Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে মজুরি বুঝিয়ে দিন

Advertisement

তোফায়েল গাজালি

তোফায়েল গাজালি

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে মজুরি বুঝিয়ে দিন

Advertisement

মানবসভ্যতার বিনির্মাণে শ্রম ও শ্রমিকের অবদান অনস্বীকার্য। আজ পৃথিবীর বুকে যা কিছু দৃশ্যমান, সুরম্য অট্টালিকা থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর উৎকর্ষ তার প্রতিটি স্তরে মিশে আছে শ্রমিকের মেধা, নিষ্ঠা আর তপ্ত ঘাম। প্রতিবছর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করা হলেও, আধুনিক বিশ্ব আজও শ্রমিক শ্রেণিকে একটি শোষণমুক্ত ও স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। অথচ আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই ইসলাম শ্রম ও শ্রমিককে কেন্দ্র করে যে বৈপ্লবিক নীতিমালা প্রদান করেছে, তা আজও বিশ্বমানবতার জন্য আলোকবর্তিকা। ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যা শ্রমিককে শুধু ‘উৎপাদনের হাতিয়ার’ হিসাবে নয়, বরং ‘আল্লাহর বন্ধু’ হিসাবে ঘোষণা দিয়ে তাকে সর্বোচ্চ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা প্রদান করেছে।

পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম বৈরাগ্যবাদ বা অলসতাকে কঠোরভাবে ঘৃণা করে। জীবিকা অন্বেষণের প্রচেষ্টাকে ইসলামে ইবাদতপরবর্তী অন্যতম আবশ্যিক কর্তব্য (ফরজ) হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন : ‘অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সূরা জুমা, আয়াত : ১০)। এ আয়াতটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে, আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি পার্থিব শ্রম ও কর্মতৎপরতা মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ছাড়া মানুষের জন্মগত প্রকৃতিই হলো পরিশ্রমী হওয়া। আল্লাহ বলেন : ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা বালাদ, আয়াত : ৪)। অর্থাৎ মানুষের জৈবিক ও সামাজিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান মাধ্যম হলো শ্রম। পবিত্র কুরআনে একজন আদর্শ শ্রমিকের মৌলিক গুণাবলি সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘সর্বোত্তম শ্রমিক সে, যে দৈহিক দিক দিয়ে শক্ত-সামর্থ্য (দক্ষ) ও আমানতদার।’ (সূরা কাসাস, আয়াত : ২৬)।

নবী-রাসূলগণের শ্রমনিষ্ঠ জীবন

শ্রমের মর্যাদার সবচেয়ে বড় দলিল হলো জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ নবী ও রাসূল। তারা কেউ অপরের ওপর বোঝা হয়ে থাকেননি, বরং নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। হজরত আদম (আ.) দুনিয়ার প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন পরিশ্রমী কৃষক। তিনি জমি চাষ ও শস্য উৎপাদনের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করেছেন।হজরত নুহ (আ.) তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রি। তার তৈরি বিশাল নৌকা বা কিশতি আজ ইতিহাসের বিস্ময়। হজরত ইদরিস (আ.) তিনি ছিলেন দর্জি পেশার পথপ্রদর্শক। হজরত মূসা ও শুয়াইব (আ.) তারা দীর্ঘ সময় পশু পালন ও রাখাল হিসাবে কাজ করেছেন। হজরত দাউদ (আ.) তিনি লৌহশ্রমিক হিসাবে বর্ম তৈরি করতেন এবং নিজ হাতের কামাই খেতেন। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন শ্রমের মূর্ত প্রতীক। তিনি শৈশবে মজুরির বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল ও ভেড়া চরাতেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ দুনিয়াতে এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি ছাগল চরাননি।’ (বুখারি)। পরবর্তী সময়ে তিনি একজন সফল ও সৎ ব্যবসায়ী হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। খন্দকের যুদ্ধে নিজ হাতে মাটি কাটা কিংবা নিজের কাজ নিজে করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, কোনো সৎ কাজই তুচ্ছ নয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা

রাসূলুল্লাহ (সা.) শ্রমিকের অধিকার শুধু মৌখিকভাবে ঘোষণা করেননি, বরং তাকে সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি শ্রমিকের কড়াপড়া হাতকে চুম্বন করে বলেছিলেন, এ হাত আল্লাহ ও তার রাসূলের কাছে প্রিয়। তিনি ঘোষণা করেছেন : শ্রমিক হলো আল্লাহর বন্ধু (আল-কাসিবু হাবিবুল্লাহ)।

একবার জনৈক সাহাবি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন ধরনের উপার্জন উত্তম ও শ্রেষ্ঠ?’ নবীজি (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘ব্যক্তির নিজ হাতে কাজ করা এবং সৎ ব্যবসা।’ (সুয়ুতি)। হাদিসে আরও এসেছে, ‘কারও জন্য নিজ হাতের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতের কামাই খেতেন।’ (মিশকাত)। এ শিক্ষাগুলো সমাজের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যবর্তী দেওয়াল ভেঙে দিয়ে শ্রমকে একটি পবিত্র ইবাদতে পরিণত করেছে।

ইসলামের শ্রমনীতি

ইসলাম শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে ‘প্রভু ও দাসের’ সম্পর্কের বিলোপ ঘটিয়ে এক মানবিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বন্ধন তৈরি করেছে। এর প্রধান স্তম্ভগুলো নিম্নরূপ :

