Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

বিবাহিতা নারীর নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর নাম যুক্ত করার বিধান কী?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:১২ পিএম

বিবাহিতা নারীর নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর নাম যুক্ত করার বিধান কী?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিক পরিচয় সংক্রান্ত বিষয়গুলোও পরিষ্কারভাবে আলোচিত হয়েছে। বংশপরিচয় বা নসব ইসলামে অত্যন্ত সম্মানিত ও সংরক্ষিত একটি অধিকার। একজন নারী বিবাহের পর স্বামীর ঘরে প্রবেশ করলেও তার পরিচয়ের মূল ভিত্তি থাকে পিতৃপরিচয়; কারণ বংশধারা নির্ধারিত হয় রক্তসম্পর্কের মাধ্যমে, বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। তাই বিবাহিতা নারীর নিজের নামে স্বামীর নাম যুক্ত করা বা তার বংশপরিচয় পরিবর্তন করা—এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে কুরআন ও হাদিসের দিকে ফিরে দেখা প্রয়োজন। কুরআনের নির্দেশনা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্পষ্ট বক্তব্য আমাদের এ বিষয়ে একটি পরিশুদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক পথ দেখিয়ে দিয়েছে।

 ইসলামে নিজের বংশপরিচয় (نَسَب) পরিবর্তন করা হারাম। তাই নারীর ক্ষেত্রে নিজের বাবার নাম/পরিবারের নাম বাদ দিয়ে স্বামীর নামকে বংশপরিচয়ের স্থান দেওয়া বৈধ নয়। তবে পরিচয়ের সুবিধার জন্য, আনুষ্ঠানিকভাবে নয়—কাগজপত্রে ‘অমুকের স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া—এটা ভিন্ন বিষয় এবং বংশপরিচয় বদল না হলে অনুমোদিত।

ইসলামের প্রসিদ্ধ রীতি হলো- নিজের পরিচয় দিতে হলে বাবার পরিচয়ে পরিচয় দেওয়া। ইসলামের উত্তম শিষ্টাচারও এটি যে, নিজের নামের সঙ্গে বাবার নাম যুক্ত করা। যেমন- ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ অথবা ফাতিমা মুহাম্মদ। উভয়টিই সঠিক। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

বংশপরিচয় পিতার মাধ্যমে হবে, অন্য কাউকে পিতা/পরিবার হিসেবে গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। নিজের বংশ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার বিধান কুরআনে এভাবে এসেছে—

اُدْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ

‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতাদের নামে ডাকো—এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়পরায়ণ।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৫)

হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি

১. অন্যের বংশের নাম গ্রহণ করার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে হাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনায়। হযরত সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজিকে (সা.) বলতে শুনেছি—

مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ

‘যে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম।’ (বুখারি ৬৭৬৬)

২. মুসলিম সমাজের নৈতিকতা বজায় রাখতে বংশপরিচয় বদলানোয় রয়েছে সতর্কতা। কেননা ইসলামে বংশের সঠিকতা অত্যন্ত সংরক্ষিত বিষয়।  রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ

‘যে ব্যক্তি বংশ পরিচয় বিকৃত করে বা জাতিগত আভিজাত্য দেখায়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ ৫১২১)

৩. হযরত আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবীজিকে (সা.) বলতে শুনেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ ادَّعَى قَوْمًا لَيْسَ لَهُ فِيْهِمْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ

‘কোন লোক যদি নিজ পিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও অন্য কাউকে তার পিতা বলে দাবি করে তবে সে আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করল এবং যে ব্যক্তি নিজেকে এমন বংশের সঙ্গে বংশ সম্পর্কিত দাবি করল যে বংশের সঙ্গে তার কোনো বংশ সম্পর্ক নেই, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি ৩৫০৮)

৪. হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—

مَنِ انْتَسَبَ إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ أَوْ تَوَلَّى غَيْرَ مَوَالِيهِ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

‘যে ব্যক্তি নিজের পিতা ছাা অন্যের সাথে জন্মসূত্র স্থাপন করে অথবা নিজের মনিব ছাড়া অন্যকে মনিব বানায়, তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতাকুল ও সকল মানুষের অভিসম্পাত।’ (ইবনে মাজাহ ২৬০৯)

ইসলামী ফিকহের সার্বিক সিদ্ধান্তে যা নিষিদ্ধ—

বাবার নাম/পরিবারের নাম বাদ দিয়ে স্বামীর নামকে বংশের (family name, surname) স্থানে ব্যবহার করা। যেমন—

