ওজন কমাতে গিয়ে শরীরের সব চর্বি ঝরিয়ে ফেললে ক্ষতি হবে স্বাস্থ্যর
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ওজন কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকেই শরীরের চর্বি যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলতে চান। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ থাকতে শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চর্বি থাকা জরুরি। শরীরের চর্বি শুধু অতিরিক্ত ওজন হিসেবে জমা থাকে না; এটি শক্তি সঞ্চয়, হরমোন তৈরি, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবিটিস, কিছু ধরনের ক্যানসার ও অস্থিসন্ধির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে শরীরে চর্বির পরিমাণ অতিরিক্ত কমে গেলেও স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই শরীরের সব চর্বি দূর করার পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর দেহগঠন বজায় রাখাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
শরীরের চর্বি যেসব কাজে লাগে
খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করা চর্বি ও শরীরে জমা চর্বি এক বিষয় নয়। খাদ্য থেকে পাওয়া চর্বি শরীরের পুষ্টির একটি উৎস। অন্যদিকে, শরীরে জমা চর্বি মূলত শক্তি সঞ্চয়ের ভান্ডার হিসেবে কাজ করে।
শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শক্তি গ্রহণ করলে তার একটি অংশ চর্বিকোষে জমা হয়। এসব কোষ কেবল শক্তি সঞ্চয় করে না, শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। খাবার গ্রহণ কমে গেলে সঞ্চিত চর্বি থেকে শক্তি নিয়ে শরীর তার প্রয়োজন মেটাতে পারে।
হরমোন নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ চর্বি
চর্বিকোষ থেকে বিভিন্ন হরমোন ও সংকেতবাহী পদার্থ তৈরি হয়, যা শরীরের শক্তির ভারসাম্যসহ নানা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন হলো লেপটিন। এটি মস্তিষ্ককে শরীরে সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ সম্পর্কে সংকেত দেয়।
শরীরে শক্তির প্রাপ্যতা অতিরিক্ত কমে গেলে বেঁচে থাকার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে অপরিহার্য নয়—এমন কিছু কার্যক্রম শরীর সীমিত বা পরিবর্তন করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে প্রজননস্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর।
দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে চর্বি
শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতেও চর্বির ভূমিকা রয়েছে। শ্বেত চর্বি মূলত শক্তি সঞ্চয় ও দেহকে তাপের ক্ষয় থেকে সুরক্ষা দেয়। অন্যদিকে, বাদামি ও বেইজ চর্বির বিশেষ কোষ সঞ্চিত শক্তিকে তাপে রূপান্তর করতে পারে।
বিশেষ করে ঠান্ডা পরিবেশে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে এসব চর্বি ভূমিকা রাখে।
শরীরে চর্বি অতিরিক্ত কমে গেলে কী হয়?
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে অনেকেই জানেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের কারণেও গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি না পৌঁছালে বিভিন্ন কার্যক্রম সীমিত হয়ে যেতে পারে। শক্তির সঞ্চয় মারাত্মকভাবে কমে গেলে শরীর শক্তির চাহিদা মেটাতে পেশির টিস্যুও ভাঙতে শুরু করতে পারে। এর ফলে পেশির দুর্বলতা, হাড়ের স্বাস্থ্যহানি, শারীরিক ক্লান্তি এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে
শরীরে চর্বির পরিমাণ খুব কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত শক্তি না পাওয়ার কারণে হরমোনের ভারসাম্য ও প্রজননস্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম শক্তি গ্রহণ করলে পুরুষদের টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা, কর্মশক্তি ও শারীরিক সক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে, বিশেষ করে নারী খেলোয়াড়দের শরীরে শক্তির ঘাটতি দেখা দিলে মাসিক অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে, এমনকি বন্ধও হতে পারে। এসব লক্ষণ ইঙ্গিত দিতে পারে যে শরীর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পাচ্ছে না।
কিছু ক্ষেত্রে শরীরে অতিরিক্ত শক্তির সঞ্চয় কি উপকারী?
