নফসের ধোঁকায় পড়েছেন কিনা বুঝবেন কিভাবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের সবচেয়ে কঠিন লড়াই অনেক সময় বাইরের কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়—বরং নিজের নফসের সঙ্গে। নফস যখন প্রবৃত্তির অনুসরণে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সে গুনাহকে সুন্দর করে দেখায়, অন্যায়কে যুক্তিসঙ্গত মনে করায় এবং ইবাদতকে কঠিন ও ভারী করে তোলে। কখনো সে বলে, ‘এটা করলে তো কেউ জানবে না’; কখনো বলে, ‘সবাই তো এমন করে’; আবার কখনো মনে করিয়ে দেয়, ‘আমি তো খারাপ মানুষ নই!’
এভাবেই মানুষ ধীরে ধীরে গুনাহের প্রতি সংবেদনশীলতা হারাতে থাকে। অথচ মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— নিজের অন্তরের অবস্থা নিয়মিত যাচাই করা এবং নফসকে আল্লাহর আনুগত্যে পরিচালিত করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
‘নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের প্রতি অত্যন্ত প্ররোচনাদানকারী— তবে আমার রব যার প্রতি দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয়ই আমার রব পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫৩)
অতএব, নফসের প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আপনি নফসের ধোঁকায় পড়েছেন কিনা— নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন
১. গুনাহ করার সময় কি মনে হয়— ‘এটা করলে কেউ জানবে না?’
যদি কোনো গুনাহ করার আগে আপনার মনে হয়, ‘কেউ তো দেখছে না’, তাহলে থেমে নিজেকে প্রশ্ন করুন— আল্লাহ কি দেখছেন না? আল্লাহ বলেন—
أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَىٰ
‘সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখছেন?’ (সুরা আল-আলাক: আয়াত ১৪)
মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া কখনো সম্ভব নয়। তাই গোপনে গুনাহ করার সুযোগ পাওয়া আসলে নিরাপত্তা নয়; বরং তা ঈমানের পরীক্ষার মুহূর্ত।
২. হারাম জিনিসে কি মন শান্তি খুঁজে?
নফস অনেক সময় এমন কিছুর মধ্যে স্বস্তি খুঁজতে শেখে, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। কিন্তু প্রকৃত প্রশান্তি হারামে নয়; বরং আল্লাহর স্মরণে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৮)
হারাম সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি দিতে পারে না।
৩. নামাজ ও ইবাদতে কি আলসেমি লাগে, অথচ দুনিয়ার কাজে লাগে না?
দীর্ঘ সময় মোবাইল, বিনোদন, ব্যবসা, চাকরি কিংবা অন্যান্য দুনিয়াবি কাজে ব্যয় করতে কষ্ট না হলেও নামাজের সময় অলসতা অনুভব করা— এটি আত্মসমালোচনার বিষয়। নফস স্বাভাবিকভাবেই আরাম ও তাৎক্ষণিক আনন্দের দিকে টানে। তাই ইবাদতে নিয়মিত থাকার জন্য সচেতন প্রচেষ্টা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ
‘জান্নাতকে ঘিরে রাখা হয়েছে অপছন্দনীয়/কষ্টকর বিষয় দিয়ে এবং জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা দিয়ে।’ (মুসলিম ২৮২২)
নফস যা চায়, সবসময় তা কল্যাণকর নয়; আর যে কাজটি নফসের কাছে কঠিন, সেটিই অনেক সময় নাজাতের পথ হতে পারে।
৪. গুনাহের জন্য কি নিজের কাছে যুক্তি বানান?
যেমন এমন ধরণের কথা বলা বা ধারণা করা যে—
- ‘আমি তো এমন খারাপ মানুষ নই।’
- ‘সবাই তো এটা করে।’
- ‘একবার করলে কী হবে?’
- ‘আমার নিয়ত তো খারাপ ছিল না।’
- ‘পরে তওবা করে নেব।’
এগুলো কখনো কখনো নফসের তৈরি আত্মপ্রবঞ্চনার ভাষা হতে পারে। গুনাহকে ছোট করে দেখার প্রবণতা বিপজ্জনক। একজন মুমিনের কাজ হলো নিজের ভুলকে সাফাই দিয়ে ঢেকে রাখা নয়; বরং ভুল বুঝতে পারলে দ্রুত ফিরে আসা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা নফসে লাওয়ামাহ—নিজেকে ভর্ৎসনাকারী নফসের কথাও উল্লেখ করেছেন—
وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ
‘আর আমি শপথ করছি আত্মভর্ৎসনাকারী নফসের।’ (সুরা আল-কিয়ামাহ: আয়াত ২)
ভুলের পর অন্তরের জাগরণ, অনুশোচনা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা একজন মুমিনের জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দিতে পারে।
নফসের ধোঁকা থেকে বাঁচার উপায় কী?