‘রাফিয়া বিনতে করিম’ (করিমের মেয়ে রাফিয়া) → এর স্থলে ‘রাফিয়া বেগম আহমদ’ (যদি আহমদ স্বামী হয় এবং এটি বংশপরিচয় হিসেবে নেওয়া হয়) তবে তা নিষিদ্ধ।

ইসলামী ফিকহের সার্বিক সিদ্ধান্তে যা অনুমোদিত—

পরিচয়ের সুবিধায় ‘অমুক স্ত্রী’ বা ‘wife of…’ উল্লেখ করা বা নামের সাথে সামাজিক টাইটেল যুক্ত হওয়া (বংশপরিচয় নয়) যেমন—

‘রাফিয়া করিম (W/O: আব্দুল্লাহ)’

‘রাফিয়া করিম, spouse of Abdullah’

এতে বংশপরিচয় পরিবর্তন হয় না, তাই শারঈ দৃষ্টিতে সমস্যা নেই।

যদি পাসপোর্ট/জাতীয় পরিচয়পত্রে, স্কুল-কলেজে বা সামাজিক পরিচয়ে বংশ পরিবর্তনের মতো করে স্বামীর নাম যুক্ত করা হয়, তবে এটি ইসলামে বৈধ নয়—কারণ এটি বংশপরিচয় বিকৃত করে। সুতরাং বিবাহিতা নারীর যদি নিজের নামের সাথে স্বামীর নাম এমনভাবে যুক্ত করা যা বংশপরিচয় পরিবর্তন করে— তবে তা কুরআন-হাদিস অনুযায়ী নিষিদ্ধ। কিন্তু বংশের পরিচয় অপরিবর্তিত রেখে, পরিচয়ের জন্য স্বামীর নাম উল্লেখ করা অনুমোদিত।

সার্বিক আলোচনায় বিষয়টি সুস্পষ্ট হলো যে— ইসলাম বংশপরিচয়কে অত্যন্ত পবিত্র ও সংরক্ষণীয় হিসেবে দেখা হয়। তাই বিবাহের পর নারীর নিজের পিতৃপরিচয় মুছে ফেলে স্বামীর নামকে বংশ বা নসব হিসেবে গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত নয়। কুরআন পিতৃপরিচয়ে পরিচিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং হাদিস বংশপরিচয় পরিবর্তনকে বড় গুনাহ হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবে পরিচয়ের সুবিধার্থে, বংশপরিচয় অপরিবর্তিত রেখে, স্বামীর নাম উল্লেখ করা বা ‘অমুকের স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া বৈধ এবং এতে শরিয়তের কোনো বাধা নেই। অতএব ইসলামের নির্দেশনা হলো—নাম ও বংশপরিচয়ে সততা বজায় রাখা, যাতে ব্যক্তির পরিচয় ও সমাজের নৈতিক কাঠামো অটুট থাকে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

নারী-পুরুষ একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

নারী-পুরুষ একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান কী?

অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান কী?

অজু ছাড়া ‘দরুদ শরিফ’ পাঠের বিধান: ইসলাম কী বলে?

অজু ছাড়া ‘দরুদ শরিফ’ পাঠের বিধান: ইসলাম কী বলে?

জুয়া— ইহকাল ও পরকালের ধ্বংসের ফাঁদ

জুয়া— ইহকাল ও পরকালের ধ্বংসের ফাঁদ

সুদ-ঘুসের টাকায় বাড়ি-গাড়ি, তওবায় ক্ষমা হবে কি?

সুদ-ঘুসের টাকায় বাড়ি-গাড়ি, তওবায় ক্ষমা হবে কি?

ইসলামের মানদণ্ডে ‘ভালো বন্ধু’ কারা?

ইসলামের মানদণ্ডে ‘ভালো বন্ধু’ কারা?

আরও পড়ুন

কবর দেওয়ার কত দিন পর একই কবরে দাফন করা যাবে?

কবর দেওয়ার কত দিন পর একই কবরে দাফন করা যাবে?

নারী-পুরুষ একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

নারী-পুরুষ একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান কী?

অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান কী?

অজু ছাড়া ‘দরুদ শরিফ’ পাঠের বিধান: ইসলাম কী বলে?

অজু ছাড়া ‘দরুদ শরিফ’ পাঠের বিধান: ইসলাম কী বলে?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম