ঐতিহ্যে ইসলাম
মরুর বুকে মমতার ধারা : রানি জুবাইদার অমর জলকাব্য
Advertisement
ফাত্তাহ তানভীর রানা
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সেদিন মক্কা সিটি ট্যুর ছিল। আমরা মসজিদে নামিরা থেকে আরাফাতের ময়দানে গেলাম। আরাফাতের ময়দান ঘুরে মুজদালিফা হয়ে মিনা যাওয়ার পথে পুরোনো স্থাপনা লক্ষ করি। স্থাপনাগুলো ড্রেনের মতো, পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে দৃষ্টি সীমানার বাইরে। মনে প্রশ্ন জাগে, এগুলো কী? গুগলে সার্চ দিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম। এ হলো, নহরে জুবাইদাহ! নহর সমার্থক সরু, স্রোতস্বিনী, জলধারা, খাল, নালা।
আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী জুবাইদা বিনতে জাফর মক্কায় হজযাত্রীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির খাল নির্মাণ করেছিলেন। যা হজের সময় পানির অভাব দূর করে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। এ খালটি তায়েফের নিকটস্থ ঝরনা থেকে পানি এনে মক্কা পর্যন্ত পৌঁছে দিত। জুবাইদা নিজে এ বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করে ব্যয়ভারও বহন করেন। নহরে জুবাইদা ইসলামিক প্রকৌশল ও মানব সেবার এক বিস্ময়কর নিদর্শন হিসাবে বিদ্যমান। জুবাইদা অত্যন্ত বিদুষী, ধর্মপরায়ণ ও পরোপকারী একজন নারী ছিলেন। জুবাইদা জাফর ইবনুল মানসুরের কন্যা। জাফর ইবনুল মানসুর খলিফা হারুনুর রশিদের চাচা। জুবাইদার আসল নাম ছিল আমাতুল আজিজ। তার দাদা আল-মানসুর তাকে আদর করে ‘জুবাইদা’ (ছোট মাখনের টুকরা) ডাকতেন। কালক্রমে তিনি ‘জুবাইদা’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন।
নহরে জুবাইদা নির্মিত হয়েছিল ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে। এটি ইরাকের নুমান উপত্যকা থেকে শুরু হয়ে তায়েফের পাশ দিয়ে আরাফাত হয়ে মক্কার দিকে পানি সরবরাহ করত। প্রায় এক হাজার বছর ধরে সচল থাকলেও বর্তমানে কিছু অংশ অবশিষ্ট রয়েছে; তবে ব্যবহৃত হয় না। নহরে জুবাইদা কঠিন ভূখণ্ডে সুড়ঙ্গ ও জলপ্রণালি তৈরি করে, বিশাল প্রকৌশল কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। এর নির্মাণে বেশ বাধা অতিক্রম করতে হয়েছিল। কঠিন শিলা কেটে খাল তৈরি করা এর অন্যতম। নহরে জুবাইদা একটি জটিল প্রকৌশল, যেখানে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, খালের অংশ এবং জলাধার নির্মাণ করা হয়েছিল, যা পানিকে বাষ্পীভবন থেকে রক্ষা করত।
সে সময় মক্কায় জমজম ছাড়া পানির উৎস ছিল না। হজে প্রচুর মানুষের ভিড়ে পানির তীব্র সংকট দেখা দিত। উচ্চ মূল্য পানি ক্রয় করতে হতো। জুবাইদার খাল খননের ফলে হাজিদের জন্য বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত হয়। এ ব্যবস্থা মক্কা ও আশপাশের এলাকার কৃষকদেরও উপকৃত করেছিল। তারা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে খালের পানি ব্যবহার করত। তিনি মক্কা ও মদিনা পথে মুসলিম হজযাত্রীদের জন্য কূপ, জলাধার এবং কৃত্রিম পুল তৈরি করেন। ‘দারব জুবাইদা’ (জুবাইদার পথ) নামে পরিচিত পথটির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। খালটি শুধু পানিই সরবরাহ করত না, বরং বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত ‘দারব জুবাইদা’ নামক (হজ যাত্রার পথ)-কে সুগম করে তোলে। হজযাত্রীদের সুবিধার জন্য পথে বিশ্রামস্থল, কূপ, পুকুর ও বাতিঘর স্থাপন করা হয়। নহরে জুবাইদা শুধু মক্কার হাজিদের পানির সংকট দূর করেনি, বরং শত শত বছর ধরে মুসলিম উম্মাহর সেবা ও নারীর দূরদর্শিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আজকের যুগেও অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম নারীরা অবহেলিত। সেই সময় রানি জুবাইদা কি চিন্তা করেছিলেন! এর ফলপ্রসূ বাস্তবায়নও বাকি রাখেননি। নারী জাগরণের ইতিহাসে তাকে উদাহরণ হিসাবে বলাই যায়। তিনি অনেক নারীর অনুপ্রেরণা। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে রানি জুবাইদার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
নহরে জুবাইদা শুধু একটি জলধারা ছিল না, এটি রানি জুবাইদার প্রজ্ঞা, উদারতা এবং মুসলিমদের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল। বর্তমানে এটি ঐতিহাসিক স্থান হিসাবে পরিচিত। একটি কালজয়ী স্থাপনা, যা ছিল প্রকৌশল ও মানবতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। নহরে জুবাইদার ভগ্নাবশেষ এখনো আরাফাতের ময়দান, মুজদালিফা ও মিনার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নহরটি এখন আর পুরোপুরি সক্রিয় জলধারা না হলেও আমার মতো অনেক পর্যটক ও হাজি ‘নহরে জুবাইদা’ দেখতে মিনা ও আরাফাতের ময়দানে ছুটে যান। নহর দেখার পরে তারা অভিভূত হয়ে যান এবং মহীয়সী রমণী জুবাইদার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে থাকেন।
