ডেঙ্গু জ্বর কমার পরই বাড়তে পারে বিপদ, যেসব লক্ষণে সতর্কতা জরুরি
ডা. নওরোজ আহমেদ রায়হান
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডেঙ্গু জ্বরকে অনেকে সাধারণ জ্বর মনে করে বাড়িতে চিকিৎসা নিতে থাকেন। কিন্তু জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, কাশি কিংবা পেটব্যথা দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি বমি ভাব ও ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জটিল আকার ধারণ করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।
শ্বাসকষ্ট ও কাশি কেন হয়?
ডেঙ্গুতে শ্বাসকষ্টের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। গুরুতর ডেঙ্গুতে রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে বুকের গহ্বরে জমতে পারে, যাকে প্লুরাল ইফিউশন বলা হয়। ফুসফুসের চারপাশে তরল জমলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া ফুসফুসে পানি জমা, রক্তক্ষরণ, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা কিংবা ডেঙ্গুর পাশাপাশি নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণও শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে। অনেক সময় অতিরিক্ত স্যালাইন নিলেও এ রকম হতে পারে।
কাশি ডেঙ্গুর প্রধান বা নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। তবে জ্বরের সঙ্গে কাশি ও শ্বাসকষ্ট থাকলে ফুসফুসের সংক্রমণসহ অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ যাচাই করা প্রয়োজন। সব শ্বাসকষ্টকে ডেঙ্গুর জটিলতা ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি একে সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে অবহেলা করাও উচিত নয়।
পেটব্যথা কি ডেঙ্গুর বিপদের সংকেত?
ডেঙ্গুতে তীব্র বা একটানা পেটব্যথা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এর সঙ্গে বারবার বমি, পেট ফুলে যাওয়া, রক্তবমি, কালো পায়খানা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ শরীরে তরলের ভারসাম্যহীনতা, রক্তক্ষরণ অথবা গুরুতর ডেঙ্গুর ইঙ্গিত হতে পারে।
বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী বিপদমুক্ত নন। ডেঙ্গুর সংকটকাল অনেক সময় জ্বর শুরুর তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে, বিশেষত জ্বর কমার সময় শুরু হতে পারে।
কখন হাসপাতালে যেতে হবে?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
- শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
- তীব্র বা একটানা পেটব্যথা।
- বারবার বমি বা কিছুই খেতে না পারা।
- নাক, মাড়ি বা অন্য স্থান থেকে রক্তপাত।
- অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অস্থিরতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া অথবা প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।
শ্বাসকষ্ট বা গুরুতর সতর্কসংকেত থাকলে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়া কিংবা নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া নিরাপদ নয়।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় কী সতর্কতা প্রয়োজন?
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় রোগের দিন, শারীরিক পরীক্ষা, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, হেমাটোক্রিট ও প্লাটিলেটসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল বিবেচনা করতে হয়। শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে রোগের তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না।
পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ, তবে শ্বাসকষ্ট বা শরীরে তরল জমার লক্ষণ থাকলে অতিরিক্ত তরল দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। তাই তরল দেওয়ার পরিমাণ রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন। জ্বর ও ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও অন্যান্য এনএসএআইডি-জাতীয় ব্যথানাশক এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
জনসচেতনতাই পারে জটিলতা কমাতে
ডেঙ্গুতে সময়মতো বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, কাশি বা পেটব্যথা থাকলে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট ও তীব্র পেটব্যথা দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মনে রাখুন:
ডেঙ্গুতে শুধু জ্বর কমানোর দিকে নজর না দিয়ে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস, পেটব্যথা, প্রস্রাবের পরিমাণ ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
লেখক
ডা. নওরোজ আহমেদ রায়হান
সহকারী অধ্যাপক (বক্ষব্যাধি মেডিসিন ও অ্যালার্জি, স্লিপ অ্যাপনিয়া বিশেষজ্ঞ)
চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, কচুক্ষেত শাখা, মিরপুর-১৪
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯

-6aeb2a6fe01ec.jpg)