Logo
Logo
×

Advertisement

ডাক্তার আছেন

শুধু ‘সরি’ বললেই কি মুছে যায় সব কষ্ট? ক্ষমা চাওয়ার ৪ ধাপ

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

শুধু ‘সরি’ বললেই কি মুছে যায় সব কষ্ট? ক্ষমা চাওয়ার ৪ ধাপ

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা শুধু ভুল স্বীকার নয়, সম্পর্ক মেরামতেরও একটি প্রক্রিয়া। মনোবিজ্ঞানী মলি হাওয়েসের মতে, কার্যকর ক্ষমা প্রার্থনার জন্য প্রথমে অন্যের কষ্ট মন দিয়ে শুনতে হয়, এরপর নিজের দায় স্বীকার, ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হয়।

কাউকে কষ্ট দেওয়ার পর ‘সরি’ বলা সহজ। কিন্তু সেই কথায় কি সব অভিমান দূর হয়? সব ভুল কি আগের মতো সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে পারে? বাস্তবে, শুধু মুখে দুঃখ প্রকাশ করলেই অনেক সময় ক্ষত সারতে চায় না। প্রয়োজন হয় নিজের কাজের প্রভাব বোঝা, দায় নেওয়া এবং আচরণে পরিবর্তন আনার।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী মলি হাওয়েস তার এ গুড অ্যাপোলজি: ফোর স্টেপস টু মেক থিংস রাইট বইয়ে আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনার চারটি ধাপ তুলে ধরেছেন। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ও পরামর্শদানের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়।

ক্ষমা চাওয়া কঠিন কেন?

মানুষের পক্ষে নিজের ভুল স্বীকার করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। হাওয়েসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে চায়। নিজের সিদ্ধান্ত বা আচরণ ভুল ছিল কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করতে মানসিক পরিশ্রম প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিজের ভুল এবং অন্যের ওপর তার প্রভাব বুঝতেও আমরা অনেক সময় ব্যর্থ হই।

এ ছাড়া নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ধরে রাখার প্রবণতাও ক্ষমা চাওয়ার পথে বাধা তৈরি করে। কেউ নিজেকে ভালো মানুষ মনে করলে অন্য কেউ তার আচরণে কষ্ট পেয়েছে— এ কথা মেনে নিতে তার অস্বস্তি হতে পারে। কারণ, নিজের ভালো মানুষ হওয়ার বিশ্বাসের সঙ্গে অন্যকে আঘাত করার বাস্তবতা সাংঘর্ষিক মনে হয়।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আত্মবিশ্বাসী থাকা এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে মানুষ নিজের ভুল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে অনীহা বোধ করতে পারে।


প্রথম ধাপ: আগে শুনুন, পরে বলুন ‘সরি’

হাওয়েসের চার ধাপের প্রথমটিই অনেকের কাছে বিস্ময়কর। তার মতে, আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনার শুরুতে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলার প্রয়োজন নেই; বরং যাকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, তার অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।

এ পর্যায়ে নিজের উদ্দেশ্য, যুক্তি কিংবা চরিত্র ভালো প্রমাণ করার চেষ্টা মুখ্য নয়। বরং নিজের কাজ বা নিষ্ক্রিয়তা অন্য ব্যক্তির ওপর কী প্রভাব ফেলেছে, সেটি বোঝাই প্রধান লক্ষ্য।

অনেক সময় আমরা মনে করি, নিজের আচরণে অন্য ব্যক্তি কতটা কষ্ট পেয়েছেন, তা আমরা জানি। কিন্তু বাস্তবে সেই ধারণা ভুল হতে পারে। এমনকি কাছের মানুষের অনুভূতি বুঝতেও আমরা ব্যর্থ হতে পারি।

তাই আত্মপক্ষ সমর্থন না করে অপর ব্যক্তিকে তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া জরুরি। এতে তার কষ্টের প্রকৃত কারণ বোঝা সহজ হয়।

দ্বিতীয় ধাপ: নিজের দায় স্বীকার করুন

অন্যের অভিজ্ঞতা মন দিয়ে শোনার পর আসে দায় স্বীকারের পালা। হাওয়েসের মতে, এ সময় আত্মপক্ষ সমর্থন না করে নিজের আচরণের প্রভাব মেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