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু বয়স্ক ব্যক্তি এবং গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি শরীরের ওজনের সঙ্গে ভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত ফলাফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গুরুতর অসুস্থতার সময় খাবার গ্রহণ কমে গেলে শরীরে সঞ্চিত শক্তি অতিরিক্ত জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
এ থেকে ‘ওবেসিটি প্যারাডক্স’ বা স্থূলতা-সংক্রান্ত আপাতবিরোধী ধারণা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি ওজনের সঙ্গে ভিন্ন ধরনের বেঁচে থাকার ফলাফলের সম্পর্ক দেখা গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে স্থূলতা উপকারী কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত ওজন বাড়ানো উচিত। স্থূলতার সঙ্গে এখনো বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
একইভাবে, শরীরে চর্বির পরিমাণ অত্যন্ত কমে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগাও প্রাণঘাতী হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী অনাহারের কারণে সৃষ্ট খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
শরীরে কতটুকু চর্বি থাকা স্বাস্থ্যকর?
সবার জন্য প্রযোজ্য শরীরের চর্বির কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ মাত্রা নেই। বয়স, লিঙ্গ, দেহগঠন ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে স্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের শরীরে প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ থেকে ২৯ শতাংশ চর্বি থাকতে পারে। তবে এগুলো সর্বজনীন সীমা নয়। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে মূল্যায়ন করা বেশি কার্যকর।
খেলোয়াড়দের শরীরে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে চর্বি অত্যন্ত কম হলেই যে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, তা নয়।
৭০০ জনের বেশি খেলোয়াড়ের দেহগঠন নিয়ে করা একটি গবেষণায় পুরুষ খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে শরীরের চর্বির সর্বনিম্ন রেকর্ড করা মাত্রা ছিল প্রায় ১০ শতাংশ এবং নারী খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে প্রায় ১৬ শতাংশ।
শরীরের কোথায় চর্বি জমছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু শরীরে মোট চর্বির পরিমাণ নয়, কোথায় চর্বি জমছে, সেটিও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পেটের ভেতরে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চারপাশে জমা চর্বিকে ভিসেরাল ফ্যাট বলা হয়। এই চর্বি অতিরিক্ত বেড়ে গেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
ভিসেরাল ফ্যাট শরীরে প্রদাহ বাড়াতে এবং রক্তচাপ ও ইনসুলিনের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে টাইপ-২ ডায়াবিটিসসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বাড়িতে কীভাবে শরীরের চর্বি পরিমাপ করবেন?
শুধু ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়িয়ে শরীরের চর্বির পরিমাণ নির্ভুলভাবে জানা যায় না। এ জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
ডেক্সা স্ক্যানের মাধ্যমে শরীরের চর্বি, পেশি ও হাড়ের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়। তবে এ পরীক্ষার জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি প্রয়োজন এবং খরচও তুলনামূলক বেশি।
স্কিনফোল্ড ক্যালিপার দিয়ে ত্বকের নিচের চর্বি পরিমাপের আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়। তবে কোথায় ও কীভাবে মাপ নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করে। এ পদ্ধতিতে সরাসরি পেটের ভেতরের চর্বি পরিমাপ করা যায় না।
বায়োইলেকট্রিক্যাল ইমপিড্যান্স প্রযুক্তির স্মার্ট ওজনযন্ত্রও শরীরের চর্বির পরিমাণ অনুমান করে। তবে শরীরে পানির পরিমাণের পরিবর্তনে এসব যন্ত্রের ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে। ফলে এগুলোর পরিমাপকে পুরোপুরি নির্ভুল বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
কোমরের মাপ থেকেও পাওয়া যায় ধারণা
স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য সবার শরীরের চর্বির শতকরা হার বিস্তারিতভাবে মাপা জরুরি নয়। কোমরের মাপ, উচ্চতার তুলনায় কোমরের পরিধি এবং কোমর ও নিতম্বের পরিধির অনুপাত থেকেও পেটের চর্বি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, বিএমআই বা বডি মাস ইনডেক্সের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, এটি পেশি ও চর্বির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, পেশিবহুল কোনো ব্যক্তির বিএমআই বেশি হলেও তার শরীরে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে বদলায় দেহগঠন
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়তে পারে। একই সময়ে পেশি ও হাড়ের ভর কমে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়।
এ পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশি ও হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মূল বক্তব্য হলো, সুস্থ থাকার জন্য শরীরের সব চর্বি দূর করার চেষ্টা নয়, বরং শরীরে চর্বি, পেশি ও অন্যান্য টিস্যুর মধ্যে স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
সূত্র: সামা টিভি
