যেসব পরিস্থিতিতে সত্য কথা বললেও গুনাহ হয়
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সত্যবাদিতা মুমিনের অন্যতম প্রধান ভূষণ এবং ইসলামের এক মহান শিক্ষা। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে সত্যবাদীদের সুউচ্চ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো কথা কেবল ‘সত্য’ হলেই তা যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রকাশ করা শরীয়তসম্মত হয় না। কথাটির পেছনে উদ্দেশ্য কী, তা কার সম্মুখে বলা হচ্ছে এবং এর বাস্তব পরিণতি কী হতে পারে— ইসলামি শরিয়তে এসব গভীরভাবে বিবেচ্য। প্রজ্ঞা ও পরিস্থিতি বিবেচনা না করে সত্য প্রকাশ করলে তা অনেক সময় গিবত, চোগলখোরি বা ফিতনায় রূপ নেয়। হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি ৬৪৭৫)
অতএব, অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি ও গুনাহ থেকে বাঁচতে যে ৫টি বিশেষ পরিস্থিতিতে সত্য প্রকাশ থেকেও বিরত থাকা আবশ্যক, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—
১. গিবত বা পরচর্চার ক্ষেত্রে
কারো অবর্তমানে তার এমন কোনো সত্য দোষ বা ত্রুটি প্রকাশ করা যা সে অপছন্দ করে— তা-ই গিবত। কথাটি শতভাগ সত্য হলেও তা বলা কবিরা গুনাহ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) গিবতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন—
ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ
‘(গিবত হলো) তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই থাকে? তিনি বললেন: ‘তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গিবত করলে। আর তা যদি না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।’ (মুসলিম ২৫৮৯)
২. সম্পর্ক বিনষ্টকারী চোগলখোরি বা বিবাদ সৃষ্টিতে
কারো সত্য কথা অন্য কারো কাছে গিয়ে বলে তাদের মধ্যে বিরোধ, বিদ্বেষ বা সম্পর্কচ্ছেদ ঘটানোকে ইসলামে 'নামিমাহ' বা চোগলখোরি বলা হয়। সত্য প্রকাশ করে মানুষের সুসম্পর্ক নষ্ট করা ঘোরতর অন্যায়। হজরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ
‘চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি: ৬০৫৬)
অতএব, ‘আমি তো মিথ্যা বলিনি’— এই অজুহাতে মানুষের মাঝে ফিতনা ছড়ানো জায়েজ নয়।
৩. আমানত বা গোপনীয়তা ফাঁসের ক্ষেত্রে
কারো ব্যক্তিগত গোপনীয় কথা জানা থাকলে কিংবা কেউ বিশ্বাস করে কিছু বললে তা আমানত হিসেবে রক্ষিত থাকে। কথা সত্য হলেও অনুমতি ছাড়া তা প্রকাশ করা আমানতের খেয়ানত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ بِالْحَدِيثِ ثُمَّ الْتَفَتَ فَهِيَ أَمَانَةٌ
‘কোনো ব্যক্তি কোনো কথা বলার পর যদি ডানে-বামে তাকায় (অর্থাৎ কেউ শুনছে কি না দেখে), তবে সেই কথাটি আমানত হিসেবে গণ্য।’ (আবু দাউদ ৪৮৬৮)
বিশেষ করে পারিবারিক, দাম্পত্য বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য আড়ালে প্রকাশ করা মারাত্মক অন্যায়।
৪. অকারণে সম্মানহানি করার উদ্দেশ্যে
কোনো মানুষের অতীতের কোনো সত্য ভুল বা ব্যক্তিগত গোপন ত্রুটি অপ্রয়োজনে প্রকাশ করে তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা চরম পাপাচার। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ
‘প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।’ (মুসলিম ২৫৬৪)
৫. ফিতনা ও অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি সাধনে
কোনো সত্য প্রকাশ করার ফলে যদি কোনো শরয়ি ফায়দা না থাকে; বরং সমাজে বিশৃঙ্খলা, শত্রুতা বা নিরপরাধ মানুষের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে সেখানে সত্য বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) মূলনীতি ঘোষণা করে বলেছেন—
لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ
‘কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না এবং নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না।’ (ইবনে মাজাহ ২৩৪০)
পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও নীতি
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সত্যবাদীদের প্রশংসার পাশাপাশি অনর্থক ও ক্ষতিকর কথাবার্তা থেকে মুমিনদের দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন—
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
‘আর যারা অনর্থক কথাবার্তা ও কাজকর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা আল-মুমিনুন: আয়াত ৩)
কখন সত্য বলা জরুরি ও বাধ্যতামূলক?
সব জায়গায় নীরব থাকা যাবে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও মানুষের সুরক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে সত্য প্রকাশ করা ফরজ বা ওয়াজিব। যেমন—
- আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের সময়।
- মজলুমের অধিকার আদায়ে বা বিচারে সত্যি ঘটনা উপস্থাপনে।
- বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর অত্যাবশ্যকীয় তথ্য প্রদানে।
- ব্যবসায়িক লেনদেনে পণ্যের দোষ গোপন না করে ক্রেতাকে সতর্ক করতে।
- কোনো অপরাধীর অন্যায় থেকে সমাজকে রক্ষা করতে।
কথা বলার আগে মুমিনের করণীয় ৩ ভাবনা
যেকোনো কথা মুখ দিয়ে বের করার আগে একজন মুমিনের তিনটি বিষয় চিন্তা করা উচিত—
১. সত্যতা: কথাটি কি শতভাগ সত্য?
২. প্রয়োজনীয়তা: কথাটি বলা কি এই মুহূর্তে সত্যিই প্রয়োজনীয়?
৩. পরিণতি: এটি বললে অকারণে কারো ক্ষতি, সম্মানহানি বা সমাজে ফিতনা তৈরি হবে কি না?
সত্য বলা মুমিনের ঈমানি আমল হলেও প্রজ্ঞা ও স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করা শরিয়তের অন্যতম নির্দেশ। সত্যের দোহাই দিয়ে কারও গিবত করা, সম্পর্ক ভাঙা কিংবা কারো গোপনীয়তা নষ্ট করা ইসলাম অনুমোদন করে না। যেখানে সত্য বলা দ্বীন ও মানুষের কল্যাণে আসে, সেখানে সত্য বলাই ঈমান; আর যেখানে সত্য বললে কেবল ফিতনা ও ক্ষতি বৃদ্ধি পায়, সেখানে জবান সংযত রাখাই প্রকৃত হেকমত ও তাকওয়া।

