সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাধারণভাবে সুস্থ থাকার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। তবে সবার ক্ষেত্রে এই নিয়ম সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। কিছু মানুষ মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও সারাদিন স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন। তাদের মধ্যে ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতিও তেমন দেখা যায় না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর পেছনে রয়েছে বিশেষ কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর ইমিউনোলজির অধ্যাপক অ্যামি পিউ বার্নার্ড এমনই একজন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি তুলনামূলক কম ঘুমিয়েই স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ধরে রেখেছেন। সাধারণত রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যান এবং ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যে জেগে ওঠেন। কখনো ঘুমাতে দেরি হলে তার ঘুমের সময় পাঁচ ঘণ্টায় নেমে আসে।
তারপরও সকালে ঘুম থেকে উঠে কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে যাওয়া, এক ঘণ্টা ব্যায়াম করা এবং সকাল ৮টার আগেই দেড় ঘণ্টার কাজ শেষ করার মতো কর্মব্যস্ত রুটিন বজায় রাখেন তিনি। মজার বিষয় হলো, তার বাবা ও ভাইয়ের মধ্যেও একই ধরনের কম ঘুমানোর প্রবণতা রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর গবেষকদের কাছে রক্তের নমুনা পাঠান বার্নার্ড। পরীক্ষার পর জানা যায়, তার শরীরে এমন একটি বিরল জিনগত পরিবর্তন রয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় কম ঘুমানোর সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কম ঘুমের পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্য
বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে ‘ফ্যামিলিয়াল ন্যাচারাল শর্ট স্লিপ’ বা এফএনএসএস নামে অভিহিত করেছেন। যাদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য থাকে, তারা সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে গেলেও অন্যদের তুলনায় অনেক আগে জেগে ওঠেন। তাদের দৈনিক ঘুমের পরিমাণ সাধারণত চার থেকে সাড়ে ছয় ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
এ পর্যন্ত গবেষকেরা এফএনএসএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন।
গবেষক দলের নেতৃত্ব দেওয়া আণবিক জীববিজ্ঞানী ইং-হুই ফু জানান, এসব মানুষের বিশেষত্ব হলো, কম সময় ঘুমিয়েও তারা স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে পারেন। যদিও এর পেছনের পুরো প্রক্রিয়া এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট নয়। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু জিনগত পরিবর্তন ঘুমের সময় কমানোর পাশাপাশি অপর্যাপ্ত ঘুমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও শরীরকে সুরক্ষা দিতে পারে।
স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের সুরক্ষায় সম্ভাব্য প্রভাব
এফএনএসএস নিয়ে গবেষণায় মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সম্পর্কেও আশাব্যঞ্জক কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১৯ সালে ইং-হুই ফুর নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণায় ইঁদুরের শরীরে এফএনএসএসের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন ঘটানো হয়। এতে দেখা যায়, কম ঘুমানোর পরও এসব ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি তুলনামূলক ভালো ছিল। অন্য একটি পরীক্ষায় একই ধরনের কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য আলঝেইমারস রোগের মতো অবস্থার ঝুঁকি কমাতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এর আগে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যমজ দুই ভাইয়ের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। তাদের একজনের মধ্যে কম ঘুমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন থাকলেও অন্যজনের মধ্যে তা ছিল না।
গবেষণায় দেখা যায়, জিনগত পরিবর্তন থাকা ভাইটি নিয়মিত অন্য ভাইয়ের তুলনায় প্রায় এক ঘণ্টা কম ঘুমাতেন। পরবর্তী সময়ে দুজনকে একটানা ৩৮ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখার পরীক্ষায় কম ঘুমানো ভাইটির মনোযোগ ও কাজের দক্ষতা তুলনামূলকভাবে বেশি অক্ষুণ্ন ছিল। অন্য ভাইয়ের তুলনায় তার কর্মক্ষমতার ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ কম দেখা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, কম সময় ঘুমালেও তার গভীর ঘুমসহ নন-র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা নন-আরইএম ঘুমের পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ, কম সময়ের মধ্যেও তিনি ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যায় পর্যাপ্তভাবে সম্পন্ন করতে পারছিলেন।
