সাদিয়া রুনাকে খুন
হত্যার সঙ্গে রাঘববোয়ালরা জড়িত দাবি স্বজনদের, দুই শিক্ষকসহ আসামি ৪
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক আসমা সাদিয়া রুনাকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের কাছে লিখিতভাবে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমান।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুর রহমান হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে নিশ্চিত করেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ।
তিনি বলেন, ফজলু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিখিতভাবে দিয়েছেন। তবে আজ যেহেতু তদন্তের প্রথম দিন, তাই তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে হাসপাতালটির দায়িত্বশীল একজন চিকিৎসক বলেন, ফজলু তার লিখিত জবানবন্দিতে দীর্ঘ ৯ মাস বেতন না হওয়া, তাকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা ও তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করাকে কারণ হিসেবে দাবি করেছেন।
সাদিয়া রুনা হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার সকালে চারজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। নিহত শিক্ষকের স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান ইবি থানায় মামলাটি দায়ের করেন। আসামিরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার, সহকারী অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস ও আসমা সাদিয়া রুনাকে কুপিয়ে জখম করার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করা কর্মচারী ফজলুর রহমান।
ইবি থানায় মামলা দায়েরের সময় সার্বক্ষণিক বাদী ইমতিয়াজ সুলতানের সঙ্গে থাকা তার একজন সহকর্মী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দুইজন শিক্ষককে আসামি করা হয়েছে, এর মধ্যে শ্যাম সুন্দর সরকার বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার সময়ে অর্থনৈতিক কিছু অস্বচ্ছতা ছিল। সেসব বর্তমানে না চলা এবং শ্যাম সুন্দরের সময়কালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিসাব চাওয়ায় তারা ভুক্তভোগী রুনার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এসব বিষয় মামলার এজাহারে বলা হয়েছে।
নিহত শিক্ষকের স্বামী ইমতিয়াজের বড় ভাই আব্দুর রশিদ বলেন, কর্মস্থলে শিক্ষককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে-এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাঘববোয়ালেরা জড়িত। তাদের খুঁজে বের করতে হবে প্রশাসনকে।
তিনি বলেন, আসমার ছোট ছোট চারটি বাচ্চা। দুটি বাচ্চা এখনো বুঝতে পারেনি তাদের মা নেই। ছোট বাচ্চাটির বয়স মাত্র দেড় বছর।
আব্দুর রশিদ কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমাদের পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিল। আসমার বিভাগের নানা আর্থিক বিষয়ে ফজলুর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল। ফজলু নানা বিষয়ে চাপ দিত। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রশাসনের কেউ কেউ জানত। বৈঠকও হয়েছে। কারও ইন্ধন ছাড়া এত বড় ঘটনা ঘটতে পারে না। এত বড় সাহস হতে পারে না। পরিকল্পিতভাবে সবকিছু করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে শিক্ষকেরাও জড়িত।
তবে মামলার আসামি শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ম্যাডাম এই বিভাগে আট বছর ধরে আছেন। আর আমি মাত্র দেড় বছর। এখানকার কালচার শিক্ষার্থীরাও আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন। এখন ম্যাডাম যেহেতু বেঁচে নেই। তাই আমার পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলার সত্যিকার অর্থে এখন আর কেউ নাই। ইমতিয়াজ ভাই সংক্ষুব্ধ হয়ে যদি আমার নাম বলে থাকেন, তাহলে আমার তো বলার কিছু নাই। সুষ্ঠু তদন্তে সত্যটা বেরিয়ে আসবে।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে রুনার মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে বাদজোহর কুষ্টিয়া শহরের কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থানে তার লাশ দাফন সম্পন্ন হয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. হোসেন ইমাম বলেন, নিহত শিক্ষকের গলার নিচে আঘাতে গভীর ক্ষত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতেই তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বুক, পেট, হাত-পাসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তাতে মনে হয়েছে, ঘটনার সময় ধস্তাধস্তি হয়েছে। বাঁচার জন্য শিক্ষক হাত দিয়ে ঠেকাতে গেছেন, এতে হাতেও আঘাত লেগেছে। যেভাবে আঘাত করা, তা খুবই ক্ষোভ ও আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ মনে হচ্ছে।
এদিকে আসমা সাদিয়াকে হত্যার বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসন ভবনের সামনে জড়ো হন। এ সময় তারা হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড, নেপথ্যে কেউ থাকলে খুঁজে বের করা ও ক্যাম্পাস, হল ও ডিপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা নিশ্চিত করাসহ ৯ দফা দাবি জানান।
