তাবিজ-যাদুটোনা করে কাউকে বশ করা কি জায়েজ? শরিয়তের বিধান জানুন
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রশ্ন
কেউ যদি অপরজনকে তাবিজ করে বশ করেন, তাহলে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাদের শাস্তি কী?
উত্তর
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তরার জামিয়া ইমাম বুখারীর মুফতি ও মুহাদ্দিস সাইদুজ্জামান কাসেমি বলেন, কোনো আমিল, তাবিজ বা অপারগ শক্তির মাধ্যমে কাউকে বশ করা, নিজের প্রতি আকৃষ্ট করা কিংবা তাকে কষ্ট দেওয়া ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েজ, হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এ ধরনের কাজ অনেক সময় যাদু বা সেহরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এতে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও স্বাভাবিক অনুভূতির ওপর হস্তক্ষেপ করা হয় এবং ঈমান ও আকিদার ওপর মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব কাজ মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা ও শিরকের দিকে নিয়ে যায়।
তাই যারা এসব কাজ করছেন, তারা কবিরা গুনাহ করছেন। আর কবিরা গুনাহের শাস্তি হলো, খাঁটি দিলে তওবা না করলে একটি কবিরা গুনাহই জাহান্নামে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
কাজেই যারা এসব কাজ করছেন, তাদের জন্য আবশ্যক হলো এ ধরনের গর্হিত কাজ থেকে সরে এসে খাঁটি দিলে, কায়মনোবাক্যে আল্লাহ তাআলার দরবারে তওবা করা।
পাশাপাশি যে উদ্দেশ্যে এসব কাজ করা হচ্ছে, তা যদি শরিয়তসম্মত হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করা এবং তার কাছে হালাল ও কল্যাণকর পথ প্রার্থনা করা উচিত। মনে রাখতে হবে, জোরপূর্বক বা তাবিজ-আমলের মাধ্যমে গড়ে ওঠা কোনো সম্পর্কেই প্রকৃত সুখ ও বরকত থাকে না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চললেই জীবনে শান্তি ও কল্যাণ লাভ করা সম্ভব।
শরয়ি প্রমাণ
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
وَاتَّبَعُوۡا مَا تَتۡلُوا الشَّیٰطِیۡنُ عَلٰی مُلۡکِ سُلَیۡمٰنَ ۚ وَمَا کَفَرَ سُلَیۡمٰنُ وَلٰکِنَّ الشَّیٰطِیۡنَ کَفَرُوۡا یُعَلِّمُوۡنَ النَّاسَ السِّحۡرَ ٭ وَمَاۤ اُنۡزِلَ عَلَی الۡمَلَکَیۡنِ بِبَابِلَ ہَارُوۡتَ وَمَارُوۡتَ ؕ وَمَا یُعَلِّمٰنِ مِنۡ اَحَدٍ حَتّٰی یَقُوۡلَاۤ اِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَۃٌ فَلَا تَکۡفُرۡ ؕ فَیَتَعَلَّمُوۡنَ مِنۡہُمَا مَا یُفَرِّقُوۡنَ بِہٖ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَزَوۡجِہٖ ؕ وَمَا ہُمۡ بِضَآرِّیۡنَ بِہٖ مِنۡ اَحَدٍ اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ ؕ وَیَتَعَلَّمُوۡنَ مَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡ ؕ وَلَقَدۡ عَلِمُوۡا لَمَنِ اشۡتَرٰىہُ مَا لَہٗ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنۡ خَلَاقٍ ۟ؕ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡا بِہٖۤ اَنۡفُسَہُمۡ ؕ لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ ١۰٢
অর্থাৎ, তারা (বনী ইসরাঈল) সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর শাসনামলে শয়তানগণ যা কিছু (মন্ত্র) পড়ত, তার পেছনে পড়ে গেল। সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) কোনো কুফর করেননি। অবশ্য শয়তানগণ মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছিল। তাছাড়া (বনী ইসরাঈল) বাবিল শহরে হারূত ও মারূত নামক ফিরিশতাদ্বয়ের প্রতি যা নাজিল হয়েছিল, তার পেছনে পড়ে গেল। এ ফিরিশতাদ্বয় কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো তালীম দিতেন না, যতক্ষণ না বলে দিতেন, আমরা কেবলই পরীক্ষাস্বরূপ (প্রেরিত হয়েছি)। সুতরাং তোমরা (যাদুর পেছনে পড়ে) কুফরি অবলম্বন করো না। তথাপি তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। তবে তারা তার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারও কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারত না। কিন্তু তারা এমন জিনিস শিখত, যা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল এবং উপকারী ছিল না। আর তারা এটাও ভালো করে জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোনো হিস্যা থাকবে না। বস্তুত তারা যার বিনিময়ে নিজেদের বিক্রি করেছে, তা অতি মন্দ। যদি তাদের (এ বিষয়ের প্রকৃত) জ্ঞান থাকত!
