আম ও অ্যাভোকাডো খেলে কি হৃদযন্ত্র ভালো থাকবে? যা বলছে গবেষণা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতিদিনের খাবারে আম ও অ্যাভোকাডো রাখলে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যে মিলতে পারে কিছু অপ্রত্যাশিত উপকার। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, টানা আট সপ্তাহ প্রতিদিন এই দুটি ফল খেয়েছেন এমন প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তনালির কার্যকারিতা ও রক্তচাপের উন্নতি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ সময় তাদের শরীরের ওজন বা মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বাড়েনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জার্নাল অব দ্য অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত গবেষণাটি বলছে, প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ আম ও অ্যাভোকাডো যোগ করলে হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা মিলতে পারে।
ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ইলিনয় টেক) গবেষকেরা এ বিষয়ে গবেষণা করেন। তাদের গবেষণায় প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় একটি মাঝারি আকারের হ্যাস অ্যাভোকাডো এবং এক কাপ তাজা আম রাখা হয়। অংশগ্রহণকারীরা টানা আট সপ্তাহ এভাবে খাবার খান। অন্য একটি দল একই পরিমাণ ক্যালরি সরবরাহকারী শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ করেন, যেখানে আম ও অ্যাভোকাডোর পরিবর্তে অন্য খাবার দেওয়া হয়।
গবেষণার ফলাফলে দুই দলের মধ্যে রক্তনালির কার্যকারিতা ও রক্তচাপের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।
রক্তনালির কার্যকারিতায় আম ও অ্যাভোকাডো
গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে রক্তনালির প্রসারিত হওয়ার ক্ষমতায়। রক্ত চলাচলের সময় রক্তনালি কতটা সহজে প্রসারিত হতে পারে, তা সুস্থ রক্তসঞ্চালনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি হৃদস্বাস্থ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
এ বিষয়টি যাচাই করতে গবেষকেরা ফ্লো-মিডিয়েটেড ডাইলেশন পরীক্ষা করেন। এটি রক্তনালির ভেতরের আবরণ বা এন্ডোথেলিয়ামের কার্যকারিতা পরিমাপের একটি প্রচলিত পদ্ধতি। এন্ডোথেলিয়াম হলো রক্তনালির ভেতরের পাতলা কোষস্তর, যা রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তনালির প্রসারণ ও সংকোচনে ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
গবেষণায় দেখা যায়, যারা প্রতিদিন আম ও অ্যাভোকাডো খেয়েছেন, তাদের এফএমডির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, তুলনামূলক খাদ্য গ্রহণকারী দলের ক্ষেত্রে তা কমে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, নিয়মিত আম ও অ্যাভোকাডো খেলে রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা মিলতে পারে।
রক্তচাপের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে। তুলনামূলক খাদ্য গ্রহণকারী দলের পুরুষদের কেন্দ্রীয় রক্তচাপ গড়ে ৫ mmHg বেড়েছিল। অন্যদিকে, আম ও অ্যাভোকাডো খাওয়া দলের পুরুষদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১ দশমিক ৯ mmHg কমে যায়।
রক্তচাপের নিচের সংখ্যাটিকে ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বলা হয়। হৃদযন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দনের মধ্যবর্তী বিশ্রামের সময় ধমনিতে যে চাপ থাকে, এটি তার পরিমাপ। ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চ রক্তচাপ হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
গবেষকদের মতে, এ ধরনের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকলে তা চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
খাবারে সামান্য পরিবর্তনেই মিলতে পারে হৃদস্বাস্থ্যের উপকার
গবেষণার প্রধান গবেষক ও ইলিনয় টেকের অধ্যাপক ব্রিট বার্টন-ফ্রিম্যান বলেন, ‘হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পুষ্টিকর খাবারকে প্রাধান্য দেওয়ার গুরুত্ব এই গবেষণায় আবারও উঠে এসেছে। বিশেষ করে প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। সুখবর হলো, প্রতিদিনের খাবার বা নাশতায় অ্যাভোকাডো ও আমের মতো পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল যোগ করলেই হৃদস্বাস্থ্যের উপকার হতে পারে। এর জন্য কঠোর খাদ্যনিয়ম মেনে চলা বা জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই।’
রক্তনালির কার্যকারিতা ও রক্তচাপের উন্নতির পাশাপাশি আম ও অ্যাভোকাডো খাওয়া দলের অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যতালিকায় ফাইবার, ভিটামিন সি এবং মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণও বেড়েছিল। এসব পুষ্টি উপাদান হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে। গবেষকদের ধারণা, এই উপাদানগুলোই গবেষণায় দেখা কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া কিডনির স্বাস্থ্যের কয়েকটি সূচকেও উন্নতি দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইজিএফআর, যা রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করতে কিডনি কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ। তবে সব স্বাস্থ্যসূচকে একই ধরনের উন্নতি দেখা যায়নি। কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা এবং প্রদাহের সূচকগুলোতে তুলনামূলক দলের চেয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।
গবেষণার ফলাফল বলছে, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফল রাখা হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
যে কারণে আম ও অ্যাভোকাডো হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী
আম ও অ্যাভোকাডোর স্বাদ এবং পুষ্টিগুণ একে অপরের থেকে আলাদা। তবে দুটি ফলেই এমন কিছু পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা হৃদযন্ত্র ও শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম ভালো রাখতে সহায়তা করে।
আমের পুষ্টিগুণ
আম খাদ্যআঁশ ও ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস। প্রতি ৩/৪ কাপ আমে প্রায় ২ গ্রাম খাদ্যআঁশ থাকে, যা দৈনিক চাহিদার ৭ শতাংশ। একই পরিমাণ আম থেকে দৈনিক চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
ভিটামিন সি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের কোষকে ক্ষতিকর উপাদানের প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, খাদ্যআঁশ হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রাখে। পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, ওজন ব্যবস্থাপনা ও হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অ্যাভোকাডোর পুষ্টিগুণ
অ্যাভোকাডোতেও রয়েছে বেশ কিছু উপকারী পুষ্টি উপাদান। ৫০ গ্রাম বা মাঝারি আকারের একটি অ্যাভোকাডোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ৩ গ্রাম খাদ্যআঁশ থাকে, যা দৈনিক চাহিদার ১১ শতাংশ। এতে প্রায় ৬ গ্রাম অসম্পৃক্ত চর্বি থাকে। পাশাপাশি রয়েছে ২৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, যা দৈনিক চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ।
অ্যাভোকাডোর অসম্পৃক্ত চর্বি হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। খাদ্যতালিকায় ক্ষতিকর স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে এ ধরনের চর্বি রাখলে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল কমাতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে, পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও পটাশিয়ামের সমন্বয়ে আম ও অ্যাভোকাডো প্রতিদিনের খাবারের পুষ্টিমান বাড়াতে পারে। তবে শুধু একসঙ্গে খাওয়ার কারণেই দুটি ফলের উপকারিতা বেশি হয় কিনা, তা এই গবেষণায় নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রতিদিনের খাবারে আম ও অ্যাভোকাডোর মতো পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল যোগ করা হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখার একটি সহজ উপায় হতে পারে। তবে গবেষণাটি মাত্র আট সপ্তাহ ধরে এবং সীমিতসংখ্যক মানুষের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি

