাইকমান্ড বিবেচনা করতেই পারেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাকেই প্রার্থী করা হয়েছে; সেই কারণে সবার উচিত ধানের শীষের পক্ষেই অবস্থান করা।
দলের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দলের মহাসচিব প্রার্থী ঘোষণাকালে যেসব শব্দ উচ্চারণ করেছেন- তাতে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে যারা ছিলেন, তাদের প্রত্যাশা থাকতেই পারে। এখনো নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা হয়নি। দল থেকে স্পষ্টভাবে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তিবিশেষ নয়- সবাই যেন ধানের শীষের পক্ষেই অবস্থান নেন এবং যতটুকু জানি, যারা চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণার অপেক্ষা রয়েছেন, তাদের কিন্তু ধানের শীষের পক্ষেই রয়েছেন। আর এ মাসের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন।
গত ৩ নভেম্বর সারা দেশে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই দিন যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে প্রার্থী হিসেবে সাবিরা সুলতানার নাম ঘোষণা করা হয়।
সাবিরা সুলতানা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক অর্থ সম্পাদক, উপজেলা কমিটির সভাপতি প্রয়াত নাজমুল ইসলামের স্ত্রী। ২০১১ সালে নাজমুল ইসলাম গুম হয়ে যান। এর প্রায় চার মাস পরে তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। সর্বশেষ ২০১৪ সালে তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এদিকে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী দীর্ঘদিন ইংল্যান্ডে বসবাসকারী যশোর শহরের খড়কী এলাকার বাসিন্দা ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ রয়েছেন ঝঞ্ঝাটমুক্ত। তিনি নির্বিঘ্নে গণসংযোগ করছেন, তার পক্ষে দুই উপজেলায় করা হয়েছে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, রাস্তা সংস্কার ইত্যাদি সেবামূলক কাজ। তার পক্ষে প্রচারণার জন্য ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নির্বাচিত ভিপি সাদিক কায়েমকে প্রধান বক্তা করে জনসমাবেশের (২১ নভেম্বর) আয়োজন করা হয়েছে।
