খাল খনন না করেই ৩০ লাখ টাকার বিল!
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ পিএম
চৌধুরীবাড়ি থেকে কালভার্ট পর্যন্ত মাত্র ১০০ মিটার অংশ খালের দুই মুখে লোকদেখানো সামান্য পরিষ্কার করা হলেও মাঝখানের বিস্তৃত মূল অংশ সম্পূর্ণ বাকি রেখে দেওয়া হয়েছে।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় খাল সংস্কারের কাজ নথিপত্রে শতভাগ শেষ দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ৩০ লাখ ৩ হাজার ৫৩৬ টাকার পুরো বিল। অথচ সরেজমিনে খালের বুকজুড়ে মিলেছে এক দশকের পলি-ময়লা; নেই খনন, পাড় বাঁধানো কিংবা প্রয়োজনীয় বেড ব্লক ও টিবিএম অবকাঠামো।
অসম্পূর্ণ কাজের চূড়ান্ত বিল কোনো ধরনের সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন (আইপিসিপি) প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ‘পি টু ডি’ খাল এবং ‘পি টু ডি ১/১’ খালের সংস্কারসহ বেড ব্লক ও টিবিএম অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আম্মার ট্রেডার্স’। লোকদেখানো সামান্য কিছু কাজ করে শুরুতে প্রথম চলতি বিল বাগিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে বিতর্কিত প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন সদর উপজেলায় যোগ দেওয়ার পরপরই সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে চূড়ান্ত বিল পাস করে দেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হামছাদী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল লতিফ হাজীবাড়ি থেকে মিরশাহ্ আলম চেয়ারম্যানবাড়ি পর্যন্ত ১৫০০ মিটার (১.৫ কিলোমিটার) অংশে কোনো প্রকার খননকাজই করা হয়নি। পরবর্তীতে চেয়ারম্যানবাড়ির উত্তর থেকে সুলতান ভূঁইয়া বাড়ি পর্যন্ত ১ কিলোমিটার অংশে খালের তলদেশ খনন না করে শুধুমাত্র ভাসমান ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেই খননকাজ সম্পন্ন হিসেবে দেখিয়েছেন প্রকৌশলী ইকবাল।
এ ছাড়া চৌধুরীবাড়ি থেকে কালভার্ট পর্যন্ত মাত্র ১০০ মিটার অংশ খালের দুই মুখে লোকদেখানো সামান্য পরিষ্কার করা হলেও মাঝখানের বিস্তৃত মূল অংশ সম্পূর্ণ বাকি রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত এই সরকারি প্রকল্পের কোনো সুফলই পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুধু মাটি কাটাই নয়, চরম অনিয়ম ও জালিয়াতি করা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণেও। খালের স্থায়িত্ব রক্ষা, তলদেশের ক্ষয়রোধ এবং সঠিক লেভেল বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট চেইনেজে মাটির নিচে আরসিসি বা পিসিসি দিয়ে বেড ব্লক ও পরিমাপের জন্য টিবিএম স্থাপনের বাধ্যবাধকতা ছিল। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে ৯টি বেড ব্লক এবং ১৮টি টিবিএম নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে একটিরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি গভীরতা মাপার কোনো স্থায়ী চিহ্ন বা খুঁটিও বসানো হয়নি।
এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল রাজ্জাক বলেন, খালে সামান্য মাটিও কাটা হয়নি। বর্ষায় পানি নামতে না পেরে আগের মতোই জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে আমাদের। অথচ এখন শুনছি কাজের সব টাকা নাকি ঠিকাদার আর প্রকৌশলী ইকবাল মিলে তুলে নিয়েছেন।
দুর্নীতির এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ফাইনাল বিল দেওয়া হয়েছে কি না, তা নথি না দেখে বলা সম্ভব নয়। পরে আসেন, তখন বিষয়টি খতিয়ে দেখব।
এলজিইডি লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উজ্জল চৌধুরী জানান, চূড়ান্ত বিল প্রস্তুত করা হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী কিছু টাকা আটকে (হ্যান্ডআপ) রেখেছেন। অনিয়মসংক্রান্ত কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

-6abb6e9fc6ab4.jpg)