যুদ্ধের কারণে যে মূল্য দিতে হচ্ছে ইরানের সাধারণ মানুষকে
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬, ০২:২০ পিএম
পারাশতেশ দাহাঘিন (মাঝে), বেরিভান মোলান (বাঁয়ে)- যুদ্ধে নিহত বেসামরিক নাগরিকদের দীর্ঘ তালিকায় থাকা দুই ইরানি নাগরিক এবং (ডানে)তেহরানের বাসিন্দা নার্গেস নামের এই নারীর বাসভবনে হামলা হয় ২১শে মার্চ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ওষুধের দোকানে কাজ করতেন তরণী পারাশতেশ দাহাঘিন। বিস্ফোরণের আঘাতে মারা যাওয়ার সময় তিনি কাজেই ব্যস্ত ছিলেন। আবার বেরিভান মোলানির মাথায় যখন বিস্ফোরণের অভিঘাতে ধ্বংসস্তূপ এসে পড়ে, তখন তিনি বিছানায় শুয়ে ছিলেন।
গত তিন সপ্তাহে তেহরানসহ ইরানের নানা শহরে বার বার আকাশ পথে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলি বাহিনী। গোটা দেশজুড়ে কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হানা দিয়েছে সেই সব ক্ষেপণাস্ত্র। হামলাগুলোতে শুধুই যে প্রাপ্তবয়স্ক বেসামরিক মানুষরা নিহত হয়েছেন, তা নয়। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শারদাশতে এরকমই এক হামলায় আহত হওয়ার একদিন পরে মারা গেছে তিন বছরের শিশু এইলমাহ্ বিল্কি।
বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার তালিকাটা দ্রুত দীর্ঘ হচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকের কথা কখনই হয়ত জানা যাবে না। তবে যুদ্ধের কালো ধোঁয়া ওঠা আর ইন্টারনেট বন্ধ থাকা ইরানের অভ্যন্তর থেকে সামান্যই তথ্য বাইরে বেরিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইল ইরানের ওপরে যে যুদ্ধ চালাচ্ছে, তাতে নিহত বেসামরিক মানুষদের হাতে গোনা কয়েকজনের নামই এখনও পর্যন্ত জানা যাচ্ছে।
তেহরানের আপাদানা এলাকার ওষুধের দোকানে যখন কাজ করছিলেন পারাশতেশ দাহাঘিন, তার কাছেই একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার অফিস ভবনে হামলা হয়। ইরানের মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন সেন্টার জানাচ্ছে যে, সম্ভবত ইরানে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে ওই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাটি যুক্ত ছিল।
অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, দাহাঘিনের একটি বাঁধানো ছবি, তার চারদিকে মোমবাতি জ্বলছে, আর ফুল রাখা আছে। শোকাহত আত্মীয় পরিজন আর সুহৃদরাও রয়েছেন ওই ভিডিওতে।
তার ভাই পূরিয়া ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন যে, তার বোন যখন মারা যায়, তখন তো সে নিজের কাজটাই করছিল। তার কথায়, পরিবারের সদস্যরা তার বোনকে বলেছিলেন যে তেহরানে বিপদ হতে পারে, তবে দাহাঘিন জবাব দিয়েছিলেন, ‘মানুষের প্রয়োজন আমাকে। অনেক মানুষ আঘাত পেয়েছেন। তারা ওষুধের দোকানে আসছেন। বয়স্কদেরও ওষুধ দরকার। মানুষকে সাহায্য করতে আমাকে যে থাকতেই হবে এখানে।’
বোনের স্মুতিতে ভাই লিখেছেন, ‘তুমি মহান ছিলে।’
তবে তিন বছর বয়সি এইলামহ্ বিল্কির কথা খুব কমই জানা যাচ্ছে। তার ছবিটি বিবিসিকে দিয়েছে কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও। তারা বলছে, আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলের হামলায় ওই কন্যাশিশুটি ভয়ানক রকম আহত হয় মার্চের শুরুর দিকে। একদিন পরে সে মারা যায়।
এদিকে অনলাইনে পোশাকের দোকান চালাতেন ২৬ বছর বয়সি বেরিভিয়ান মোলানি। একই সঙ্গে লাইফস্টাইল ব্লগও বানাতেন তিনি। পরিবারের একমাত্র সন্তান মোলানি উত্তর ইরানের নিরাপদ অঞ্চল ছেড়ে তেহরানে ফিরে এসেছিলেন মারা যাওয়ার মাত্র একদিন আগে। নিজের বাড়ি খুব মিস করছিলেন তিনি, তাই নিজের শহরে ফিরে আসা।
তার পরিবার বলছে যে, তাদের ধারণাই ছিল না যে তেহরানের উচ্চবিত্ত এলাকা জাফারানইয়েহর মাকোইপোর স্ট্রিটে তাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকেই থাকেন ইরানের গোয়েন্দা বিভাগের মন্ত্রী এসমাইল খাতিব।
মোলানির বন্ধু রাজিয়েহ্ জানবাজ ইনস্টাগ্রামের এক পোস্টে জানিয়েছেন এ কথা।
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সেই রাতের যে ভিডিও প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা গেছে যে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মোলানির মাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। তখনও তিনি জানতে চেয়েছেন, ‘আমার মেয়ে কি বেঁচে আছে’?