তাফসিরে তাওযীহুল কুরআনের ব্যাখ্যা
তাফসিরে তাওযীহুল কুরআনে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে, এ আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদীদের আরেকটি দুষ্কর্মের প্রতি ইশারা করেছেন। তা হলো, যাদু-টোনার পেছনে পড়া শরিয়তে সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। বিশেষত যাদুর মন্ত্রসমূহে যদি শিরকী কথাবার্তা থাকে, তবে সে যাদু কুফরের নামান্তর।
হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর আমলে কিছু শয়তান, যাদের মধ্যে জিন ও মানুষ উভয়ই থাকতে পারে, কতক ইয়াহুদিকে ফুসলানি দিয়েছিল যে, হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজত্বের (খ্রিস্টপূর্ব ৯৯০-৯৩০) সব রহস্য যাদুর মধ্যে নিহিত। তোমরা যদি যাদু শিক্ষা কর, তবে তোমাদেরও বিস্ময়কর ক্ষমতা অর্জিত হবে। সুতরাং তারা যাদুর তালীম নিতে ও তা কাজে লাগাতে শুরু করে দিল। অথচ যাদু শেখা যে কেবল অবৈধ ছিল, তা নয়; বরং তার কোনো কোনো পদ্ধতি ছিল কুফরি পর্যায়ের।
ইয়াহুদীরা দ্বিতীয় মহাপাপ করেছিল এই যে, তারা খোদ হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-কেই একজন যাদুকর সাব্যস্ত করেছিল এবং তার সম্পর্কে প্রচার করেছিল, তিনি শেষ জীবনে মূর্তিপূজা শুরু করে দিয়েছিলেন। তার সম্পর্কে এসব অপবাদমূলক কাহিনী তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহেও জুড়ে দিয়েছিল, যা বাইবেলে আজও পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। বাইবেলে এখনও পর্যন্ত তার মুরতাদ হওয়ার বিবরণ বিদ্যমান (দ্র. ১-বাদশানামা ১১:১-২১)। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক।
কুরআন মাজিদের এ আয়াতে হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি আরোপিত এ ন্যক্কারজনক অপবাদকে খণ্ডন করা হয়েছে। এর দ্বারা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, কুরআন মাজিদ সম্পর্কে যারা অপবাদ দিত যে, ‘এটা ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের কিতাব থেকে আহরিত’, তাদের সে অপবাদ কতটা মিথ্যা! এ স্থলে কোরআন মাজিদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইয়াহুদি ও নাসারাদের কিতাবসমূহকে রদ করছে।
সত্য কথা হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এমন কোনো মাধ্যম ছিল না, যা দ্বারা তিনি নিজে ইয়াহুদীদের কিতাবে কী লেখা আছে তা জেনে নেবেন। এটা জানার জন্য তার কাছে কেবল ওহিরই সূত্র ছিল। সুতরাং এ আয়াত তার ওহিপ্রাপ্ত নবী হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল। এর দ্বারা তিনি ইয়াহুদীদের কিতাবে হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি কী ধরনের অপবাদ আরোপ করা হয়েছে, সে কথা জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তা খণ্ডনও করেছেন।
ফিকহি প্রমাণ
احکام القرآن للتھانوی :
"وما کان منها بآیات قرآنیة أو أسماء إلهیة وأمثالها إلا أن المقصود بها إضرار مسلم کالتفریق بین الزوجین … أو تسخیر مسلم بحیث یصیر مسلوب الاختیار في الحب أو البغض لأحد…فحرام لکونه ظلما".
(أحكام القرآن لظفر أحمد التهانوي: حكم الرقى والعزائم (1/ 51، 52)، ط. مكتبة التهانوي للطباعة والنشر، جمن، بلوشستان، باكستان)

