বেগম জিয়ার মৃত্যু : স্বাভাবিক, নাকি স্লো পয়জনিং করে
Advertisement
মোবায়েদুর রহমান
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এ লেখাটি লিখতে বসলাম বুধবার বিকাল পৌনে ৫টায়। তার পৌনে ২ ঘণ্টা আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজা সমাপ্ত হলো। এ জানাজা নিয়ে আর কী লিখব? লেখার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। অতীতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় জানাজা দেখেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার। তখনকার মতো সেটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম জানাজা। এরপর দেখলাম শহীদ ওসমান হাদির জানাজা। এ জানাজা শহীদ জিয়ার জানাজার চেয়েও বড় ছিল। সম্ভবত কারণ হতে পারে, শহীদ জিয়ার শাহাদতের ৪৪ বছর পর শহীদ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ ৪৪ বছরে ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়।
কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। এ যেন এক মহাসমুদ্র। কোনো কূল নেই, কোনো কিনার নেই। নেই কোনো পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ। এতে যে কত মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, সেটি হিসাব করে বা গণনা করে বের করা কঠিন। কারণ দক্ষিণে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোড পর্যন্ত, উত্তরে শ্যামলী পর্যন্ত, পূবদিকে কাওরান বাজার পর্যন্ত মানুষ আর মানুষ। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই মানুষ। এক সহযোগী দৈনিক শিরোনাম দিয়েছেন, ‘এক কোটি মানুষ’। আমি লক্ষ-কোটি কিছুই বলব না। কারণ, এক কথায় বলা যায়, মানুষের সংখ্যা বেশুমার। যিনি যত লক্ষ বা কোটি ধারণা করেছেন, তার সেই ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না। কারণ একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলের ভাষ্যকাররাই তো বললেন, সমুদ্র উত্তাল জনতা। এ গোনার নেই কোনো শেষ। তারা এ-ও বললেন, এ শৈত্যপ্রবাহে, প্রচণ্ড কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও তাদের মতে উত্তরে তেঁতুলিয়া আর দক্ষিণে সাজেক পর্যন্ত সব জায়গা থেকেই মানুষ এসেছিলেন। তেঁতুলিয়া আর সাজেক তার কল্পনা। কারণ তিনিও ভাবতে পারেননি, এত মানুষ কোত্থেকে এলো?
আমরা আর নতুন করে কিছু বলব না। যুগান্তরের প্রিয় পাঠক ভাইয়েরা, আপনারাই এখন বুঝে নিন, একজন মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কত গভীর এবং সব শ্রেণির মধ্যে সেটি প্রোথিত না থাকলে লক্ষ বা কোটি মানুষ মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানাজায় শামিল হতে পারে না। আর কী কী এবং কত ধরনের গুণ থাকলে একজন মানুষ হাজার নয়, লক্ষ নয়, কোটি মানুষের অন্তরে স্থান করে নিতে পারেন। অথচ সেই মানুষটি, অর্থাৎ বেগম খালেদা জিয়া গত ৬ বছর হলো, ক্ষমতা তো দূরের কথা, রাজনীতির দৃশ্যপটেই নেই।
শেখ মুজিব মানুষ খেপিয়ে রাজনীতি করতেন। তিনি অনলবর্ষী বাগ্মী ছিলেন। কিন্তু তার সেই আগুনঝরা বক্তৃতাই ছিল তীব্র বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগুনের হলকায় ভরা। কিন্তু বেগম জিয়া তার ৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে শত্রু-মিত্র কারও বিরুদ্ধে কোনো রকম উসকানিমূলক অথবা ঘৃণাসূচক বক্তব্য দেননি। যে শেখ হাসিনা দেশনেত্রীর মতো একজন সফিস্টিকেটেড মহিলা ও নেত্রীকে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি মামলায় প্রথমে ৫ বছর এবং পরে ১০ বছর কারাদণ্ড বাড়িয়ে দেন, তার বিরুদ্ধেও বেগম জিয়া কোনো প্রতিশোধমূলক বক্তব্য দেননি। এমনকি ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের অবসানের পর ৬ আগস্ট যখন বেগম জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়, তখন মুক্তির পর ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির জনসভায় অনলাইনে বক্তৃতা দিতে গিয়েও তার চরম শত্রু শেখ হাসিনার নাম ধরে তিনি কোনো কথা বলেননি। নাম না ধরেও তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক কোনো বক্তব্যও দেননি। বরং উলটো তিনি বলেছেন, এখন আর কোনো প্রতিশোধ নয়, এখন আসুন আমরা শান্তি কায়েম করি এবং শান্তিপূর্ণ একটি দেশ গড়ে তুলি।
যাকে কারাগারে স্লো পয়জনিং করা হয়েছে বলে বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, সেই নেত্রী যদি সেদিন কারও দিকে অঙ্গুলি তুলতেন, তাহলে তার জনতার পদতলে পিষ্ট হওয়ার কথা; কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছেন চরম উত্তেজিত লক্ষ লক্ষ জনতাকে। অথচ তার হৃদয়ের শোক এবং কান্না যে কত গভীর, সেটি বোঝা যায় তার একটি উক্তিতে। উদ্গত কান্নায় তিনি বিলাপ করেছেন, ‘আমি কম বয়সে স্বামী (জিয়াউর রহমান) হারিয়েছি। কারাগারে থাকতে আমি আমার মাকে (তৈয়বা মজুমদার বেগম) হারিয়েছি। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আমি একটি সন্তান (আরাফাত রহমান) হারিয়েছি। আরেকটি সন্তান (তারেক রহমান) নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দূরদেশে এখনো চিকিৎসাধীন। আমার এ স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন।’
২.
