গাজীপুর সিটি
মেয়র পদে বিএনপিতে হাফ ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী, জামায়াতের একক প্রার্থী মাঠে
Advertisement
শাহ সামসুল হক রিপন, গাজীপুর
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
মেয়র পদে বিএনপিতে হাফ ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মতো গাজীপুরও চলছে প্রশাসক দিয়ে। নির্বাচন কমিশন আগামী জানুয়ারি থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য টাইমলাইন ঘোষণা করেছে। ২৭ সালের শুরুতে সিটি নির্বাচন হবে—এমনটি ধরে নিয়েই মাঠ গোছাচ্ছেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। দিন-রাত মাঠ ঘাট চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা।
দেশের সবচেয়ে বড় সিটি গাজীপুরে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হাফ ডজনেরও বেশি নেতা। আর জামায়াতের একক প্রার্থী নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিও এখানে প্রার্থী দিতে পারে।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর তৎকালীন মেয়র জায়েদা খাতুনকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়। বর্তমানে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত মেয়র নেই। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার কাঠামো পরিবর্তনের পর মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আসন্ন সিটি নির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী। প্রতিনিয়ত সিটির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। প্রশাসক হিসেবে উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করছেন।
বিএনপি ও এনসিপির পক্ষ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে কারো নাম ঘোষণা করেনি এখন পর্যন্ত। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় বিভিন্ন নেতার নাম উঠে এলেও তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বলা হচ্ছে, চূড়ান্ত প্রার্থী নয়।
জামায়াত অবশ্য তাদের প্রার্থী হিসেবে ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমানের নাম ঘোষণা করেছে। গত ৬ মে গাজীপুরের টঙ্গীতে তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। তিনি তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন এবং জাতীয় রাজনীতিতেও জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন।
গাজীপুরে বরাবরই বিএনপির অবস্থান শক্ত। প্রথম সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করেন। এর পরের নির্বাচনগুলোর একটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয় এবং একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন। তবে এই দুটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল ভোটারদের কাছে। বিএনপি এবার যে করেই হোক হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে চায়। সরকারের উন্নয়ন বাজেটের সুযোগ কাজে লাগাতে দলীয় মেয়র চাইছে তৃণমূল বিএনপি। তবে দলে ৭ জন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তাদের মধ্যে একজন গাজীপুর বিএনপির প্রবীণ নেতা ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলের মেয়রপ্রার্থী সাবেক এমপি হাসান উদ্দিন সরকার। একাধিকবারের সাবেক দুজন কাউন্সিলরও এবার মেয়র পদে লড়তে চান।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন।
শওকত হোসেন সরকার যুগান্তরকে বলেন, দলীয়প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আস্থা রেখে আমাকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আমি ওই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় রাত-দিন মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন সিটি কর্পোরেশনের তফসিল ঘোষণা করলে বিএনপিও দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে। তখন আমরা আমাদের সর্বাত্মক দলীয় শক্তি নিয়ে মাঠে নেমে পড়ব।
দল তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলেও এখন পর্যন্ত দলীয় মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেনি। তবে শওকত সমর্থকরা ধরেই নিয়েছেন, তিনিই নিশ্চিত মনোনয়ন পাচ্ছেন।
মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার, গাজীপুর বারের সাবেক সভাপতি ও মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ড. শহীদুজ্জামান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আফজাল হোসেন কায়সার, মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক তিনবারের কাউন্সিলর হান্নান মিয়া হান্নু, তিনবারের সাবেক কাউন্সিলর ও মেট্রো থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাসান আজমল ভূঁইয়াসহ কয়েকজন নেতা। তাদের প্রত্যেকে মনোনয়নের বিষয়ে আশাবাদী।
জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এনসিপির চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে এখনো কারো নাম ঘোষণা করা হয়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমের পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ নির্বাচনে গাজীপুর-২ আসনে এনসিপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান সিটিতে প্রার্থী হতে পারেন। এছাড়াও এক-দুজনের নাম শোনা যাচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দলও সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কেমন ছিল আগের তিন নির্বাচন
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিগত তিনটি নির্বাচনের ফল ও ২৬ সালের সম্ভাব্য নির্বাচন ভাবনা নিয়ে কথা হয় স্থানীয় নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। তাদের মতে ওই তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।
২০১৩ সালের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি বিরোধী দলে থাকলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। পরের ২০১৮ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাব, পুলিশের ধরপাকড়, প্রশাসনের স্বজনপ্রীতি ও নির্বাচন কমিশনের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে নেতাকর্মীরা মাঠে থাকতে পারনি। ২০২৩ সালের তৃতীয়বারের নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে।
২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১১তম গাজীপুর সিটি করপোরেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর আগে ৭ জানুয়ারি নিকার সভায় গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভা, পূবাইল, গাছা, বাসন, কাউলতিয়া, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ইউনিয়ন ও আংশিক ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার সমন্বয়ে নতুন সিটি করপোরেশন গঠনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। যার আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার।
দেশের সর্ববৃহৎ এই সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই। ওই নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৮ জন। এতে বিএনপি-সমর্থিত অধ্যাপক এমএ মান্নান টেলিভিশন প্রতীকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৪ ভোট পেয়ে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান পান ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৭ ভোট। এতে ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৫৭৭ ভোট।
এরপর ২০১৮ সালের ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হয় গাজীপুর সিটি করপোরেশন দ্বিতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৩৭ হাজার ১১২ জন। ফ্যাসিস্ট কায়দায় ২০১৮ সালের ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দলীয় প্রতীকে। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম মেয়র নির্বাচিত হন। জাহাঙ্গীর আলম নৌকা প্রতীকে ৪ লাখ ১০ ভোট পান। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার ধানের শীষে পান ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১১ ভোট।
অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্বাচনে দলীয় প্রভাব, পুলিশের ধরপাকড়, প্রশাসনের স্বজনপ্রীতিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে এবং সরকারের রোষানলে বিএনপির কোনো নেতাকর্মী এলাকায় থাকতে পারেননি। এক প্রকার বাধ্য হয়েই তারা মাঠ ছেড়ে দেন। ফলে ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ২ লাখ ২ হাজার ৩৯৯।
পরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মে। এ নির্বাচনে বিরোধপূর্ণ পরিবেশ, ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও কমিশনের বিতর্কিত আচরণের কারণে তৃতীয়বারের এ নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতসহ বিরোধী দল অংশ নেয়নি।
এ নির্বাচনে জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের হালনাগাদ ভোটার তালিকায় প্রথম ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৬৩ ভোটারের তথ্য প্রকাশ করা হয়; পরে নির্বাচনের সময় চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা দাড়ায় ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৬২, নারী ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৬ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৮ জন।
এ নির্বাচনে মেয়র পদে মোট আটজন প্রার্থী থাকলেও বিএনপি মাঠে না থাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। শেষপর্যন্ত বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের কাছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী আজমত উল্লা খান ধরাশায়ী হন।
ওই নির্বাচনে জায়েদা খাতুন পান ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ ভোট আর আজমত উল্লা খান পান ২ লাখ ২২ হাজার ৭৩৭ ভোট। ব্যবধান ছিল ১৬ হাজার ১৯৭ ভোট।