পারিশ্রমিক পরিশোধে দ্রুততা

শ্রমিকের ঘামের মূল্য দেওয়াকে ইসলাম সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি পাওয়া তার প্রধান অধিকার। নবীজি (সা.)-এর নির্দেশ : ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ)। বর্তমান বিশ্বে বেতন নিয়ে যে টালবাহানা ও শ্রমিক শোষণ চলে, নবীজির এই একটি বাণী বাস্তবায়ন করলে তার চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব।

মানবিক ব্যবহার ও ভ্রাতৃত্ব

শ্রমিকরা মালিকের কেনা গোলাম নয়, বরং তারা তার ভাই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং যার অধীনে কোনো ভাই থাকে, সে যা খায় তাকে যেন তা-ই খাওয়ায় এবং সে যা পরে তাকে যেন তা-ই পরায়।’ এমনকি অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী সম্পর্কে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (ইবনে মাজাহ)।

সাধ্যাতীত কাজের বোঝা না চাপানো

ইসলামে শ্রমিকের শারীরিক সক্ষমতার দিকে লক্ষ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মালিক যেন শ্রমিকের ওপর এমন কোনো কাজের ভার না দেয়, যা তার জন্য অসহনীয়। যদি কোনো কঠিন কাজ দিতেই হয়, তবে মালিককে নিজেও সেই কাজে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।

আল্লাহর হুঁশিয়ারি

শ্রমিক নিয়োগ করে তাকে দিয়ে পুরো কাজ করিয়ে নেওয়ার পর মজুরি না দেওয়া বা কম দেওয়া এক জঘন্যতম অপরাধ। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেন : ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির মানুষের প্রতিপক্ষ হব। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার থেকে পুরো কাজ আদায় করে নেয় কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না।’ (বুখারি)।

মহানবী (সা.)-এর অসিয়ত

একজন মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো থাকে তার বিদায়বেলার ভাষণে। হজরত উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখনো তিনি উম্মতকে দুটি বিষয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। এক, নামাজ এবং দুই, অধীনস্থদের (শ্রমিকদের) প্রতি সদাচরণ ও তাদের অধিকার। (ইবনে মাজাহ)। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদত (নামাজ) এবং সমাজসেবা (শ্রমিকের অধিকার) সমান্তরালভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমিক ও মালিকের মাঝে ন্যায়বিচার

আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বে শ্রমিকের শোষণ একটি বৈশ্বিক সংকট। মালিক পক্ষ অধিক মুনাফার নেশায় শ্রমিকের রক্ত চুষে নেয়, অন্যদিকে শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার আদায়ে অনেক সময় সহিংসতায় লিপ্ত হয়। ইসলাম এখানে ভারসাম্যের পথ দেখিয়েছে। মালিককে বলেছে পারিশ্রমিক দিতে কার্পণ্য না করতে, আর শ্রমিককে বলেছে কাজে ফাঁকি না দিতে এবং ‘আমানতদার’ হতে। মালিক যখন শ্রমিককে নিজের ভাইয়ের মর্যাদা দেবে, তখন শ্রমিকও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিষ্ঠানের উন্নতিতে কাজ করবে। এর ফলে সবার জীবনে শৃঙ্খলা ও বরকত আসবে।

পরিশেষে বলা যায়, একমাত্র ইসলাম ধর্মই শ্রম এবং শ্রমিকের যথাযথ অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে যথার্থ মূল্যায়ন করেছে। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস শুধু এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে, কিন্তু ইসলাম শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় প্রতিদিনের দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। নবী-রাসূলগণের সুন্নাহ অনুসরণ করে শ্রমকে সম্মান করা এবং কুরআনের নির্দেশানুযায়ী শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। শ্রমিকের ঘাম এবং মালিকের ইনসাফ, এ দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং সমৃদ্ধ পৃথিবী। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলেই নিহিত আছে পৃথিবীর সব শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি ও স্থায়ী অধিকারের গ্যারান্টি।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

টিস্যু ছাড়াই শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করলে পবিত্রতা অর্জন হবে কি?

টিস্যু ছাড়াই শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করলে পবিত্রতা অর্জন হবে কি?

ইসলাম প্রচারক আল্লামা ফয়েজ উদ্দিন আহম্মেদ (রহ.)

ইসলাম প্রচারক আল্লামা ফয়েজ উদ্দিন আহম্মেদ (রহ.)

কবরের প্রশ্ন ও আজাব থেকে কারা মুক্ত থাকবেন?

কবরের প্রশ্ন ও আজাব থেকে কারা মুক্ত থাকবেন?

আপন ভাইয়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও কথা বন্ধ, দোয়া কি কবুল হবে?

আপন ভাইয়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও কথা বন্ধ, দোয়া কি কবুল হবে?

দুঃখে সবর ও সুখে শোকর নিয়ে যা বললেন কাবা শরিফের ইমাম

দুঃখে সবর ও সুখে শোকর নিয়ে যা বললেন কাবা শরিফের ইমাম

ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে আপত্তিকর ছবি চোখে পড়লে কি ওজু ভেঙে যাবে?

ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে আপত্তিকর ছবি চোখে পড়লে কি ওজু ভেঙে যাবে?

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকারে- মুফতি এনায়েতুল্লাহ স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও কওমি সনদ কর্মবাজারে উপেক্ষিত

স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও কওমি সনদ কর্মবাজারে উপেক্ষিত

মমতার পরশে জেগে উঠুক আত্মশুদ্ধির বোধ

মমতার পরশে জেগে উঠুক আত্মশুদ্ধির বোধ

ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার পথিকৃৎ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)

ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার পথিকৃৎ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)

বিলালের আজানের স্মৃতি : নজরুলের আত্মজাগরণের সুর

বিলালের আজানের স্মৃতি : নজরুলের আত্মজাগরণের সুর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম