Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

ফাতেমা (রা.) কেন তার স্বর্ণের নেকলেস বিক্রি করেছিলেন?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

ফাতেমা (রা.) কেন তার স্বর্ণের নেকলেস বিক্রি করেছিলেন?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তম কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-এর জীবনজুড়ে রয়েছে আত্মত্যাগ, দুনিয়াবিমুখতা ও ইমানি দৃঢ়তার অনন্য সব অধ্যায়। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা বা অলংকারের মোহকে অতিক্রম করে কীভাবে রবের সন্তুষ্টি এবং পিতার অপছন্দকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হয়, তা ফাতেমা (রা.)-এর জীবন থেকে তার অনুপম শিক্ষা পাওয়া যায়। স্বামীর ভালোবাসার উপহার হিসেবে পাওয়া একটি স্বর্ণের নেকলেস বিক্রি করে দাস মুক্ত করার ঐতিহাসিক ঘটনাটি কেবল একজন কন্যার পিতৃভক্তির নিদর্শন নয়, বরং তা মুমিনদের ত্যাগ ও খোদাভীতির এক পরম শিক্ষা বহন করে।

স্বর্ণের নেকলেস বিক্রির পেছনের ঘটনা

একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তার প্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-এর ঘরে প্রবেশ করে তার গলায় একটি স্বর্ণের নেকলেস দেখতে পান। নেকলেসটি হজরত আলী (রা.) ভালোবেসে তাকে উপহার দিয়েছিলেন। প্রিয় কন্যার গলায় এই অলংকার দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—

یَا فَاطِمَةُ أَيَسُرُّكِ أَنْ يَقُولَ النَّاسُ فَاطِمَةُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ وَفِي يَدِهَا سِلْسِلَةٌ مِنْ نَارٍ

‘হে ফাতেমা! তুমি কি এটা পছন্দ করো যে, লোকেরা বলাবলি করুক— রাসুলুল্লাহর (সা.) মেয়ে ফাতেমা, অথচ তার গলায় আগুনের নেকলেস রয়েছে?’

এ কথা বলেই নবীজি (সা.) ঘরে না বসে চলে গেলেন। পিতার সামান্য অপছন্দের ইঙ্গিত পেয়েই হজরত ফাতেমা (রা.) বিলম্ব না করে নেকলেসটি বাজারে পাঠিয়ে বিক্রি করে দিলেন। অতঃপর সেই অর্জিত অর্থ দিয়ে একজন ক্রীতদাস কিনে তাকে মুক্ত করে দিলেন।

এই খবর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি পরম সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন—

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْجَى فَاطِمَةَ مِنَ النَّارِ

‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি ফাতেমাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন।’ (নাসাঈ ৫১৪১)

নারীদের স্বর্ণ পরিধানের বিধান: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

উপরোক্ত হাদিসটি পাঠ করে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে— তবে কি নারীদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ?

উত্তর হলো— না, নারীদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও বৈধ। এ বিষয়ে উম্মতের সকল আলেম ও ফকিহগণের সর্বসম্মত ঐকমত্য (ইজমা) রয়েছে।

পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ তাআলা নারীদের অলংকার ব্যবহারের স্বাভাবিক স্বভাবের উল্লেখ করে বলেছেন—

أَوَمَن يُنَشَّأُ فِي الْحِلْيَةِ وَهُوَ فِي الْخِصَامِ غَيْرُ مُبِينٍ

‘তবে কি এমন কাউকে (সন্তান বানানো হবে) যে অলংকারে আবৃত হয়ে লালিত-পালিত হয় এবং বিতর্ককালে স্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপনে সক্ষম নয়?’ (সুরা যুখরুফ: আয়াত ১৮)

ইমাম নববি (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মাজমু’-তে উল্লেখ করেছেন যে, সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নারীদের জন্য রেশম পরা এবং স্বর্ণ ও রুপার অলংকার ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

হাদিসটির তাৎপর্য ও ফকিহগণের ব্যাখ্যা

নবীজি (সা.) কেন প্রিয় কন্যার ক্ষেত্রে এমন কঠোর মন্তব্য করলেন— এর ব্যাখ্যায় বিজ্ঞ আলেম ও মুহাদ্দিসগণ কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন—

ইসলামের প্রাথমিক বিধান (মানসুখ হওয়া): কিছু আলেমের মতে, ইসলামের প্রথম যুগে স্বর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে কঠোরতা ছিল, এটি তখনকার ঘটনা। পরবর্তীতে একাধিক সহিহ হাদিস দ্বারা নারীদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার বৈধ করা হয়, ফলে আগের কঠোরতার বিধানটি রহিত (মানসুখ) হয়ে যায়।