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে জীবনের অগ্রাধিকার বানান
নামাজ শুধু একটি দায়িত্ব নয়; এটি নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার দৈনিক প্রশিক্ষণ। সময়মতো নামাজ আদায় করার অভ্যাস মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে সাহায্য করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَالصَّلَاةُ نُورٌ
‘নামাজ হলো আলো।’ (মুসলিম ২২৩)
তাই নফস যখন বলে, ‘আরেকটু পরে নামাজ পড়ব’, তখন সেই মুহূর্তেই তাকে থামিয়ে দিন।
২. কুরআন তিলাওয়াত করুন—সম্ভব হলে অর্থ বুঝে
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; এটি অন্তরকে জাগিয়ে তোলার জন্যও। প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত কুরআন পড়ুন এবং নিজের জীবনের সঙ্গে আয়াতগুলোর সম্পর্ক খুঁজে দেখুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন—
‘আজ যে আয়াত পড়লাম, তার কোন নির্দেশটি আমি আমার জীবনে বাস্তবায়ন করব?’
৩. গুনাহের পরিবেশ ও সঙ্গ থেকে দূরে থাকুন
নফস একা একা সবসময় দুর্বল হয় না; অনেক সময় পরিবেশ তাকে শক্তিশালী করে। এমন সঙ্গ, জায়গা, কনটেন্ট বা অভ্যাস যা আপনাকে বারবার গুনাহের দিকে টেনে নেয়— সেগুলো থেকে দূরত্ব তৈরি করা আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪. আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করুন
জিকির অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। আল্লাহ বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৮)
তাই অবসর সময়ে অযথা চিন্তা, বিনোদন বা গুনাহের দিকে না গিয়ে জিকির, ইস্তিগফার ও দরুদে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
৫. নফসের বিরুদ্ধে প্রতিদিন ছোট ছোট লড়াই করুন
নফসকে একদিনে পরিবর্তন করা যায় না। আজ একটি গুনাহ ছাড়ুন, কাল একটি ভালো অভ্যাস শুরু করুন। কোনো হারাম সুযোগ সামনে এলে নিজেকে বলুন—
‘আমি পারি, কিন্তু আল্লাহর জন্য আমি এটি ছেড়ে দিচ্ছি।’
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
‘আর যারা আমার পথে সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখাব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।’
(সুরা আল-আনকাবুত: আয়াত ৬৯)
মনে রাখবেন
নফসের ধোঁকায় পড়েছেন মানেই আপনি শেষ হয়ে গেছেন— এমন নয়। বরং নিজের ভেতরের দুর্বলতা চিনতে পারা এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করাই ফিরে আসার শুরু। ভুল হয়ে গেলে হতাশ হবেন না। দ্রুত তওবা করুন, গুনাহের পথ থেকে সরে আসুন এবং আবার আল্লাহর দিকে ফিরে যান। তবে গুনাহকে হালকা মনে করা বা বারবার গুনাহের জন্য অজুহাত তৈরি করা থেকে সতর্ক থাকুন।
আল্লাহর কাছে অন্তরের পরিশুদ্ধতা চাইতে থাকুন। কারণ বাহ্যিক আমল যতই সুন্দর হোক, অন্তরের অবস্থাই মানুষের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى أَجْسَادِكُمْ وَلَا إِلَى صُوَرِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের দেহ ও আকৃতির দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তরের দিকে তাকান।’ (মুসলিম ২৫৬৪)
নফসের ধোঁকা খুব সূক্ষ্ম। সে সবসময় সরাসরি বলে না—‘গুনাহ কর।’ কখনো সে বলে, ‘একবার করলে কিছু হবে না’; কখনো বলে, ‘সবাই তো করছে’; আবার কখনো বলে, ‘তুমি তো এমনিতেই ভালো মানুষ।’
তাই আসল বিজয় হলো— নিজের নফসের প্রতিটি অজুহাতকে চিনে ফেলা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে নিজের প্রবৃত্তির ওপর প্রাধান্য দেওয়া। আজ থেকেই নিজেকে প্রশ্ন করুন—
- আমি কি আল্লাহকে বেশি ভয় করি, নাকি নিজের নফসের ইচ্ছাকে?
- আমি কি গুনাহের পর অজুহাত খুঁজি, নাকি তওবার পথ খুঁজি?
- আমি কি মানুষের চোখকে ভয় করি, নাকি আল্লাহর নজরকে স্মরণ করি?
হে আল্লাহ, আমাদের নফসকে পরিশুদ্ধ করুন, প্রবৃত্তির ধোঁকা থেকে রক্ষা করুন, গুনাহকে আমাদের কাছে অপছন্দনীয় করে দিন, ইবাদতকে আমাদের হৃদয়ের প্রশান্তি বানিয়ে দিন এবং আপনার সন্তুষ্টির পথে অবিচল রাখুন। আমিন।

