শ্রমিককে ঠিকাদার সাজিয়ে রেলওয়ের কোটি টাকা লুট
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম
চট্টগ্রাম রেলওয়ে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ও শ্রমিককে ঠিকাদার সাজিয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থেকে প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এমন ঘটনায় রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এবং সীমান্ত ব্যাংকের মোট ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়। ঢাকা প্রধান কার্যালয়ে উপপরিচালক (অনু. ও তদন্ত-৫) তানভীর আহমদ স্বাক্ষরিত নির্দেশনা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। দুদক এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ হিসাব শাখা, সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স বিভাগ এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটে। ট্রেড লাইসেন্সে প্রতিষ্ঠানের যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কোহিনুর আক্তার নামে এক নারী শ্রমিককে ঠিকাদার সাজিয়ে অভিনব কায়দায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কথিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে একটি নথি তৈরি করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের নামে সীমান্ত ব্যাংকে খোলা হয় অ্যাকাউন্ট। ওই প্রতিষ্ঠানের নামে রেলওয়ে থেকে ইস্যু করা হয় ৯৭ লাখ টাকার চেক। সেই চেক যথারীতি জমা ও নগদায়ন হয়। পরে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই টাকা ধাপে ধাপে নগদে তুলে নেন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- ওই প্রতিষ্ঠানের নামে কোন কাজের বিপরীতে বিপুল অঙ্কের এই টাকা প্রদান করা হয়, তার কোনো উল্লেখ নেই রেলওয়ের নথিতে।
মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের কথিত মালিক কোহিনুর আক্তার ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। আবেদনে তার পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও ছবি সংযুক্ত ছিল।
দুদক অনুসন্ধানে আবেদনে দেওয়া ছবির সঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির মিল পায়নি। পরিচয়পত্রের প্রকৃত মালিক কোহিনুর আক্তার পেশায় একজন শ্রমিক। তিনি তেমন পড়াশোনা করেননি। কোনোরকমে স্বাক্ষর করতে পারেন বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। তার এনআইডি ব্যবহার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে, সেটিও তিনি জানেন না।
যারা আসামি হচ্ছেন:
এই জালিয়াতি ও টাকা আত্মসাতের ঘটনায় যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন—রেলওয়ের প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কার্যালয়ের ডিএফএ/স্টোরস শাখার তিন অডিটর- পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে, শাখার হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেন, অস্থায়ী কর্মচারী হাবিবুল্লাহ খান, অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান, হিসাবরক্ষক সৈয়দ সাইফুর রহমান ও মো. আবু নাছের।
সূত্র জানায়, স্টোরস শাখার তিন অডিটর পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে একই আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ‘আইবাস++’ ব্যবস্থায় ভুয়া বিল ও টোকেন এন্ট্রি করেন। পরে ওই শাখার হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেনের আইডি ব্যবহার করে বিলটি অনুমোদন করা হয়।
রেকর্ডপত্র সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপ-কর কর্মকর্তা মঞ্জুর উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর-কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই ভুয়া ব্যক্তিকে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেন। যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে দুদক জানিয়েছে।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় খোলা হিসাবে চেকটি জমা দেওয়া হয়। নানা জাল-জালিয়াতি থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া এবং অফিসার মো. পারভেজ কোনো ধরনের সন্দেহ বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই হিসাবটি খুলে দেন। এ কারণে তাদেরও মামলায় আসামি করা হচ্ছে।
দুদক সমন্বিত চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২ এর ডিডি মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে থেকে অভিনব কায়দায় প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া নথিপত্র তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলায় কমিশন মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
