হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর নেই ২৫ দিন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চেম্বারের অভিযোগ
মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৩ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লার বাঙ্গরা উপজেলা সদরের উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার এনামুল হক চৌধুরী। টানা ২৫ দিনের মধ্যে একদিনও তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। এতে প্রতিদিন অপেক্ষা করে ফিরে যাচ্ছেন সেবা প্রত্যাশীরা।
এদিকে কর্মস্থলে চিকিৎসকের অনুপস্থিতির ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেক রোগীকে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাঙ্গরা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেপ্টেম্বর মাসের হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১ ও ২ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকের উপস্থিতির স্বাক্ষর রয়েছে। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাজিরা খাতায় আর কোনো স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় রোগীদের অভিযোগ, উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার এনামুল হক চৌধুরী নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। মাঝে মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলেও এক থেকে দুই ঘণ্টা অবস্থান করে চলে যান। ফলে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে দেবিদ্বার উপজেলার সুবিল উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বাঙ্গরা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে বদলি হয়ে আসেন এনামুল হক চৌধুরী। এরপর থেকেই তার কর্মস্থলে অনিয়মিত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি অনেক সময় সকাল ১০টা থেকে ১১টার দিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন এবং দুপুর সাড়ে ১২টার পর আর কর্মস্থলে থাকেন না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিস সহায়ক ওয়াসিমের কক্ষে কয়েকজন রোগী টোকেন হাতে নিয়ে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছেন। ফার্মাসিস্ট না থাকায় ঊর্ধ্বতনের নির্দেশে তিনিই সেখানে ফার্মাসিস্টের দায়িত্ব পালন করছেন। তখন ঘড়িতে বেলা সাড়ে ১১টা। তবে চিকিৎসকের ২ নম্বর কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়।
অপেক্ষমাণ রোগীদের কেউ অ্যালার্জিজনিত সমস্যা, কেউ ঠান্ডা-জ্বর, আবার কেউ শরীরের ব্যথাসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এসেছেন। চিকিৎসক না থাকায় অফিস সহায়ক রোগীদের সামলানোর চেষ্টা করছেন। তবে চিকিৎসা না পেয়ে কয়েকজন রোগীকে ফিরে যেতে দেখা যায়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, এনামুল হক দেবিদ্বারের ‘দি ডক্টরস ল্যাব’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন। তাদের দাবি, এ কারণে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে সেখানে চেম্বার করেন।
বাঙ্গরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে ব্যবসা করেন মো. হারিস মিয়া (৫৮)। তিনি বলেন, নতুন ডাক্তার আসার পর থেকেই তিনি অনিয়মিত। চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় ডাক্তারকে পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যায়।
বাঙ্গরা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আল-মামুন (৩৫) শারীরিক সমস্যায় চিকিৎসা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। অসুস্থ হলে বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসি। কিন্তু এখানে এসেও দেখি ডাক্তার নেই। এই ডাক্তার সরকারের বেতন খান, কিন্তু হাসপাতালে আসেন না।
আসাদ মিয়া (৩২) বলেন, শনিবার চিকিৎসা নিতে এসে ফিরে গেছি। এর আগেও এসে ডাক্তার পাইনি।
৬০ বছর বয়সি জুলেখা বেগম নাতনিকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। নিজেও অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসককে না পেয়ে তাকেও বিনা চিকিৎসায় ফিরে যেতে হয়। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। বড় কোনো হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে পারি না। এখানে এসেও ডাক্তার পাই না। এখন যাব কোথায়?
যোগীরখিল গ্রাম থেকে শিশুদের জন্য চিকিৎসা নিতে আসা মায়মনা (৩০) ও বিউটি আক্তার (২৮) একই অভিযোগ করেন। তারা জানান, চিকিৎসকের দেখা না পেয়ে ফার্মাসিস্টের কক্ষ থেকে কিছু ওষুধ নিয়েছেন। ডাক্তার না থাকায় তারা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
হাজিরা খাতায় টানা ২৫ দিন স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার এনামুল হক চৌধুরী মোবাইলে বলেন, ভুলবশত টানা ২৫ দিন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা হয়নি। বিষয়টি এখন খারাপ লাগছে। তবে রোগীর রেজিস্টার নিয়মিত সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে আগে ১২টার দিকে চলে যান এবং শনিবার অফিস করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন ছুটি না নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনামুল হক চৌধুরী বলেন, টুকটাক এমন অভিযোগ থাকবে। কারণ সবাই একদিনে আসে না।
এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বাঙ্গরায় চিকিৎসক অনিয়মিত থাকার বিষয়টি জানতে পেরেছি। এছাড়াও ওনার ডক্টরস নামে একটা চেম্বার রয়েছে বলে খবর পেয়েছি। বিষয়টি আরও খোঁজখবর নেব। তিনি যেন নিয়মিত অফিস করেন, তাকে বলে দেওয়া হবে।


-6abb6f6640934.jpg)