কিডনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা
সচেতনতাই হোক জনস্বাস্থ্যের রক্ষাকবচ
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কিডনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান বিশ্বে অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে কিডনি রোগ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশে এটি এখন আর কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব কিডনি দিবস সামনে রেখে সোমবার যুগান্তর আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা যে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন, তা আমাদের জন্য যেমন উদ্বেগের, তেমনি সময়োপযোগী সতর্কবার্তাও বটে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং বছরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাচ্ছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার ভার বহন করা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য কাঠামোর জন্য স্বাভাবিকভাবেই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
কিডনি রোগকে বিশেষজ্ঞরা ‘নীরব ঘাতক’ হিসাবে অভিহিত করেছেন। এর প্রধান কারণ হলো, কিডনির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা দেয় না। যখন লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন চিকিৎসা হিসাবে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের মাত্র ১০ শতাংশ রোগী ডায়ালাইসিসের খরচ বহন করার সক্ষমতা রাখেন। এই আর্থিক অসংগতি দূর করতে এবং অকাল মৃত্যু রোধ করতে রোগ নির্ণয়ের চেয়ে ‘প্রতিরোধ’ ও ‘আর্লি ডিটেকশন’ বা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে এসেছে, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন এবং ভেজাল খাদ্য গ্রহণ কিডনি বিকল হওয়ার প্রধান কারণ। অথচ জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন এবং নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সরকারের পক্ষ থেকে এক লাখ হেলথ কেয়ারকর্মী নিয়োগ এবং ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এই জনবলকে দক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে কিডনি স্ক্রিনিংয়ের কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও রেফারেল সিস্টেম উন্নত করা গেলে প্রান্তিক মানুষ সঠিক সময়ে সঠিক সেবা পাবেন। কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ও দাতার সংকট একটি বড় অন্তরায়। দেশে প্রতিবছর যতগুলো ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রয়োজন, তার মাত্র ৫ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে। ব্রেন ডেথ রোগীদের অঙ্গ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ টিমের অভাব এবং ইমোশনাল ডোনার সংক্রান্ত আইনি অস্পষ্টতাও দূর করা জরুরি।
আমরা মনে করি, চিকিৎসকদের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদেরও মরণোত্তর অঙ্গদানে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া করপোরেট হাসপাতালগুলোর বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে চিকিৎসাকে সাশ্রয়ী ও মানবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। পাঠ্যবইয়ে কিডনি সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি পরিবার থেকেই যদি খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চার সঠিক শিক্ষা দেওয়া যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। গণমাধ্যমকেও নিয়মিতভাবে এই নীরব ঘাতক সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যেতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, সুস্থ কিডনি কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম শক্তি। এক্ষেত্রে সরকার, চিকিৎসক, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ও সঠিক জনসচেতনতাই পারে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে অগণিত প্রাণ রক্ষা করতে।
