রুকুতে যেতে যেতে তাকবিরে তাহরিমা বললে কি নামাজ হবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামাতে নামাজ আদায়ের সময় অনেকেই দেরিতে মসজিদে পৌঁছান। বিশেষ করে ইমাম যখন রুকুতে চলে যান, তখন রাকাতটি পাওয়ার তাড়াহুড়ায় কেউ কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় তাকবিরে তাহরিমা শেষ না করেই রুকুর দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— রুকুতে যেতে যেতে তাকবিরে তাহরিমা বললে কি নামাজ শুদ্ধ হবে?
তাকবিরে তাহরিমা নামাজের সূচনাকারী তাকবির। তাই জামাতে দেরিতে পৌঁছালেও নামাজে প্রবেশের এই মৌলিক বিষয়টি সঠিকভাবে আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, ইমামকে রুকুতে পাওয়া গেলেও প্রথমে দাঁড়ানো অবস্থায় তাকবিরে তাহরিমা বলতে হবে, এরপর রুকুতে যেতে হবে।
তাকবিরে তাহরিমা কী?
নামাজ শুরু করার সময় যে ‘আল্লাহু আকবার’ বলা হয়, সেটিই তাকবিরে তাহরিমা। এর মাধ্যমে নামাজ আদায়কারী নামাজে প্রবেশ করেন এবং নামাজের বাইরের বিভিন্ন কাজ তাঁর জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مِفْتَاحُ الصَّلَاةِ الطُّهُورُ، وَتَحْرِيمُهَا التَّكْبِيرُ، وَتَحْلِيلُهَا التَّسْلِيمُ
‘নামাজের চাবি হলো পবিত্রতা, এর তাহরিম হলো তাকবির এবং এর সমাপ্তি হলো সালাম।’ (তিরমিজি ২৩৮)
তাকবিরে তাহরিমা নামাজের শুরু নির্ধারণ করে। তাই এটি সঠিকভাবে আদায় না করে রুকুতে চলে গেলে শুধু রুকুতে পৌঁছানো দিয়ে নামাজ শুরু হয়ে যায় না।
ইমাম রুকুতে থাকলে কী করবেন?
ইমাম রুকুতে থাকা অবস্থায় কেউ জামাতে শরিক হলে, তার জন্য প্রথমে দাঁড়ানো অবস্থায় তাকবিরে তাহরিমা বলতে হবে। এরপর রুকুতে যেতে হবে।
হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথমে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবিরে তাহরিমা আদায় করবেন। এরপর রুকুতে যাওয়ার জন্য আরেকটি তাকবির বলা উত্তম। তবে রাকাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তাকবিরে তাহরিমার পর দ্বিতীয় তাকবির না বলেও রুকুতে যাওয়া যেতে পারে।
সুতরাং সহজভাবে নিয়মটি হলো—
দাঁড়িয়ে তাকবিরে তাহরিমা → এরপর রুকুতে যাওয়া → ইমামের সঙ্গে রুকুতে শরিক হওয়া।
রুকুতে যেতে যেতে তাকবিরে তাহরিমা বললে কী হবে?
এখানেই মূল বিষয়টি। কেউ যদি ইমামকে রুকুতে দেখে তাড়াহুড়ো করে রুকুর দিকে যেতে যেতে তাকবিরে তাহরিমা বলেন, তাহলে তাকবিরটি কখন শেষ হচ্ছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তাকবিরে তাহরিমা দাঁড়ানো অবস্থায় অথবা দাঁড়ানোর কাছাকাছি অবস্থায় সম্পন্ন হওয়া জরুরি। কেউ যদি তাকবির বলতে বলতে এতটা রুকুর দিকে ঝুঁকে যান যে রুকুর কাছাকাছি গিয়ে তাকবির শেষ হয়, তাহলে তাকবিরে তাহরিমা সঠিকভাবে আদায় হয়নি। আর তাকবিরে তাহরিমা শুদ্ধ না হলে নামাজও শুদ্ধ হবে না।
অতএব, রাকাত ধরার তাড়াহুড়ায় তাকবিরে তাহরিমা রুকুতে যেতে যেতে বলার অভ্যাস করা উচিত নয়। বরং এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে পরিষ্কারভাবে তাকবিরে তাহরিমা বলে তারপর রুকুতে যেতে হবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
তাকবিরে তাহরিমা এবং রুকুর তাকবির এক বিষয় নয়।
তাকবিরে তাহরিমা: নামাজ শুরু করার তাকবির—এটি দাঁড়ানো অবস্থায় আদায় করতে হবে।
রুকুর তাকবির: রুকুতে যাওয়ার সময় বলা অতিরিক্ত তাকবির—এটি তাকবিরে তাহরিমার পরে বলা হয়।
তাই ইমাম রুকুতে থাকলেও প্রথম তাকবিরটি নামাজে প্রবেশের জন্য এবং পরবর্তী তাকবিরটি রুকুতে যাওয়ার জন্য।
তাকবিরের সময় হাত তোলা কি জরুরি?
