যে স্বপ্নের আলোকে রচিত ‘সহিহ বুখারি’
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হাদিসশাস্ত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি ইমাম বুখারি (রহ.) ছিলেন ইলমে হাদিস জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার অপরিসীম মেহনত ও আত্মত্যাগের ফলেই আজ আমরা প্রিয়নবী (সা.)-এর সুন্নাহর সর্বাধিক বিশুদ্ধ রূপটি হাতে পেয়েছি। একটি বিশেষ স্বপ্ন এবং দূরদর্শী চিন্তার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এই হাদিস গ্রন্থ রচনার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তিনি।
জন্ম ও দৃষ্টিশক্তি লাভ
ইমাম বুখারি (রহ.) ১৯৪ হিজরির ১৩ শাওয়াল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ এবং পুরো নাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বিন ইবরাহিম বিন মুগিরা বিন বারদিজবাহ।
বাল্যকালে মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকাকালে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এক রাতে তার মা স্বপ্নে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে দেখতে পান। তিনি তার মাকে বলেন, ‘তোমার কান্নাকাটির কারণে আল্লাহ তাআলা তোমার সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।’ সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখতে পান যে তার সন্তানের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরে এসেছে। তখন তিনি আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করেন। (গোলাম রসুল সাঈদি, তাজকেরাতুল মোহাদ্দেসিন, পৃষ্ঠা ১৭২)
তাকওয়া ও দূরদর্শী স্বপ্ন
বাল্যকাল থেকেই ইমাম বুখারির চরিত্রে তাকওয়া, পরহেজগারি ও বিশ্বস্ততার অপূর্ব গুণাবলী ফুটে ওঠে। তিনি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী ছিলেন এবং প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। যার বরকতে তিনি একাধিকবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে স্বপ্নে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
ইমাম বুখারি বলেন, ‘আমি একবার প্রিয়নবী (সা.)-কে স্বপ্নে দেখি যে, আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাতে পাখা ছিল যা দিয়ে তাকে বাতাস করছিলাম।’ এর ব্যাখ্যায় স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারক তাকে জানান যে, নবীজির প্রতি আরোপিত অসত্য কথাগুলো থেকে তুমি সত্য ও শুদ্ধ কথাগুলো আলাদা করে বের করে আনবে। তখন থেকেই তার মনে এমন একটি সুবিন্যস্ত গ্রন্থের প্রতি তীব্র আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা সংকলনে তিনি জীবনের সুদীর্ঘ ১৬টি বছর অতিবাহিত করেন।
বিশিষ্ট মুহাদ্দিস নজম ইবনে ফুজাইল (রহ.) বলেন, ‘একদা আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে স্বপ্নে দেখলাম যে, তিনি রওজা মোবারক থেকে বেরিয়ে আসছেন আর ইমাম বুখারি তার পেছনে পেছনে হাঁটছেন। নবীজি যে স্থানে পা মোবারক রাখছেন, তার পা তোলার পর ইমাম বুখারি ঠিক সে স্থানেই পা রেখে হাঁটছেন।’ (খতিব বাগদাদী, তারিখু বাগদাদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০)
উস্তাদ ও সমসাময়িকদের মূল্যায়ন
মুসলিম বিশ্বে ইমাম বুখারির মর্যাদা ছিল অত্যন্ত সুউচ্চ। তাঁর সহপাঠী ও উস্তাদগণ সবসময় তাঁর প্রশংসায় মুখর থাকতেন। ইবনে আল মুরজি (মৃত্যু ২৪৯ হি./৮৬৩ খ্রি.) বলেন, ‘তিনি হচ্ছেন মহান আল্লাহর নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা ধরণীর বুকে বিচরণ করছে।’ (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা ৪৮২)
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুজাইমা (রহ.) (মৃত্যু ২২৩হি./৮৩৭ খ্রি.) বলেন, ‘আকাশের নিচে ইমাম বুখারি অপেক্ষা হাদিস শাস্ত্রে সর্বাধিক জ্ঞানী ও অধিক সংরক্ষণকারী আমি আর কাউকে দেখিনি।’ (ইবনে হাজর, তাজকিরাতুল হুফফাজ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৫৬)
‘সহিহ বুখারি’ সংকলন ও ঐতিহাসিক অবদান
ইমাম বুখারি অত্যন্ত কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে লক্ষাধিক হাদিস থেকে গবেষণা চালিয়ে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদিসগুলো নিয়ে ‘সহিহ বুখারি’ সংকলন করেন। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ গ্রন্থে তিনি কোনো দুর্বল হাদিস স্থান দেননি।
এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারি বলেন, ‘আমি এ গ্রন্থে সহিহ হাদিস ব্যতীত একটি হাদিসও সংযোজন করিনি। আর গ্রন্থের পরিধি বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক সহিহ হাদিস লিপিবদ্ধ না করে ছেড়ে দিয়েছি। অর্থাৎ, এ গ্রন্থের বাইরেও আরও অনেক সহিহ হাদিস রয়েছে।’ (বদরুদ্দিন আইনি, উমদাতুল কারি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০)
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ছয় লক্ষ হাদিস যাচাই-বাছাই করে সুদীর্ঘ ১৬ বছরে এ সহিহ গ্রন্থটি সংকলন করেছি এবং এ গ্রন্থটিকে আমার ও আল্লাহ তাআলার মাঝে নাজাতের ওসিলারূপে স্থাপন করেছি।’ (ইবনে হাজার, হুদাস সারী, পৃষ্ঠা ৬৭৫)
ইন্তেকাল ও অলৌকিক নিদর্শন
ইলমে হাদিসের এই মহান সাধক ২৫৬ হিজরির শাওয়াল মাসের ১ তারিখ ঈদুল ফিতরের রাতে এশার নামাজের পর সমরকন্দে ইন্তেকাল করেন। ঈদের দিন জোহরের নামাজের পর তাকে দাফন করা হয়। দাফনের পর তার পবিত্র কবর থেকে মিশক আম্বরের মতো সুগন্ধি ছড়াতে থাকে এবং কবর বরাবর আকাশে লম্বাকৃতি একটি সাদা রেখা দেখা দেয়, যা মানুষ অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করে। পরবর্তীতে আল্লাহর এক নেককার বান্দা আল্লাহর দরবারে এই সুগন্ধি প্রকাশ বন্ধ করার জন্য দোয়া করলে তা নিবৃত হয়। (হাফিজ ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৩)
একটি পবিত্র স্বপ্ন এবং অদম্য সাধনার বলে ইমাম বুখারি (রহ.) যে মহাগ্রন্থ উপহার দিয়ে গেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। তার এই অনন্য ইখলাস ও ত্যাগের ইতিহাস আমাদের হৃদয়ে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেরণা জোগায়।

