ঠাকুরগাঁও-১
দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর লড়াইয়ে ফ্যাক্টর সংখ্যালঘু ও আ.লীগের ভোট
Advertisement
এটিএম সামসুজ্জোহা, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গোটা দেশের রাজনৈতিক নজর এখন উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের দিকে। আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তাপ বিরাজ করছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি এবং ঐতিহ্যবাহী এ আসনটিতে নতুন সমীকরণের জেরে নির্বাচনটি এখন দেশের অন্যতম হাই-প্রোফাইল ও প্রেস্টিজ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচনে হেভিওয়েট দুই প্রার্থী— রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই ও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ) এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের (দাঁড়িপাল্লা) মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ উপনির্বাচনের ফল কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি রাষ্ট্রপতির পরিবারের রাজনৈতিক ইমেজ এবং জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াতের প্রভাব বিস্তারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন সমীকরণ:
শুধু সংখ্যালঘু নয়, লক্ষ্য নিষিদ্ধ দলের ভোটও
ঐতিহাসিকভাবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনটিকে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি বা ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে গণ্য করা হতো। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭ বার, বিএনপি ৪ বার এবং জাতীয় পার্টি ১ বার জয়লাভ করেছিল। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং তাদের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের দৃশ্যপটের বাইরে থাকায় এ আসনে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।
৫ লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি ভোটারের এ আসনে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি সংখ্যালঘু (সনাতনী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) ভোটার রয়েছেন। জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এ ভোটগুলোর ওপর রয়েছে দুই প্রধান দল বিএনপি ও জামায়াতের কঠোর নজর। এর পাশাপাশি, নিষ্ক্রিয় বা প্রান্তিক হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মন জয় করতেও মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন প্রার্থীরা। ভোটের মাঠে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে দুই শিবিরই নানা কৌশল ও রণকৌশল নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।
সংখ্যালঘু ও সাধারণ ভোটারদের আস্থায় আনতে নানা প্রতিশ্রুতি:
বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন: নিজের শৈশব ও পারিবারিক সম্প্রীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, আমার বাড়ি তাঁতিপাড়া, মন্দিরের দেওয়াল আমাদের জায়গার সীমানা। আমাদের বাড়ির জবা ফুলে আপনাদের পূজা হয়, আর আপনাদের বাড়ির তুলসী গাছের পাতায় আমাদের অসুখ সারে। আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে কখনই আপনাদের ক্ষতি হতে দেব না।
তিনি বিগত দিনের মতো বিএনপির ঘাঁটিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে আত্মবিশ্বাসী।
জামায়াত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন: হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু ভাই-বোনদের ওপর যখন হামলা হয়েছিল, সেই সময় আমরা তাদের পাশে ছিলাম। আমি নির্বাচিত হলে সেই হামলার প্রতিটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা হবে। জামায়াত মূলত ঐতিহ্যগত বিএনপির এই দুর্গে ভাগ বসাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রশাসনের কড়া অবস্থান
নির্বাচন ঘিরে সাধারণ ভোটার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক শঙ্কা কাজ করলেও প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভোটাররা যাতে সম্পূর্ণ ভীতিমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা রোধে এবং সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পর্যাপ্তসংখ্যক বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে, যা ভোটের পরেও মাঠে সক্রিয় থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষপর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হলে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসতে পারলে এই উপনির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা দেবে।