ভবিষ্যতে নতুন ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রাকৃতিকভাবে কম ঘুমানোর পেছনে কাজ করা জিনগুলো কীভাবে শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে, তা জানা গেলে ভবিষ্যতে ঘুমসংক্রান্ত সমস্যার চিকিৎসায় নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের পথ খুলতে পারে। এমনকি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কম ঘুমিয়েও কর্মক্ষম রাখার গবেষণাতেও এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষক ইং-হুই ফু। তার মতে, জিনগুলো কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে ঘুমের ঘাটতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীরকে রক্ষা করে, তা আগে ভালোভাবে বুঝতে হবে। যথাযথ জ্ঞান ছাড়া এই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে ওষুধ তৈরি করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে আলঝেইমারস, পারকিনসনস কিংবা ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঘুমের সময় নির্ধারণে জিনের প্রভাব
শুধু বিরল জিনগত পরিবর্তন নয়, মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের সময় নির্ধারণেও অসংখ্য সাধারণ জিনের ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ব্যক্তিভেদে ঘুমের সময়ের পার্থক্যের ৩০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত জিনগত কারণে হতে পারে। এ পর্যন্ত ঘুমের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েক শ জিনগত অঞ্চল শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রায় ২৪৪টি জিনগত অঞ্চল চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলো ঘুমের সময়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে গবেষণাটি এখনো কোনো বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি; প্রিপ্রিন্ট হিসেবে রয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও কিংস কলেজ লন্ডনের জিনতত্ত্ববিদ ইসাবেল অস্টিন-জিমারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব জিনগত পরিবর্তনের প্রতিটির প্রভাব খুবই সামান্য। একটি পরিবর্তনের কারণে ঘুমের সময়ের পার্থক্য প্রায় এক মিনিট হতে পারে। তবে সবগুলো জিনগত বৈচিত্র্যের সম্মিলিত প্রভাবে একজন মানুষের ঘুমের সময় অন্যজনের তুলনায় প্রায় ২০ মিনিট কম বা বেশি হতে পারে।
কম ঘুমানোর জিনগত প্রবণতা সব সময় উপকারী নয়
কম ঘুমানোর জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকলেই যে তা সব ক্ষেত্রে ভালো ফল বয়ে আনবে, এমন নয়। এ বিষয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক চিয়ারা পেত্রোসেলিনির নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ৩৪৩ জন মায়ের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তাদের প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা ছিল গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কম ঘুমানোর প্রবণতা মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, যাদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, তাদের প্রসবোত্তর সাইকোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে কম প্রবণতাসম্পন্ন নারীদের তুলনায় অর্ধেক।
অনিদ্রার ক্ষেত্রেও গবেষকেরা একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করেন। তাদের ধারণা, জীবনের আগের পর্যায় থেকেই ঘুমের ব্যাঘাতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় সন্তান জন্মের পর ঘুমের সমস্যা এসব নারীর মেজাজ ও মানসিক অবস্থার ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে অন্য গবেষণায় কম ঘুমের প্রবণতার সঙ্গে বেশ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ইসাবেল অস্টিন-জিমারম্যান ও তার দলের গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণভাবে কম ঘুমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য অনিদ্রা, ক্লান্তি এবং বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এডিএইচডি, বিষণ্নতার উপসর্গ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস।
গবেষকদের বক্তব্য, মানুষের ঘুমের প্রয়োজনীয়তা জিনগত বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কেউ পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়েও সতেজ থাকেন বলে সবার জন্য কম ঘুমানো উপকারী—এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রকৃতিগতভাবে কম ঘুমানোর সক্ষমতা যাদের রয়েছে, তারা মূলত একটি বিরল ব্যতিক্রম। তাই নিজের ঘুমের সময় কমিয়ে ফেলার আগে মনে রাখা জরুরি, অভ্যাসের কারণে ঘুম কম হওয়া আর জিনগতভাবে কম ঘুমিয়েও সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকা এক বিষয় নয়।

