মুখের দুর্গন্ধ দূর করার সহজ উপায়
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০২ পিএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মুখের দুর্গন্ধের সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। কিন্তু কেন মুখে দুর্গন্ধ হয়, আর কী করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়- এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের চিকিৎসক ও সহায় হেলথের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডা. তাসনিম জারা।
মুখের দুর্গন্ধের কারণ এবং সমাধানকে তিনি কয়েক ধাপে বিশ্লেষণ করেছেন। সেসব হলো-
মুখ শুকিয়ে যাওয়া
আমাদের মুখের ভেতরটা সাধারণত ভেজা থাকে। কারণ, সারাক্ষণই মুখের ভেতরে লালা তৈরি হতে থাকে। এই লালা আমাদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এটি মুখ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে, ছোট ছোট খাদ্যকণা সরিয়ে দেয় এবং যেসব উপাদান মুখে দুর্গন্ধ তৈরি করতে পারে, সেগুলোও পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। কিন্তু পর্যাপ্ত লালা না থাকলে মুখ শুকিয়ে যায় এবং তখন মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে।
যেমন, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকের মুখে দুর্গন্ধ থাকে। এর একটি কারণ হলো ঘুমের সময় মুখে লালা তৈরির পরিমাণ কমে যাওয়া।
মুখ যাতে অতিরিক্ত শুকিয়ে না যায়, তার কিছু উপায় উল্লেখ করেছেন তাসনিম জারা-
প্রথমত, পর্যাপ্ত পানি পান করুন। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে মুখেও লালা কম তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত চা, কফি ও সফট ড্রিংকস এড়িয়ে চলুন। এগুলো মুখ শুষ্ক করে দিতে পারে।
তৃতীয়ত, এমন খাবার খান যেগুলো ভালোভাবে চিবাতে হয়। যেমন—শসা, গাজর ও আপেল। খাবার চিবানোর সময় মুখে লালা তৈরি বাড়ে।
চতুর্থত, চিনি ছাড়া চুইংগাম চিবাতে পারেন। এটিও লালা তৈরিতে সাহায্য করে। তবে চিনি ছাড়া যেসব চুইংগাম আছে সেসব চিবাতে চেষ্টা করবেন।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
তাসনিম জারা বলেন, আমি দুইটা বিষয় তুলে ধরবো। প্রথমটা হল চিনিযুক্ত খাবার আর পানীয়। যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলবেন। কেন বুঝিয়ে বলি। চিনি আছে এমন কিছু আপনি যখন খান, দাঁতের ওপরে চিনিযুক্ত খাবারের কণা লেগে থাকে, সেই চিনি হজম করার কাজে লেগে পরে আমাদের মুখের ভেতর থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া। এসময়ে কিছু এসিড উৎপাদন হয়, যা গিয়ে দাঁতকে আক্রমণ করে।
বারবার এমন হতে থাকলে দাঁতের বাইরের আবরণ ক্ষয় হয়ে যায়, দাঁতে ছোট ছোট গর্ত দেখা দেয়। এখন এই ছোট গর্তে দুর্গন্ধ তৈরি করে এমন জীবাণুগুলো লুকিয়ে থাকার জায়গা পেয়ে যায়। তারপর সেই চিপা থেকে দাঁত ব্রাশ করে বা ফ্লস করেও এগুলোকে বের করা দুরূহ হয়ে পরে। ফলে মুখে দুর্গন্ধ হয়।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস থাকলে আরেকটা সমস্যা দেখা দিতে পারে- অপুষ্টি। শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাস আপনার শরীর সুস্থ রাখবে, মুখের দুর্গন্ধও দূরে রাখবে। আপনি দিনে কী খাচ্ছেন, সেটা একটু খেয়াল করবেন। বেশি বেশি শাক-সবজি ফলমূল খাবেন এগুলোতে প্রচুর ভিটামিন মিনারেল থাকে।
বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন রঙের সবজি আর ফল খাওয়ার চেষ্টা করবেন। যে সিজনে যা সুলভমুল্যে পাওয়া যায়, সেগুলোই বেশি বেশি খাবেন।
মুখের ভেতর ঠিকমতো পরিষ্কার না রাখা
মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার না করলে জিহ্বার ওপর, দুই দাঁতের মাঝখানে কিংবা দাঁত ও মাড়ির মাঝখানে ছোট ছোট খাদ্যকণা আটকে থাকতে পারে। মুখের জীবাণু এসব খাদ্যকণা ভাঙতে শুরু করলে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়, যা মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করতে পারে।
তাই মুখের ভেতরটা নিয়মিত ও ভালোভাবে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি।
এ ক্ষেত্রে চারটি কাজ করতে পারেন।