‘তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি দুঃখিত’ কিংবা ‘তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ বলে দুঃখিত’—এ ধরনের বক্তব্যে ক্ষমা প্রার্থনার দায়িত্ব অন্য ব্যক্তির অনুভূতি বা বোঝার ওপর ঠেলে দেওয়া হতে পারে।

এর পরিবর্তে ‘আমার আচরণে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য আমি দুঃখিত’—এ ধরনের বক্তব্য বেশি দায়িত্বশীল। এতে নিজের কাজের কারণে অন্য ব্যক্তি কষ্ট পেয়েছেন, সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে কাউকে কষ্ট দেওয়ার অর্থ সব সময় এই নয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় করেছেন। ভুল বোঝাবুঝি বা অনিচ্ছাকৃত আচরণেও কেউ আঘাত পেতে পারেন। হাওয়েসের মতে, ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্য শাস্তি মেনে নেওয়া নয়; বরং নিজের আচরণের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সম্পর্ক মেরামতের দায়িত্ব নেওয়া।

তৃতীয় ধাপ: ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা

ক্ষমা প্রার্থনার তৃতীয় ধাপ হলো ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। ব্যক্তিগত সম্পর্কে এই উদ্যোগ সব সময় অর্থ বা বস্তু দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকী কোনো পদক্ষেপও সম্পর্কের ক্ষত সারাতে সাহায্য করতে পারে।

যেমন, কারও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান নষ্ট করে ফেললে আবার সেই অনুষ্ঠান আয়োজনের চেষ্টা করা যেতে পারে। কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে নতুন করে সেই কাজটি সঠিকভাবে করার সুযোগ চাওয়া যেতে পারে।

অতীতের ঘটনা বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একই অভিজ্ঞতা আরও ভালোভাবে তৈরি করার চেষ্টা করা যায়। হাওয়েসের মতে, এমন উদ্যোগ সম্পর্কের মানুষদের একসঙ্গে নতুন ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরির সুযোগ দেয়।

চতুর্থ ধাপ: একই ভুল যেন আবার না হয়

ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায়ই উপেক্ষিত ধাপ হলো আচরণে বাস্তব পরিবর্তন আনা। অন্য ব্যক্তি ক্ষমা করে দিলে কিংবা সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে অনেকেই মনে করেন, সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু একই আচরণ আবার ঘটলে পুরোনো কষ্ট নতুন করে ফিরে আসতে পারে।

শুধু ‘আর এমন হবে না’ বলে প্রতিশ্রুতি দিলেই যথেষ্ট নয়। যে পরিস্থিতি বা অভ্যাসের কারণে ভুলটি ঘটেছে, তা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে।

যেমন, সময়মতো দায়িত্ব পালন করতে না পারার কারণে সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হলে শুধু ক্ষমা চাওয়ার বদলে সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বারবার কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ধরন বদলানো এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা জরুরি।

হাওয়েসের মতে, পরিবর্তনের পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ভালো উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হতে পারে। তাই ক্ষমা প্রার্থনার শেষ ধাপটি শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ব্যবস্থা তৈরি করা।

ভাঙা সম্পর্কও কি নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে?

জাপানি শিল্পধারণা ‘কিনৎসুকুরোই’-এর উদাহরণ দিয়ে হাওয়েস সম্পর্ক মেরামতের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। এ পদ্ধতিতে ভাঙা মাটির পাত্রের ফাটল সোনালি উপাদান দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। ফলে ভাঙনের চিহ্ন পুরোপুরি আড়াল না হয়ে নতুন সৌন্দর্যের অংশ হয়ে ওঠে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আঘাত বা ভুলের স্মৃতি থেকে যেতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষত কীভাবে মেরামত করা হচ্ছে, তা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দুজন মানুষ যখন নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন, ক্ষতির দায় স্বীকার করেন এবং সম্পর্ক ঠিক করার জন্য একসঙ্গে কাজ করেন, তখন তাঁদের মধ্যে নতুন ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হতে পারে। অতীতের ভুল তখন শুধু কষ্টের স্মৃতি হয়ে না থেকে সম্পর্ককে আরও ভালোভাবে বোঝার উপলক্ষও হতে পারে।

