ব্রেইন টিউমারের সঙ্গে লড়াই এক হতভাগ্য শিশুর
মো. আ. রহমান শিপন, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম
হিয়া
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যে বয়সে হাতে কলম আর পিঠে বইভর্তি ব্যাগ নিয়ে স্কুল যাওয়ার কথা, ঠিক সেই বয়সে ব্রেইন টিউমারের সঙ্গে অসম লড়াই করে দিন পার করছে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হিয়া। চিকিৎসার অভাব ও খাওয়া-দাওয়া করতে না পেরে দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে তার শরীর ও কণ্ঠ। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শিশুটি।
সুস্থ হয়ে আবার যেন স্কুলে যেতে পারে এমন আকুতি শিশুটির।
ছোট্ট হিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। বাবা হরি মহন্ত ও মা বিউটি রানী একমাত্র সন্তান হিয়াকে আদর করে ডাকতেন হিয়া মণি নামে। বছর দুয়েক ধরে অসুস্থ হিয়াকে নিয়ে বাবা হরি ছুটেছেন এই ডাক্তার ওই ডাক্তারের কাছে, কিন্তু জ্বর ও বমি না কমায় মাসছয়েক আগে শরণাপন্ন হন রংপুরে শিশু বিশেষজ্ঞের।
পরে সেখান থেকে পাঠানো হয় নিউরো বিশেষজ্ঞের কাছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে শিশু হিয়াকে ভর্তি করানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে ব্রেইন টিউমার। রেফার করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে; কিন্তু মেয়েকে বাঁচানোর সাধ থাকলেও সামর্থ্য না থাকায় বাড়ির বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিন কাটছে শিশুটির।
দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের পাশেই সরকারি জায়গায় পলিথিন দিয়ে ছোট্ট একটি চালা তুলে তাতে টি-স্টল দিয়েছেন হরি। মালামাল বলতে ওই কয়েকটি চায়ের কেটলি, কাপ, গ্লাস ও বেঞ্চ। আর খাদ্যপণ্য বলতে কয়েকটি বিস্কুট ও ছোট কিছু কেক। সবমিলিয়ে বড়জোর দেড়-দুই হাজার টাকার মাল। দিন শেষে যা আয় হয় তাতেই টানাটানি করে সংসার চালায়।
অন্যদিকে বাসস্থান বলতে মাত্র সোয়া তিন শতক জায়গার মধ্যে টিনশেড একটি ঘর। আরেকপাশে ৩টি কবর। বৃষ্টি এলেই জড়ো করে রাখতে হয় ঘরের বিছানা। যাতায়াতের একটু পথ না দেওয়ায় তাতেও ঢুকতে হয় কাত হয়ে। সবমিলিয়ে অবস্থা যখন এই, তার ওপর মেয়ের এই কঠিন ব্যাধিতে দিশেহারা তারা।
হরি মহন্ত বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে মেয়েটি অসুস্থ। অনেক চিকিৎসার পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ছিলাম। মাসখানেক চিকিৎসাধীন ছিল। ব্রেইন টিউমার হওয়ায় ঢাকায় চিকিৎসা করাতে বলেছেন চিকিৎসকরা; কিন্তু সংসারই তো চলে না। কিভাবে ঢাকায় চিকিৎসা করাব? এজন্য সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
সাব্বির হোসেন নিয়ন নামের এক প্রতিবেশী বলেন, বহুদিন ধরে হরির মেয়েটি ব্রেইন টিউমারে ভুগছে। রংপুরে চিকিৎসার সময় আমরা সাধ্যমতো সাহায্য করেছি। যে দোকানটি আছে তাতে তো সংসারই চলে না তার। ঢাকায় চিকিৎসা করাতে তো দরকার অনেক টাকার। সমাজের সবাই যদি একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন তাহলে হয়তো বাঁচত মেয়েটি।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাজীব কুমার বাগচী বলেন, বর্তমানে এই খাতে কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পাওয়ামাত্রই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা হবে। এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, নিয়ম অনুযায়ী সেটিও করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হিয়ার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন দ্রুত উন্নত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ; কিন্তু দরিদ্র বাবা-মায়ের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ছোট্ট হিয়াকে সুস্থ করে আবারও স্কুলের বেঞ্চে ফিরিয়ে দিতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের হৃদয়বান ও সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবার ও প্রতিবেশীরা।
