লাগামহীন কথাবার্তা থেকে বিরত থাকার ফজিলত ও গুরুত্ব
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামে জিহ্বার হেফাজত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। স্বল্পভাষী হওয়া যেমন সুন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক, তেমনি এটি পরকালীন মুক্তির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত ও লাগামহীন কথাবার্তা অনেক সময় বড় বড় ঝগড়া-বিবাদ এবং সামাজিক অশান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একজন প্রকৃত মুমিন— হয় সে কল্যাণকর কথা বলবে, না হয় চুপ থাকবে। কেননা, অসংযত জিহ্বা, লাগামহীন কথাবার্তা মানুষের সারা জীবনের কষ্টার্জিত আমলনামাকে নিমিষেই নষ্ট করে দিতে পারে। তাই দুনিয়াবি ফেতনা-ফাসাদ থেকে বেঁচে থাকতে এবং পরকালে জান্নাত নিশ্চিত করতে জিহ্বার সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বল্পভাষী হওয়ার বিকল্প নেই। লাগামহীন কথাবার্তা থেকে বিরত থাকলে যেসব উপকারিতা ও ফজিলত অর্জিত হয়, তা তুলে ধরা হলো—
১. পাপ থেকে সুরক্ষা
জিহ্বার লাগামহীন ব্যবহারের কারণে গিবত, পরনিন্দা, মিথ্যা, চোগলখোরি এবং গালাগালের মতো ভয়াবহ গুনাহগুলো সংঘটিত হয়। অপ্রয়োজনীয় কথা পরিহার করে চুপ থাকলে এসব মারাত্মক পাপ থেকে খুব সহজেই বেঁচে থাকা সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
مَنْ صَمَتَ نَجَا
‘যে ব্যক্তি চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়।’ (তিরমিজি ২৫০১)
২. শয়তান থেকে হেফাজত
অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত কথা মানুষের ভেতর আত্মম্ভরিতা ও অহংকার তৈরি করে, যা শয়তানের প্ররোচনাকে বাড়িয়ে দেয়। পক্ষান্তরে, নীরবতা মানুষকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণা থেকে দূরে রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার আবু জার গিফারি (রা.)-কে অসিয়ত করে বলেন—
عَلَيْكَ بِطُولِ الصَّمْتِ، فَإِنَّهُ مَطْرَدَةٌ لِلشَّيطَانِ
‘তুমি দীর্ঘ নীরবতা অবলম্বন কর, কেননা তা শয়তানকে দূর করে দেয়।’ (বায়হাকি ৩/৪০৫)
৩. আত্মিক শক্তি অর্জন
অপ্রয়োজনীয় কথা বলার অভ্যাস মানুষের ভেতরকার মানসিক শান্তি ও নূর কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, পরিমিত কথা ও নীরবতা মানুষের অন্তরে এক বিশেষ আত্মিক শক্তি ও নূর সৃষ্টি করে, যা ইবাদত-বন্দেগিতে একাগ্রতা বাড়াতে দারুণভাবে সহায়তা করে। নীরবতা মানুষের দুনিয়াবি কোলাহল থেকে মনকে দূরে সরিয়ে আল্লাহর স্মরণে মশগুল হতে সাহায্য করে।
৪. মর্যাদা বৃদ্ধি
মানুষের অনেক কথার ভিড় ভুলত্রুটি ও গুনাহের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এর বিপরীতে কম কথা বলা এবং কেবল প্রয়োজনে মুখ খোলা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অহেতুক কথা না বলে চুপ থাকা অনেক সময় দীর্ঘ নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম প্রতিদান বয়ে আনে। হাদিসে এসেছে—
الصُّمْتُ حِكْمَةٌ وَقَلِيلٌ فَاعِلُهُ
‘নীরবতা একটি প্রজ্ঞা, আর এর ওপর আমলকারী খুবই কম।’ (বায়হাকি ৪/২৪৬)
৫. বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
ইসলামি স্কলার ও প্রাজ্ঞ মনীষীদের মতে, মানুষের আসল ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিমত্তা প্রকাশ পায় তার পরিমিত কথায়। কে কোথায় কথা বলবে আর কোথায় চুপ থাকবে, সেটিই একজন বুদ্ধিমান মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মনীষীরা খুব সুন্দর একটি কথা বলেছেন—
الْكَلَامُ كَالْفِضَّةِ وَالسُّكُوتُ كَالذَّهَبِ
‘কথা যদি রুপার মতো হয়, তবে চুপ থাকা সোনার মতো।’ (তিরমিজি ও অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত প্রজ্ঞামূলক বাণী)
সংযত জিহ্বা ও পরিমিত নীরবতা একজন মুমিনের জীবনকে শান্তিময় ও নিরাপদ করে তোলে। দুনিয়ার অনর্থক কথা ও বিতর্ক থেকে দূরে থেকে আমরা যদি জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, তবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জন করা আমাদের জন্য সহজ হবে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বেঁচে থাকার এবং জিহ্বাকে হেফাজত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