ক্ষমা গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাড়াহুড়া নয়

শুধু ক্ষমা চাওয়াই নয়, ক্ষমা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সময় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাক— এই আশায় মানুষ নিজের কষ্ট পুরোপুরি প্রকাশ করার আগেই ক্ষমা করে দেন। এতে সমস্যার প্রকৃত কারণ অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।

হাওয়েসের পরামর্শ, কষ্ট পাওয়া ব্যক্তির নিজের অনুভূতি বোঝা এবং প্রকাশ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় নেওয়া উচিত। তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলতে প্রস্তুত না থাকলে পরে আলোচনা করার সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে।

ক্ষমা গ্রহণ মানেই সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক করে ফেলতে হবে—এমন নয়। সম্পর্কের ক্ষত কতটা গভীর, কী ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন, তা বোঝার সুযোগ থাকা জরুরি।

কখন ক্ষমা চাওয়া উচিত নয়?

হাওয়েসের মতে, আন্তরিকতা ছাড়া ক্ষমা চাওয়ার কোনো অর্থ নেই। শুধু পরিস্থিতি সামাল দিতে কিংবা অন্য ব্যক্তিকে শান্ত করতে এমন কথা বলা উচিত নয়, যা নিজের বিশ্বাস বা উপলব্ধির সঙ্গে মেলে না।

আবার কেউ যদি স্পষ্টভাবে সম্পর্কের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বা ওই ঘটনা নিয়ে আর কথা বলতে নিষেধ করেন, তাহলে তাঁর সিদ্ধান্তকে সম্মান করা প্রয়োজন। ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অপর ব্যক্তির সীমারেখা অমান্য করা ঠিক নয়।

সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ না থাকলেও নিজের আচরণ নিয়ে ভাবা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ক্ষতি না করার চেষ্টা করা সম্ভব।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

প্রতিদিন ‘ইনুলিন’ খেলেই কমতে পারে বাতের ব্যথা, বলছে গবেষণা

প্রতিদিন ‘ইনুলিন’ খেলেই কমতে পারে বাতের ব্যথা, বলছে গবেষণা

মিষ্টি আলুতে মিলবে চোখের সুরক্ষা, জানুন আরও ১০ গুণ

মিষ্টি আলুতে মিলবে চোখের সুরক্ষা, জানুন আরও ১০ গুণ

হেপাটাইটিস বি ও সি যেভাবে লিভার ক্যানসারে রূপ নেয়, জানালেন বিশেষজ্ঞ

হেপাটাইটিস বি ও সি যেভাবে লিভার ক্যানসারে রূপ নেয়, জানালেন বিশেষজ্ঞ

প্রস্রাবেই ধরা পড়বে মূত্রথলি ক্যানসার, জানা যাবে কোন চিকিৎসায় মিলবে সমাধান

প্রস্রাবেই ধরা পড়বে মূত্রথলি ক্যানসার, জানা যাবে কোন চিকিৎসায় মিলবে সমাধান

চেষ্টা না করেই কীভাবে আরও বেশি ব্যায়াম করা যায়?

চেষ্টা না করেই কীভাবে আরও বেশি ব্যায়াম করা যায়?

দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি, চোখের যেসব লক্ষণ এড়িয়ে যাবেন না

দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি, চোখের যেসব লক্ষণ এড়িয়ে যাবেন না

আরও পড়ুন

প্রতিদিন ‘ইনুলিন’ খেলেই কমতে পারে বাতের ব্যথা, বলছে গবেষণা

প্রতিদিন ‘ইনুলিন’ খেলেই কমতে পারে বাতের ব্যথা, বলছে গবেষণা

শুধু ‘সরি’ বললেই কি মুছে যায় সব কষ্ট? ক্ষমা চাওয়ার ৪ ধাপ

শুধু ‘সরি’ বললেই কি মুছে যায় সব কষ্ট? ক্ষমা চাওয়ার ৪ ধাপ

স্ট্রোক প্রতিরোধ যোগ্য

স্ট্রোক প্রতিরোধ যোগ্য

ত্বকের বয়সের ছাপ কমাতে কোলাজেন নাকি রেটিনল, কোনটি বেশি কার্যকর?

ত্বকের বয়সের ছাপ কমাতে কোলাজেন নাকি রেটিনল, কোনটি বেশি কার্যকর?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম