শয়তান থেকে মুক্তির দুর্গ সুরা নাসের, আছে যেসব ফজিলত
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অদৃশ্য কুমন্ত্রণা, মনের ভেতরকার ভয় কিংবা শয়তানের সুক্ষ্ম প্ররোচনা—মানবজীবন এসবের মুখোমুখি হয় প্রতিনিয়ত। আর এই অদৃশ্য ও দৃশ্যমান যাবতীয় অনিষ্ট থেকে রক্ষাকবচ হিসেবে মহান আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে দান করেছেন এক অনন্য নিয়ামত। পবিত্র কুরআনের শেষ সুরা—সুরা আন-নাস—হলো বান্দার আত্মিক সুরক্ষার এক অব্যর্থ দুর্গ।
সুরা নাসের শানে নুজুল: জাদুর রহস্য উন্মোচন ও নিরাময়
ইতিহাস ও হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সুরা ফালাক ও সুরা নাস একসঙ্গে নাজিল হয়েছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মদিনার এক ইহুদি যার নাম লাবিদ ইবনে আসাম এবং তার কন্যারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর জাদু করেছিল। এর ফলে প্রিয়নবী (সা.) কিছুটা অসুস্থ অনুভব করেন। অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে জাদুর আসল রহস্য উন্মোচিত হয়।
জানা যায়, একটি চিরুনি ও চুল দিয়ে জাদু করে তা ‘যারওয়ান’ কূপের তলদেশের একটি পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। ফেরেশতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সেই বস্তু কূপ থেকে তুলে আনা হয় এবং এই দুই সুরা (ফালাক ও নাস) পাঠ করে গিরাগুলো খোলার সঙ্গে সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। (তাফসির ইবনে কাসির)
সুরা আন-নাস (سورة الناس)-এর উচ্চারণ ও অর্থ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ
উচ্চারণ: ‘কুল আউজু বিরব্বিন নাস।
অর্থ: বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের কাছে।’
مَلِكِ النَّاسِ
উচ্চারণ: মালিকিন নাস।
অর্থ: ‘মানুষের অধিপতির কাছে।’
إِلٰهِ النَّاسِ
উচ্চারণ: ইলাহিন নাস।
অর্থ: ‘মানুষের ইলাহর (উপাস্যের) কাছে।’
مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ
উচ্চারণ: মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।
অর্থ: ‘আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে।’
الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ
উচ্চারণ: আল্লাজি ইউওয়াসউইসু ফি সুদুরিন নাস।
অর্থ: ‘যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।’
مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ
উচ্চারণ: ‘মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।’
অর্থ: ‘জিন ও মানুষের মধ্য থেকে।’
ফজিলত ও গুরুত্ব
সুরা নাসের রয়েছে অশেষ বরকত ও ফজিলত। হাদিস শরিফে এর নিয়মিত আমলের তীব্র তাগিদ দেওয়া হয়েছে—
হজরত উকবা ইবনে আমের জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার ওপর এমন কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে, যার সমকক্ষ আমি আর কিছু দেখিনি। তা হলো— ‘কুল আউজু বিরব্বিল ফালাক’ এবং ‘কুল আউজু বিরব্বিন নাস।’ (তিরমিজি ২৯০২)
এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি সকাল ও সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করবে, সে সমস্ত বিপদ-আপদ ও অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকবে।
দৈনন্দিন জীবনে শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিরাপদ থাকতে এবং অন্তরে প্রশান্তি লাভ করতে ঘুমানোর সময়কার এই সুন্নাত আমলটি অত্যন্ত কার্যকর। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে যখন ঘুমাতে যেতেন, তখন নিজের উভয় হাত একসঙ্গে মিলাতেন এবং তাতে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। এরপর মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের অংশসহ সাধ্যমতো পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে নিতেন। তিনি এটি তিনবার করতেন।’ (বুখারি ৫০১৭)
জীবন মানেই প্রতিনিয়ত অদৃশ্য নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রলোভনের মোকাবিলা করা। মানুষের মনকে আল্লাহর স্মরণ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য অসংখ্য ফাঁদ পেতে বসে থাকে অদৃশ্য শক্তির কুমন্ত্রণাদাতারা। সুরা আন-নাস কেবল একটি সুরা নয়, বরং এটি আত্মিক সুরক্ষার এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বর্ম। নিয়মিত সুরা নাসের আমল শুধু আমাদের কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের ধোঁকা থেকেই রক্ষা করে না, বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করার এক অবিচল শক্তি জোগায়। আসুন, দৈনন্দিন রুটিনে এই সুরার আমল বাড়িয়ে দিয়ে নিজের জীবনকে সুরক্ষিত ও শান্তিময় করে তুলি।