তাকবিরে তাহরিমা বলার সময় দুই হাত ওঠানো সুন্নত। এটি নামাজের ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তাই কোনো কারণে হাত না তুলতে পারলে বা ভুলে গেলে নামাজ বাতিল হবে না এবং এ কারণে সাহু সিজদাও করতে হবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের শুরুতে হাত ওঠাতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا دَخَلَ فِي الصَّلَاةِ رَفَعَ يَدَيْهِ مَدًّا
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নামাজে প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার দুই হাত প্রসারিত করে উঠাতেন।’ (তিরমিজি ২৩৯)
তাই নামাজ শুরু করার সময় নিয়ম অনুযায়ী দুই হাত উঠিয়ে তাকবিরে তাহরিমা বলা উচিত। তবে হাত ওঠানো বাদ পড়ে গেলে নামাজ নষ্ট হবে না।
তাহলে দেরিতে জামাতে পৌঁছালে কী করবেন?
ইমামকে রুকুতে দেখতে পেলে রাকাত পাওয়ার তাড়াহুড়ায় দৌড়ে বা ঝুঁকে গিয়ে নামাজ শুরু করবেন না। শান্তভাবে দাঁড়িয়ে প্রথমে তাকবিরে তাহরিমা বলুন। এরপর দ্রুত রুকুতে গিয়ে ইমামের সঙ্গে শরিক হোন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ হলো, ইমাম যে অবস্থায় থাকেন, জামাতে এসে মুসল্লি সেই অবস্থায় শরিক হবে। তাই ইমামকে রুকুতে পেলে রুকুতেই শরিক হতে হবে; কিন্তু তার আগে নামাজে প্রবেশের তাকবির সঠিকভাবে আদায় করতে হবে।
মনে রাখার মতো কয়েকটি বিষয়
১. তাকবিরে তাহরিমা নামাজের শুরু করার তাকবির।
২. ইমাম রুকুতে থাকলেও প্রথমে দাঁড়িয়ে তাকবিরে তাহরিমা বলতে হবে।
৩. এরপর রুকুতে যাওয়ার জন্য দ্বিতীয় তাকবির বলা উত্তম।
৪. রাকাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তাকবিরে তাহরিমার পর সরাসরি রুকুতে যাওয়া যেতে পারে।
৫. তাকবিরে তাহরিমা রুকুতে যেতে যেতে এমন অবস্থায় শেষ করা যাবে না, যখন ব্যক্তি রুকুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
৬. তাকবিরে তাহরিমার সময় হাত ওঠানো সুন্নত; হাত না উঠলে নামাজ বাতিল হবে না।
জামাতে একটি রাকাত পাওয়ার তাড়াহুড়ায় নামাজের মৌলিক নিয়মে ভুল করা উচিত নয়। ইমাম রুকুতে চলে গেলেও প্রথম কাজ হলো দাঁড়িয়ে সঠিকভাবে তাকবিরে তাহরিমা বলা। এরপর ইমামের সঙ্গে রুকুতে শরিক হতে হবে।
মনে রাখুন—একটি রাকাত পাওয়ার চেয়ে নামাজের সঠিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেরিতে মসজিদে পৌঁছালে অস্থির না হয়ে নিয়ম মেনে নামাজে শরিক হোন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নামাজের মাসআলা-মাসায়েল সঠিকভাবে জেনে, বুঝে ও আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

