Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড়, আতঙ্কে প্রবাসীরা

Advertisement

Icon

আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড়, আতঙ্কে প্রবাসীরা

এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে।

Advertisement

মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানে ব্যাপক ধরপাকড় ঘিরে আতঙ্ক বাড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে। কর্মক্ষেত্র, নির্মাণাধীন ভবন, কারখানা, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে আটক হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিক।

বৈধ কাগজপত্র না থাকা, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া কিংবা কাজের অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেফতার ও দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন অনেক কর্মী। পরিবারের ভরণপোষণ, ঋণের বোঝা আর দেশে স্বজনদের ভবিষ্যৎ সবকিছু সামলে যারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তাদের অনেকের জীবনেই এখন অনিশ্চয়তার ছায়া।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ১১ হাজার ১১০টি অভিযানে ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। এ সময়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৫৩ জনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১ হাজার ৯৬৬ জন নিয়োগকর্তাকেও আটক করা হয়েছে। আর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৫৯৭ জন বিদেশিকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

এ পরিসংখ্যান মালয়েশিয়ায় অভিবাসন আইন প্রয়োগের ব্যাপকতা তুলে ধরলেও বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে কতজন আটক ও প্রত্যাবাসিত হয়েছেন, সামগ্রিক হিসাবে তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ নেই।

অভিযানের তীব্রতা বোঝা যায় অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের পরিসংখ্যানে। ১২ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনে ২৫২টি অভিযান পরিচালনা করে ৪ হাজার ৯০৭ জনের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। এ সময় ২ হাজার ১৫৬ জন বিদেশিকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫১ জন নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ বলছে, বৈধ ভ্রমণ নথি বা অবস্থানের অনুমতি না থাকা, ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করা এবং অনুমোদিত শর্তের বাইরে কাজ করা অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ। সামাজিক ভ্রমণ ভিসায় প্রবেশ করে বৈধ কর্মানুমতি ছাড়া কাজ করাও অপরাধের আওতায় পড়ে।

ফলে শুধু অবৈধভাবে প্রবেশ করলেই নয়, বৈধভাবে প্রবেশের পর ভিসা বা কর্মানুমতির শর্ত ভঙ্গ করলেও আটক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

অভিযানের জালে বাংলাদেশিরাও

মালয়েশিয়ায় এর আগের অভিযানগুলোতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি আটক হয়েছেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরের লেবুহ পুদু এলাকায় পরিচালিত সমন্বিত অভিযানে প্রায় আড়াই হাজার বিদেশির কাগজপত্র যাচাই করে ৪৭২ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ৩৬৪ জন ছিলেন বাংলাদেশি।

এ ছাড়া ৮ অক্টোবর সেলাঙ্গরের সেরি কেম্বাঙ্গান ও বান্দার বারু ক্লাং এলাকায় অভিযানে ৩০৭ জনের কাগজপত্র যাচাই করে ১৭৪ জন বিদেশিকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি ছিলেন। ওই অভিযানে ছয়জন স্থানীয় নিয়োগকর্তাকেও আটক করা হয়।

নিয়োগকর্তাদেরও ছাড় নেই

অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে শুধু বিদেশি কর্মীদের আটক নয়, তাদের নিয়োগ দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে ১ হাজার ৯৬৬ জন নিয়োগকর্তাকে আটক করার তথ্য তারই ইঙ্গিত দেয়।

অভিবাসন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ৪ কোটি ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫০ রিঙ্গিত জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে বিদেশি অভিবাসীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ৩ কোটি ৭১ লাখ ২৩ হাজার ৪২০ রিঙ্গিত।

এদিকে মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দিতে পরিচালিত ‘মাইগ্র্যান্ট রিপ্যাট্রিয়েশন প্রোগ্রাম ২.০’-এর আওতায় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ১২ হাজার ১৪৬ জন নিবন্ধন করেছেন। এ কর্মসূচির মাধ্যমে আদায় হয়েছে ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৪০ রিঙ্গিত।

তবে কর্মসূচিতে নিবন্ধনের সংখ্যা মানেই সবাই দেশে ফিরে গেছেন, এমন নয়। নিবন্ধন, জরিমানা পরিশোধ এবং প্রকৃত প্রত্যাবাসনের হিসাব আলাদা। তাই কর্মসূচির আওতায় কতজন বাংলাদেশি নিবন্ধন করেছেন এবং কতজন দেশে ফিরেছেন, তা এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অবৈধতার দায় কার?

বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব, দালাল ও মধ্যস্থতাকারীদের প্রতারণা, প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া এবং কর্মানুমতির জটিলতাও অনেককে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। কিছু কর্মী মধ্যস্থতাকারীদের আশ্বাসে বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ, বেতন কিংবা বৈধ কাগজপত্র পান না। কারও নিয়োগকর্তা কর্মানুমতি নবায়নে গড়িমসি করেন, আবার কেউ কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশে ফেরার খরচ জোগাড় করতে না পেরে অনিশ্চিত অবস্থায় থেকে যান।

তবে এসব কারণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পৃথক যাচাই প্রয়োজন; সব কর্মীর পরিস্থিতি এক নয়।

একইভাবে আটক হওয়া প্রত্যেক বাংলাদেশিকে একই অর্থে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়। কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হতে পারে, কারও নথিপত্রে ত্রুটি থাকতে পারে, আবার কারও বিরুদ্ধে অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকতে পারে। অভিযোগের ধরন ও ব্যক্তির নথি যাচাই করে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

কর্মী নিয়োগের আগে বৈধ কর্মানুমতি যাচাই, অনুমোদিত শর্ত মেনে কাজ করানো এবং আইনগত দায়িত্ব পালন করা নিয়োগকর্তারও কর্তব্য। অবৈধ নিয়োগে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও প্রতারণাকারী মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।

বৈধতা যাচাইয়ে অবহেলা নয়

মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের নিজেদের পাসপোর্ট, ভিসা ও কর্মানুমতির মেয়াদ নিয়মিত যাচাই করতে হবে। নিয়োগকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের অভিবাসন-সংক্রান্ত বৈধতা নিশ্চিত করা জরুরি। কাগজপত্রের সমস্যা দেখা দিলে দালালের কাছে নতুন করে অর্থ না দিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

যাদের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে, তাদেরও সব নথির মেয়াদ ও অনুমোদিত কাজের শর্ত পরীক্ষা করতে হবে। আর যারা অনিয়মিত অবস্থায় পড়ে গেছেন, তাদের জন্য প্রযোজ্য প্রত্যাবাসন কর্মসূচির শর্ত, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে সরকারি সূত্র থেকে তথ্য নেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই, অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কেউ হয়রানির শিকার হলে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী কমিউনিটি নেতা বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সচল থাকে দেশের বহু পরিবারের জীবন-জীবিকা। অথচ বিদেশে এসে কেউ যদি প্রতারণা, অনিয়মিত নিয়োগ কিংবা কাগজপত্রের জটিলতায় পড়েন, তার দায় শুধু ওই কর্মীর ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালেই থেকে যায়।

এ পরিস্থিতিতে বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ নিয়োগপত্র, ভিসা ও কর্মানুমতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা, প্রতারণাকারী দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংকটে পড়া কর্মীদের জন্য দ্রুত আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং বৈধ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে মালয়েশিয়ার আইন প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় প্রতারণার শিকার কর্মী, বৈধ কাগজপত্রধারী শ্রমিক এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় এখন প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়, বরং অবৈধতার উৎস বন্ধ করা এবং বৈধ অভিবাসনের পথ আরও নিরাপদ করা।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বাংলাদেশিসহ ১৫৭ অভিবাসীকে ফেরত পাঠাল মালয়েশিয়া

পুনঃপ্রবেশ ঠেকাতে কালো তালিকাভুক্ত বাংলাদেশিসহ ১৫৭ অভিবাসীকে ফেরত পাঠাল মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ায় সরকারি কর্মীদের ইসরাইলি অ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

মালয়েশিয়ায় সরকারি কর্মীদের ইসরাইলি অ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

সীমান্তপারের অপরাধ দমনে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা বাড়াতে চায় মালয়েশিয়া

সীমান্তপারের অপরাধ দমনে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা বাড়াতে চায় মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ায় ১০ মাসে আটক ৬৫ হাজার বিদেশি

মালয়েশিয়ায় ১০ মাসে আটক ৬৫ হাজার বিদেশি

বৈধ বিদেশি কর্মীর সংখ্যা জানাল মালয়েশিয়া

বৈধ বিদেশি কর্মীর সংখ্যা জানাল মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ায় ২০ মাসে আটক ১ লাখ ৫৯ হাজার অবৈধ অভিবাসী

মালয়েশিয়ায় ২০ মাসে আটক ১ লাখ ৫৯ হাজার অবৈধ অভিবাসী

আরও পড়ুন

হেবরনের অধিবাসীদের বাড়ি ছাড়তে ৫ মিনিটের আল্টিমেটাম ইসরাইলের

হেবরনের অধিবাসীদের বাড়ি ছাড়তে ৫ মিনিটের আল্টিমেটাম ইসরাইলের

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড়, আতঙ্কে প্রবাসীরা

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড়, আতঙ্কে প্রবাসীরা

মার্কিন নির্বাচনে রেকর্ড ১৮ হাজার কোটি টাকার অনুদান, শীর্ষে ইলন মাস্ক

মার্কিন নির্বাচনে রেকর্ড ১৮ হাজার কোটি টাকার অনুদান, শীর্ষে ইলন মাস্ক

ভোটার তালিকা সংশোধন বাতিলের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ

ভোটার তালিকা সংশোধন বাতিলের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম