ক্যানসার নিয়ে ১০ ভুল ধারণা, আসল সত্য যা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্যানসার শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে মৃত্যুভয়, দীর্ঘ চিকিৎসা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেসে ওঠে। রোগটি নিয়ে সমাজে প্রচলিত রয়েছে নানা ভুল ধারণা। কেউ মনে করেন ক্যানসার হলেই মৃত্যু অনিবার্য, আবার কেউ বিশ্বাস করেন এটি ছোঁয়াচে কিংবা বংশপরম্পরায় ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি মোবাইল ফোন, বিদ্যুতের লাইন ও কৃত্রিম মিষ্টিকারকও ক্যানসারের কারণ বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এসব ধারণার সবই কি সত্য?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে ক্যানসারে প্রায় ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই রোগ। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে ক্যানসার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসার সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা দূর করা জরুরি।
ক্যানসার নিয়ে ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা ও বাস্তবতা তুলে ধরা হলো।
১. ক্যানসার মানেই মৃত্যু
এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সব ধরনের ক্যানসার প্রাণঘাতী নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে অনেক ক্যানসার এখন নিরাময়যোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৯৯০-এর দশক থেকে ক্যানসারে মৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। বর্তমানে স্তন, প্রোস্টেট ও থাইরয়েড ক্যানসারের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশ বা তার বেশি। সব ধরনের ক্যানসার মিলিয়ে এ হার প্রায় ৬৭ শতাংশ। তবে ক্যানসারের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ভিন্ন হয়।
২. ক্যানসার ছোঁয়াচে রোগ
ক্যানসার একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা, খাওয়া কিংবা স্পর্শের মাধ্যমে ক্যানসার ছড়ানোর আশঙ্কা নেই। তবে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) এবং হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের মতো কিছু সংক্রমণ পরবর্তী সময়ে জরায়ুমুখ ও যকৃতের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ সংক্রমণকারী ভাইরাস ছড়াতে পারে, ক্যানসার নয়।
৩. মোবাইল ফোন ব্যবহারে ক্যানসার হয়
মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ নির্গত হয়। এটি নন-আয়োনাইজিং বিকিরণ। এখন পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্কের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এক্স-রের মতো আয়োনাইজিং বিকিরণ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তবে মোবাইল ফোনের বিকিরণ এ ধরনের নয়।
৪. বিদ্যুতের লাইন থেকে ক্যানসার হয়
বিদ্যুতের লাইন থেকে অত্যন্ত কম কম্পাঙ্কের চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। এটিও নন-আয়োনাইজিং বিকিরণ। গবেষণায় সাধারণত এর সংস্পর্শে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও বিদ্যুতের লাইনের কাছাকাছি বসবাসকারী শিশুদের লিউকেমিয়ার ঝুঁকি নিয়ে কিছু গবেষণায় সামান্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে, এর প্রকৃত কারণ এখনো পরিষ্কার নয়।
৫. কৃত্রিম মিষ্টিকারক ক্যানসার সৃষ্টি করে
স্যাকারিন, অ্যাসপারটেমসহ বিভিন্ন কৃত্রিম মিষ্টিকারক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে এসব উপাদান গ্রহণের সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্কের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাঁচ লাখের বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে করা একটি গবেষণাতেও অ্যাসপারটেম গ্রহণের সঙ্গে লিম্ফোমা, লিউকেমিয়া কিংবা মস্তিষ্কের ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
৬. ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে
এ ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। অস্ত্রোপচারের সময় ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও তা অত্যন্ত বিরল। আধুনিক অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম ও উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তির কারণে এ ঝুঁকি অনেক কমেছে। আবার অস্ত্রোপচারের সময় টিউমার বাতাসের সংস্পর্শে এলে দ্রুত বড় হয়ে যায় বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, এমন ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
৭. ভেষজ ওষুধে ক্যানসার নিরাময় হয়
কোনো ভেষজ ওষুধ ক্যানসার নিরাময় করতে পারে, এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে কিছু বিকল্প পদ্ধতি, যেমন মেডিটেশন, আকুপাংচার ও যোগব্যায়াম ক্যানসার চিকিৎসার কারণে তৈরি মানসিক চাপ ও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে সহায়ক হতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক উপাদান মানেই নিরাপদ নয়। কিছু ভেষজ উপাদান ও সাপ্লিমেন্ট ক্যানসারের ওষুধের কার্যকারিতায় বাধা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব গ্রহণ করা উচিত নয়।
৮. ক্যানসার শুধু বংশগত কারণে হয়
কিছু ক্যানসারের সঙ্গে বংশগত জিনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সব ক্যানসার বংশগত নয়। ধারণা করা হয়, মাত্র ৩ থেকে ১০ শতাংশ ক্যানসারের পেছনে বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া জিনগত পরিবর্তন দায়ী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের জীবদ্দশায় কোষের জিনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন জমা হওয়ার কারণে ক্যানসার তৈরি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বাড়ে।
৯. ক্যানসার একবার হলে আবার ফিরে আসবেই
এটিও ভুল ধারণা। চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। তবে ক্যানসারের ধরন, পর্যায় এবং চিকিৎসার ফলাফলের ওপর পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি নির্ভর করে। কোনো কোনো ক্যানসার চিকিৎসার পর দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও ফিরে আসতে পারে। তাই চিকিৎসা শেষ হলেও নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা জরুরি।
১০. ক্যানসারের কোনো নিরাময় নেই
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। কিছু ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। যেমন অণ্ডকোষ ও থাইরয়েড ক্যানসারের ক্ষেত্রে নিরাময়ের হার উল্লেখযোগ্য। স্তন, প্রোস্টেট ও মূত্রথলির ক্যানসারের ক্ষেত্রেও অনেক রোগী দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপন করেন।
ক্যানসারের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও ঝুঁকির বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে

-6aeb47111d979.jpg)
-6aeb4622533fb.jpg)