ততক্ষণে মোলানিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনা হয়েছে। তার আঘাত এতটাই গভীর ছিল যে তাতেই তার মৃত্যু হয়।
রাজিয়েহ্ জানবাজ লিখেছেন, ‘বিছানায় শুয়ে পড়েছিল ও, তখনও ঘুমায় নি। ১৭ই মার্চের ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিছানায় শোয়া অবস্থাতেই মারা যায় ও।’
বেরিভিয়ান মোলানির কয়েকজন প্রতিবেশীরও ওই ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মৃত্যু হয়েছে। তবে গত সপ্তাহের ওই হামলার লক্ষ্য ছিলেন মন্ত্রী খাতিব। ইরানের জাতীয় হ্যান্ডবল দলের প্রাক্তন সদস্য রাজিয়েহ্ জানবাজ বলছেন, ওই হামলার পরেই তিনি সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। বন্ধুর চিহ্ন বলতে শুধুই রাস্তায় পড়ে থাকা একজোড়া জুতো দেখতে পান তিনি।
তার ভাষায়, ‘এই পরিবারটা নিজেদের সন্তানকে নিরাপদে রাখতে যতদূর ক্ষমতা, সব কিছু করেছে। তবুও শেষে এসে তাকে হারাতে হল, অথচ ওরা জানতই না যে বাড়ির উল্টোদিকে কে বাস করেন!’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংক্রান্ত সংবাদ সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি বা এইচআরএএনএ এখনও পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়ার তথ্য নথিবদ্ধ করেছে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশই শিশু।
সবথেকে ভয়াবহ হামলা হয় মিনাবের এক স্কুলে
সব থেকে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলোর অন্যতম চালানো হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি প্রাথমিক স্কুলে। সেটা ছিল যুদ্ধের শুরুর দিকে।
কাছাকাছি থাকা একটি সামরিক ঘাঁটিই লক্ষ্যবস্তুতে ওই হামলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে ওই স্কুলে হামলার কথা এখনও প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি মার্কিন সামরিক বাহিনী। তারা শুধু বলেছে যে তারা ঘটনাটির তদন্ত করছে।
কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও অবশ্য ওই স্কুলে নিহত ৪৮টি শিশু এবং দশজন প্রাপ্তবয়স্ককে চিহ্নিত করতে পেরেছে।
ক্রমবর্ধমান বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুতে হেনগাওয় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইরান কখনই নিজেদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান প্রকাশ করে না। তবে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মৃত্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১ হাজার ১৬৭ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছে, তবে হেনগাও জানাচ্ছে যে ওই সংখ্যাটি পাঁচ হাজারেরও বেশি
যুদ্ধ চলাকালীন ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য আবার ইরানের অনেক নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন। তাই, তৃণমূল স্তরে ভালো যোগাযোগ আছে, এমন মানবাধিকার সংগঠনগুলির পক্ষেও নিহতদের ব্যাপারে তথ্য জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও বলছে, ইরানের কোনো নাগরিককে ইরাকি ফোন দিয়ে ইরাকের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেখলেই গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইরানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে। দুই দেশের সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলে ইরাকের ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক কখনও কখনও কাজ করে। এরকম নির্দেশের কারণ ইরানের প্রশাসন চায় যে তাদের নাগরিকদের ওপরে নিয়ন্ত্রণ থাকুক, এবং তারা যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারি ভাষ্যটাই জানুক।
হেনগাওয়ের আওয়ার শেখি বলছিলেন, ‘সাধারণ মানুষের জন্য এ এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ আতঙ্কে আছেন।’ তার ভাষায়, ‘এবছরই, আগের দিকে ইরানের সরকার মানুষকে রাস্তায় মেরে ফেলেছে, এখন তারা বোমা হামলায় মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে পড়েছে।’