জাকাত আদায় না করার সতর্কবার্তা: অনেক আলেমের মতে, এ শাস্তির হুঁশিয়ারি মূলত সেই অলংকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যার জাকাত আদায় করা হয় না।

نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ... أَتُحِبَّانِ أَنْ يُسَوِّرَكُمَا اللَّهُ بِسِوارَيْنِ مِنْ نَارٍ؟ قَالَتَا: لاَ. قَالَ: فَأَدِّيَا زَكَاتَهُ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) দুজন নারীর হাতে স্বর্ণের বালা দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমরা কি পছন্দ করো যে আল্লাহ তোমাদের জাহান্নামের আগুনের বালা পরাবেন?’ তারা বললেন, ‘না।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘তবে এর জাকাত আদায় কর।’ (মুসনাদে আহমাদ ৬৭৭৬)

হজরত আয়েশা (রা.) থেকেও বর্ণিত রয়েছে যে, অলংকারের জাকাত আদায় করা হলে তা ব্যবহারে কোনো বাধা নেই। (বায়হাকি)

অহংকার ও লোক দেখানোর মানসিকতা: স্বর্ণ ব্যবহারের কারণে যদি কারও মনে আত্মগরিমা, অহংকার কিংবা লোকদেখানো ভাব প্রকাশ পায়, তবে তার জন্য এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে।

নবী পরিবারের বিশেষ মানদণ্ড: রাসুলুল্লাহ (সা.) চেয়েছিলেন তার নিজের পরিবার দুনিয়ার জাঁকজমক থেকে দূরে থাকুক। হজরত ফাতেমা (রা.) যেন সাধারণ মুমিনদের চেয়ে খোদাভীতি ও ত্যাগের সর্বোচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করেন, সেজন্যই নবীজি নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে অলংকারটি অপছন্দ করেছিলেন।

হজরত ফাতেমা (রা.)-এর এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসুলের ভালোবাসার সামনে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুও তুচ্ছ। স্বামীর উপহার দেওয়া স্বর্ণের অলংকারটি বিক্রি করে একজন মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার মাধ্যমে তিনি কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত মুমিন নারীর জন্য আনুগত্য ও উদারতার এক অসামান্য ও অমর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

কঠিন পরিস্থিতিতে মন শক্ত রাখার কুরআনি দোয়া

কঠিন পরিস্থিতিতে মন শক্ত রাখার কুরআনি দোয়া

একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিকে সওয়াব পাঠালে সবাই কি পূর্ণ সওয়াব পাবে?

একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিকে সওয়াব পাঠালে সবাই কি পূর্ণ সওয়াব পাবে?

মনের অজান্তে যেসব গুনাহে জড়িয়ে পড়ি আমরা: বাঁচার উপায় কী?

মনের অজান্তে যেসব গুনাহে জড়িয়ে পড়ি আমরা: বাঁচার উপায় কী?

জুমার খুতবা চলাকালে কথা বলা ও অন্যান্য ভুলের শরয়ি বিধান

জুমার খুতবা চলাকালে কথা বলা ও অন্যান্য ভুলের শরয়ি বিধান

জুমার নামাজের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

জুমার নামাজের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

জুমা আদায়কারীর জন্য নবীজির (সা.) সুসংবাদ

জুমা আদায়কারীর জন্য নবীজির (সা.) সুসংবাদ

আরও পড়ুন

যৌথ পরিবারে অশান্তি হলে আলাদা থাকা যাবে কি, ইসলাম কী বলে?

যৌথ পরিবারে অশান্তি হলে আলাদা থাকা যাবে কি, ইসলাম কী বলে?

স্ত্রীর পর্দা পালন নিয়ে পারিবারিক বিরোধ হলে স্বামীর করণীয় কী?

স্ত্রীর পর্দা পালন নিয়ে পারিবারিক বিরোধ হলে স্বামীর করণীয় কী?

কঠিন পরিস্থিতিতে মন শক্ত রাখার কুরআনি দোয়া

কঠিন পরিস্থিতিতে মন শক্ত রাখার কুরআনি দোয়া

একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিকে সওয়াব পাঠালে সবাই কি পূর্ণ সওয়াব পাবে?

একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিকে সওয়াব পাঠালে সবাই কি পূর্ণ সওয়াব পাবে?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম