তাজমীন হত্যাকাণ্ড: ঘাতক সুমন সম্পর্কে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
Advertisement
আবুল খায়ের, কুমিল্লা ব্যুরো
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৩ পিএম
ঘাতক সুমন মিয়া। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লায় হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুন তাজমীনের ঘাতক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া ছিলেন চরম মাত্রার একজন নেশাগ্রস্ত। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশি তদন্ত, আদালতের জবানবন্দি এবং পারিবারিক সূত্রে ঘাতক সুমন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ঘাতক সুমন নিয়মিত গাঁজা এবং ইয়াবা সেবন করত। তিনি থাকতেন শ্বশুরবাড়িতে। তার অপকর্মে অতিষ্ঠ ছিল স্ত্রীসহ স্বজনরা।
পুলিশ জানায়, মো. সুমন মিয়া (৩৫) চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস করে আসছিলেন। পেশায় সিএনজিচালক হলেও সুমন দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মাদকাসক্তিতে লিপ্ত ছিল। তার বেপরোয়া ও অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল স্বজন ও এলাকাবাসী। মাদকাসক্তি ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আলাদা বসবাস করতে বাধ্য হন। শ্বশুরবাড়িতে অবস্থানকালে সুমন ঘরের দামি আসবাবপত্র থেকে শুরু করে একে একে সব কিছু বিক্রি করে মাদক সেবন করেছে। এতে তার পরিবার পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তার বিরুদ্ধে স্ত্রী থানায় মামলাও করেছে। এক পর্যায়ে তাকে ছেড়ে স্ত্রী আলাদা বসবাস করতে থাকেন।
পুলিশের তদন্ত ও সুমনের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে কক্সবাজার থেকে ফিরে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় নামে তাজমীন। সেখান থেকে কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য ৩০০ টাকায় সুমনের অটোরিকশাটি ভাড়া করে সে। গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বললেও সুমন সুকৌশলে নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করে চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে লালমাইয়ের একটি নির্জন এলাকার দিকে অটোরিকশাটি নিয়ে যায়। অপরিচিত ও অন্ধকার পথ দেখে আতঙ্কিত হয়ে তাজমীন চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সুমন তাকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে।
নির্জন স্থানে নিয়ে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে সুমন। এ সময় কিশোরী তাজমীন তীব্র ধস্তাধস্তি ও চিৎকার শুরু করলে ঘাতক সুমন তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে। তাজমীন নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সুমন তার মাথা ও বুকে পা দিয়ে চেপে ধরে নির্মমভাবে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করে। নৃশংসতা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সুমন; তিনি তাজমীনের শখের আইফোন, স্কুলব্যাগ ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ব্যাগটি পাশের ধানখেতে ছুড়ে ফেলে সুমন অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলেই রেখে পালিয়ে যায়। পাপের দাগ মুছতে তিনি স্থানীয় একটি মসজিদের পুকুরে গিয়ে গোসলও করে।
ঘটনার পরদিন সকালে লালমাইয়ের ভোরাজগৎপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তাজমীনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া অটোরিকশার সূত্র ধরে তদন্ত নামে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে পালিয়ে যাওয়া সুমনকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাগমারা এলাকার একটি জঙ্গল ও পুকুরাড় থেকে নিহত তাজমীনের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। শনিবার রাতে আদালতের বিচারক মমিনুল হকের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর সুমনকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একজন মাদকাসক্ত ও বেপরোয়া অটোরিকশাচালক সুমনের এমন পৈশাচিকতায় পুরো এলাকায় শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
লালমাই থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঘাতক সুমন মিয়া একজন উচ্চ মাত্রার মাদকাসক্ত ছিলেন। তিনি নিয়মিত গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করত। তার অপকর্মে পরিবার থেকে স্বজনরা সবাই অতিষ্ঠ ছিল।

