একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি পুলিশের
নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১১ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়েছে।
বুধবার দুপুর ২টার দিকে নওগাঁর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। গত সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে এক দম্পতি ও তাদের দুই শিশু সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন- বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩৫), তার স্ত্রী পপি সুলতানা এবং তাদের সন্তান পারভেজ রহমান (৯) ও সাদিয়া আক্তার (৩)।
গ্রেফতারকৃত তিন ব্যক্তি হলেন- নিহত হাবিবুর রহমানের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম (৫০), তার ভাগনে সবুজ রানা (২০) ও শাহিন হোসেন (৩০)। গ্রেফতার তিনজনেরই বাড়ি বাহাদুরপুর গ্রামে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, নিহত হাবিবুর রহমানরা ছয় ভাই-বোন। তার এক ভাই ও পাঁচ বোন। সম্প্রতি হাবিবুরের বাবা তার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সম্পত্তি লিখে দেন। তিনি তার ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা সম্পত্তি ছেলে হাবিবুর রহমানকে লিখে দেন। বাকি সম্পত্তি তার মেয়েদের লিখে দেন।
হাবিবুরকে বেশি সম্পত্তি লিখে দেওয়ায় বোন, ভগিনীপতি ও ভাগ্নেদের সঙ্গে হাবিবুরের বিরোধ তৈরি হয়। বেশ কিছু দিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এটা নিয়ে গ্রাম্য-সালিশ বৈঠকও হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেফতার তিনজনের মধ্যে শহিদুল ও সবুজ রানা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে হাবিবুরের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম, তার ছেলে শাহিন ও হাবিবুরের আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা হাবিবকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। সোমবার বিকালে হাবিবুর তার ভাগ্নে সবুজ রানাকে নিয়ে উপজেলার ছাতড়া হাটে গরু কিনতে যান। হাবিবুর ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে গিয়েছিলেন। গরু কিনা না হলে টাকা সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরে আসেন।
তিনি বলেন, হাট থেকে ফিরে আসার পর গ্রামের একটি মাঠে গিয়ে সবুজ রানা, শহিদুল, শাহিনসহ এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছয়জন পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার রাত ৮টার দিকে হাবিবুরের বাড়িতে যায় সবুজ। তিনি তার মামা-মামি ও মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খান। ওই সময় সবার অগোচরে হাবিবুরের আরেক ভাগনে বাড়িতে প্রবেশ করে বাড়ির একটি ঘরে লুকিয়ে থাকে। সবুজ খাবার খেয়ে বের হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন বাড়ির মূল দরজা খুলে দিলে সবুজ, শহিদুলসহ আরও পাঁচজন বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে হাবিবের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেয়। এরপর হাবিবের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করে। হাবিবের স্ত্রী পপি সুলতানা দুই সন্তানকে নিয়ে পাশের ঘরে ছিলেন। হাবিবকে হত্যা করার সময় পপি বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হন। বাড়ির আঙিনায় বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পপির মাথায় হাঁসুয়া দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে তাকেও গলা কেটে হত্যা করে। পরে হাবিবের পুরো পরিবারকে নির্বংশ করার উদ্দেশে তার দুই সন্তান পারভেজ রহমান ও সাদিয়াকে গলা কেটে হত্যা করে।
এসপি তারিকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার সকালে ঘটনা জানাজানি হলে সবুজ রানা, শহিদুল ও শাহিন হাবিবের বাড়িতে আসেন। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার তদন্তে নেমে মঙ্গলবারই নিহত হাবিবের ভাগনে সবুজ, তার বাবা নমির উদ্দিন, দুই বোন ডালিমা বেগম ও হালিমাসহ ৬-৭ জনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হাবিবের ভাগনে সবুজ রানা পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে গ্রামের একটি খড়ের পালায় লুকানো অবস্থায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাঁসুয়া উদ্ধার করা হয়।
এছাড়াও গ্রামের একটি পুকুর থেকে বুধবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সবাইকে হত্যার কারণ হিসেবে শহিদুল ও সবুজ রানা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে, নির্বংশ করলে পরবর্তীতে হাবিবের নামে থাকা সম্পত্তির ভাগিদার তারা হবে। এ ভাবনা থেকেই তারা পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম ও জয়ব্রত পাল, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আল মামুন শাওন, পুলিশের জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি হাসিবুল্লাহ হাবিব, নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত পপি সুলতানার বাবা বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাতে নিয়ামতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। ওই মামলায় শহিদুল, সবুজ রানা ও শাহিনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