প্রথমত, দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করুন। প্রতিবার অন্তত দুই মিনিট ধরে দাঁত ব্রাশ করার চেষ্টা করবেন। ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। দাঁতের ভেতরের দিক, বাইরের দিক এবং যে অংশ দিয়ে খাবার চিবান—সব জায়গা ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন দাঁতের মাঝখানের অংশ পরিষ্কার করুন। আমরা অনেক সময় শুধু দাঁত ব্রাশ করেই মনে করি মুখ পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু টুথব্রাশ সাধারণত দুই দাঁতের মাঝখানে ভালোভাবে পৌঁছাতে পারে না। ফলে সেখানে খাদ্যকণা ও জীবাণুর আস্তরণ জমতে পারে এবং দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে।
দাঁতের মাঝখান পরিষ্কার করতে ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে পারেন। আলতোভাবে ফ্লস করবেন, বেশি জোরে ঘষবেন না। চাইলে ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ বা ওয়াটার ফ্লসারও ব্যবহার করতে পারেন। টুথপিক দিয়ে দাঁতের মাঝখান খোঁচাখুঁচি করা ঠিক নয়। এতে মাড়ির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তৃতীয়ত, জিহ্বা পরিষ্কার করুন। বিশেষ করে জিহ্বার পেছনের দিকে ব্যাকটেরিয়া ও আবরণ জমে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। দিনে একবার আলতো করে টাং ক্লিনার বা টাং স্ক্র্যাপার দিয়ে জিহ্বা পরিষ্কার করতে পারেন। জিহ্বার পেছন থেকে সামনের দিকে আলতোভাবে পরিষ্কার করবেন।
চতুর্থত, প্রয়োজন হলে মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন। এটি মুখ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু মাউথওয়াশ, চুইংগাম বা লজেন্স ব্যবহার করে দুর্গন্ধ ঢেকে রাখার চেষ্টা না করে দুর্গন্ধের মূল কারণ খুঁজে বের করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, এসব কিছু সাময়িকভাবে দুর্গন্ধ কমাতে পারে। কিন্তু মূল কারণের চিকিৎসা না করলে দুর্গন্ধ আবার ফিরে আসতে পারে।
ধূমপান, জর্দা, গুল
তামাক থেকে নিজস্ব একটি দুর্গন্ধ তৈরি হয়। পাশাপাশি তামাক মুখ শুকিয়ে দিতে পারে এবং মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব কারণেও মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে।
আপনি যদি ধূমপান করেন, তাহলে আজ থেকেই ছাড়ার চেষ্টা করুন। এতে মুখের দুর্গন্ধ কমার পাশাপাশি আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও অনেক উপকার হবে।
আর তামাক শুধু সিগারেটেই থাকে না। বিভিন্ন ধরনের জর্দা, গুল, সাদা পাতা এবং কিছু পান মসলাতেও তামাক থাকতে পারে। এসব পণ্য মুখের দুর্গন্ধের পাশাপাশি মুখ ও গলার বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই এগুলো থেকে দূরে থাকুন।
মুখে দুর্গন্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মুখের বিভিন্ন রোগ।
যেমন—দাঁতের ক্ষয়, দাঁতে গর্ত এবং মাড়ির রোগ। দাঁতের গর্তে যেমন জীবাণু ও খাদ্যকণা আটকে থাকতে পারে, মাড়ির রোগের ক্ষেত্রেও দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী জীবাণু জমার সুযোগ তৈরি হয়।
মাড়ির রোগের একটি সমস্যা হলো—অনেক সময় এতে তেমন ব্যথা হয় না। ফলে আমরা বুঝতেই পারি না যে মাড়িতে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসা না করলে ধীরে ধীরে দাঁত নড়বড়ে হয়ে একসময় পড়ে যেতে পারে।
তাই নিজে নিজে যত্ন নেওয়ার পরও যদি মুখের দুর্গন্ধ থেকে যায়, তাহলে একজন ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন। তিনি পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন দাঁত, মাড়ি বা মুখের অন্য কোনো সমস্যার কারণে দুর্গন্ধ হচ্ছে কি না এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে পারবেন।
বিশেষ করে দাঁত ব্রাশ করার সময় নিয়মিত মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া, মাড়ি লাল হয়ে যাওয়া, দাঁত নড়বড়ে হওয়া বা মুখে দীর্ঘদিন দুর্গন্ধ থাকা—এসব লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না।
সবশেষে সহজ করে বলি—মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে শুধু মুখে কোনো সুগন্ধি জিনিস ব্যবহার করলেই হবে না। পর্যাপ্ত পানি পান করুন, সুষম খাবার খান, দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করুন, প্রতিদিন দাঁতের মাঝখান পরিষ্কার করুন, জিহ্বা পরিষ্কার রাখুন এবং তামাকজাতীয় পণ্য এড়িয়ে চলুন।
এরপরও যদি দুর্গন্ধ থেকে যায়, একজন ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন। কারণ, দুর্গন্ধ অনেক সময় মুখের ভেতরের কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে।
