কাবিননামায় স্বাক্ষর নিলেই কি বিয়ে হয়ে যায়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিবাহ মানবজীবনের একটি পবিত্র ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বন্ধন। ইসলাম ধর্মে বিয়ে কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং এটি একটি সুদৃঢ় ইবাদত ও সামাজিক স্বীকৃতি। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে দেখা যায়, মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া কেবল কাবিননামায় স্বাক্ষর নেওয়ার মাধ্যমে বিয়ের দাবি করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণামূলকভাবে বা ভুল বুঝিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের কাজের কোনো বৈধতা আছে কি?
মৌখিক ইজাব-কবুল ও সাক্ষীর অপরিহার্যতা
ইসলামী বিধানমতে, বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য বর ও কনের পারস্পরিক সম্মতি এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতিতে মৌখিকভাবে ইজাব ও কবুল বলা জরুরি। ইসলামী ফেকাহবিদদের মতে, মুখে ইজাব-কবুল না বলে কেবল লিখিতভাবে বা কাবিননামায় স্বাক্ষর করলে বিবাহ সংঘটিত হয় না।
কাবিননামা মূলত একটি সরকারি নিবন্ধন সনদ বা বিবাহের প্রমাণপত্র মাত্র। এটি মূল আকদ (চুক্তি) নয়। কোনো বিয়ে শরিয়তসম্মতভাবে মৌখিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল তা নথিভুক্ত করার জন্য কাবিননামা তৈরি করা হয়। তাই মুখে ‘কবুল’ না বলে বা কাউকে ভুল বুঝিয়ে শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর করিয়ে নিলে তা কোনোভাবেই বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে না এবং এভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস করাও সম্পূর্ণ হারাম।
বিয়ের গোপনীয়তা বর্জন ও প্রচারের নির্দেশ
ইসলাম ধর্মে বিয়েকে গোপন রাখতে নিষেধ করা হয়েছে, বরং তা প্রকাশ্যে সমাজে জানানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রিয়নবী (সা.) ঘোষণা করেছেন—
أَعْلِنُوا النِّكَاحَ، وَاضْرِبُوا عَلَيْهِ بِالدُّفُوفِ
‘তোমরা বিয়ে ঘোষণা করো, তা মসজিদে সম্পন্ন করো এবং এর উপলক্ষে দফ বাজাও।’ (তিরমিজি ১০৮৯)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, মুসলিম সমাজে বিয়ে যেন গোপনে না হয়; বরং তা যেন সবার কাছে একটি বৈধ ও স্বীকৃত সম্পর্ক হিসেবে পরিচিত লাভ করে। গোপনীয়তা অনেক সময় সমাজের ভেতর সন্দেহ, অপবাদ ও নানাবিধ অস্থিরতার জন্ম দেয়।
কনের সম্মতি গ্রহণের সঠিক পদ্ধতি
ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে কনের স্বাধীন মতামতের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক কনের সামনে বরের সার্বিক অবস্থা বর্ণনা করে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করতে হবে এবং তার সম্মতি নিতে হবে। এ বিষয়ে নবীজি (সা.) সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন—
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
‘কোনো বিধবা নারীকে তার স্পষ্ট নির্দেশ বা সম্মতি ছাড়া এবং কুমারী নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে তার অনুমতি নেব? তিনি বললেন, তার চুপ থাকাটাই তার অনুমতি।’ (বুখারি, মুসলিম)
কুমারী মেয়ের ক্ষেত্রে লজ্জার কারণে তার নীরবতাকেই সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে পূর্বে বিবাহিত (সাইয়েবাহ) নারীর ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে স্পষ্ট অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। কাউকে ভুল বুঝিয়ে বা ধোঁকা দিয়ে জোরপূর্বক কোনো চুক্তি বা কাবিননামায় স্বাক্ষর নেওয়া সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী অপরাধ।
বিয়ে হলো সততা, পবিত্রতা ও পারস্পরিক সম্মতির এক সুমহান বন্ধন। কেবল কাবিননামার পাতায় স্বাক্ষর করিয়ে কখনো শরয়ি বিধান অনুযায়ী বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। তাই বিবাহ সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপে শরিয়তের নির্ধারিত নিয়মকানুন, সাক্ষী ও মৌখিক ইজাব-কবুলের শর্ত শতভাগ রক্ষা করা অপরিহার্য, যাতে সমাজ ও পরকালে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা জবাবদিহিতার মুখে পড়তে না হয়।