তিনি বলছেন যে সাধারণ মানুষের বসবাসের এলাকায় সরকারি ভবন রয়েছে আর তেহরানের মতো বড়ো শহরেও কোনো বম্ব-শেল্টার নেই।
তিনি এ ঘটনাকে ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
যুদ্ধের জন্য ‘উদ্বেগজনক’ মূল্য দিতে হচ্ছে বেসামরিক নাগরিকদের
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি বলছে, বেসামরিক নাগরিকরা এ যুদ্ধের জন্য ‘উদ্বেগজনক’ মূল্য চোকাচ্ছেন।
রেড ক্রিসেন্টের একজন কর্মী হামিদরেজা জাহানবক্স মারা গেছেন, এবং রেড ক্রিসেন্টের বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রতিনিধিদলের প্রধান ভিনসেন্ট কাসার্ড বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনটা স্পষ্ট – বেসামরিক নাগরিক এবং বেসামরিক অবকাঠামো হামলার বাইরে থাকবে। স্বাস্থ্য কর্মী এবং উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা পরিবহন আর স্থাপনাগুলি এবং মানবিক পরিষেবা দেওয়া ব্যক্তিদের সম্মান দিতে হবে, তাদের সুরক্ষা দিতে হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও নিশ্চিত করেছে যে, ২০টিরও বেশি স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী স্থাপনার ওপরে হামলা হয়েছে। এর বাইরে আরও কিছু স্থাপনার ওপরে হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অন্তত নয়জন স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারীর মৃত্যু হয়েছে।
ওই সংস্থার পরিভাষা অনুযায়ী, পারিপার্শ্বিক ক্ষয়ক্ষতি বা কোল্যাটারাল ড্যামেজকে হামলা হিসাবেই দেখা হয়।
হামলা চালানো হচ্ছে হাসপাতালেও
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনকারী আয়ান ক্লার্ক বলেন, ‘এটা আমাদের দেখার কথা না যে নির্দিষ্ট করে ওই স্থাপনাটিকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল না কি লক্ষ্য ছিল পাশের কোনো স্থাপনা।’
ক্লার্কের ভাষায়, ‘এটা স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপরে আঘাত। এর দায় বর্তায় তাদের ওপরে যারা বেসামরিক মানুষদের রক্ষা করতে সংঘাতে জড়িয়েছেন তাদেরই উচিত স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপরে যাতে অভিঘাত না আসে, সেটা নিশ্চিত করা আর সেগুলিকে সুরক্ষিত রাখা তাদেরই দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য পরিষেবায় যেকোনো ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।’
যুক্তরাষ্ট্র আগে বলেছে যে তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে না এবং এই প্রতিশ্রুতি তারা গুরুত্ব সহকারে পালন করে।
বিবিসি এমন বেশ কয়েকটি ভিডিও যাচাই করে দেখেছে, যার মধ্যে আছে কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল। এগুলির মধ্যে একটি হল তেহরানের ১৭ তলা গান্ধী হাসপাতাল। এই হাসপাতালটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনের কাছেই অবস্থিত। মনে করা হয় যে ওই টেলিভিশন ভবনটিই লক্ষ্যবস্তু ছিল। এছাড়াও পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মাহাবাদ শহরে রেড ক্রিসেন্ট পরিচালিত একটি হাসপাতাল যেমন আছে, তেমনই যাচাই করা ওই ভিডিওর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বুশেহারের একটি হাসপাতাল, যে ভিডিওতে দেখা গেছে যে তেসরা মার্চ ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইনকিউবেটরে থাকা সদ্যোজাতদেরও বাইরে বের করে আনা হচ্ছে।
ইরানের শল্যচিকিৎসক হাশিম মোয়াজেনজাদেহ্ বলছেন যে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই আহত বিক্ষোভকারীর প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন যে ডাক্তাররা, সরকারি হাসপাতালের সেই সব চিকিৎসকরা এখন বলছেন যে তারা ভীষণ ক্লান্ত।
তিনি বর্তমানে ফ্রান্সে চিকিৎসা করেন, তবে তেহরানে তার পুরানো সহকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।
তার কথায়, ‘যেসব বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো বিরাট আকারের। বহুসংখ্যক বেসামরিক মানুষ মারা যাচ্ছেন।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