৩০ ডিসেম্বর এক শীতার্ত সকালে ৬টার সময় আল্লাহ তাকে এ পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে এ কলাম লেখার সময় পর্যন্ত ৩০ ঘণ্টায় বাংলাদেশের সব দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও ইত্যাদি গণমাধ্যমে মরহুমা দেশনেত্রী সম্পর্কে অসংখ্য খবর, ভাষ্য, কলাম এবং বিদগ্ধজনদের মন্তব্য প্রকাশিত ও সম্প্রচারিত হয়েছে। তার চরিত্রের এমন কোনো গুণবাচক দিক নেই, যা কেউ না কেউ বলেননি। তিনি আপসহীন, তিনি সদাচারী, তিনি মৃদুভাষিণী, তিনি শালীন, তিনি মার্জিত ইত্যাদি বহুমুখী গুণবাচক বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে এবং লেখা হয়েছে। আমি তার চরিত্রের গুণবাচক যে বিষয়টিই এখন বলব, সেটিই হয়ে যাবে রিপিটেশন।
তবে লক্ষ করেছি, একটি বিষয় অন্তত তার মৃত্যুর পর কেউ বলেননি। মৃত্যুর আগে যখন তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন, যখন তিনি ছিলেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন খোদ বিএনপিরই একাধিক নেতা গুরুতর অভিযোগ করেছেন, তাকে স্লো পয়জনিং করে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়েই আজ আমার লেখায় ফোকাস পাবে।
অন্য সব পয়েন্ট বাদ দিয়েও একটি বিষয় সবার মনেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেটি হলো, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে যখন কারাগারে নেওয়া হয়, তখন তিনি শারীরিকভাবে ছিলেন সম্পূর্ণ সক্ষম এবং সুস্থ। তার কারাদণ্ডের রায় শোনার পর থেকেই বিএনপির সর্ব শ্রেণির নেতাকর্মী এবং জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। এ পুঞ্জীভূত আগুনের যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণ না হয়, তার জন্য বেগম জিয়া কারাগারে প্রবেশের আগেই নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, আমার কারারুদ্ধ হওয়াকে কেন্দ্র করে কেউ যেন কোনো অশান্তি বা হানাহানি সৃষ্টি না করে। তাই দেখা যায়, বেগম জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার জন্য যখন প্রিজন ভ্যান আসে, তখন তাকে এসকর্ট করার জন্য অন্তত ৬ হাজার ব্যক্তি ৬ হাজার মোটরসাইকেলে স্টার্ট দেওয়া অবস্থায় উপবিষ্ট ছিলেন।
যখন দেশনেত্রী নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত স্যাঁতসেঁতে কক্ষটির উদ্দেশে রওয়ানা হন, তখন ওই ৬ হাজার মোটরসাইকেল আরোহী তাকে পাহারা দিয়ে নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত জেলখানার প্রধান ফটক পর্যন্ত দিয়ে আসেন। অথচ, এসব টগবগে তরুণ এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ শেখ হাসিনার এ স্বেচ্ছাচারী কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে দেশে, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে একটি তুলকালাম বাধানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু নেত্রীর ছিল কঠোর নির্দেশ। কোনোরকম অশান্তি সৃষ্টি করা যাবে না। তার নেতাকর্মী এবং জনগণ নেত্রীর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন।
৩.
সেই সবল ও সুস্থ মানুষটি কিছুদিনের মধ্যেই কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন কেন? আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর মির্জা ফখরুল প্রথমবারের মতো ‘স্লো পয়জনিং’ নিয়ে কথা বলেন। সে সময় তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে স্লো পয়জন দেওয়া হয়েছিল কিনা। সেখানে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার বয়স ৭৫ বছরের বেশি। তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, সেই চক্রান্তের অংশ হিসাবে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে দুই বছরের বেশি সময় আটক রাখা হয়েছিল। স্যাঁতসেঁতে কারাগারের কক্ষে ইঁদুর ঘোরাঘুরি করত। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এখন অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, সেই সময়ে খালেদা জিয়াকে কোনো স্লো পয়জনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল কিনা, আমরা পরিষ্কার করে জানতে চাই। ওদের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। ডাক্তাররা বলছেন, আমাদের সব বিদ্যা, জ্ঞান শেষ; আমরা এখানে আর কিছু করতে পারব না।
এরপর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পলায়নের পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ধামরাইয়ে বিএনপির সমাবেশে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ওই কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপরে তার শরীর খুব খারাপ হয়ে যায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের অভিযোগটি আরও গুরুতর এবং গভীর চিন্তার দাবি রাখে। এই তো মাত্র ৩০ দিন আগে গত ২৯ নভেম্বর মির্জা আব্বাস বলেন, বেগম জিয়াকে স্লো পয়জনিং করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ভারতীয় এক সাংবাদিক ঢাকায় এসেছিলেন। যখন আমার সঙ্গে দেখা হয়, তখন তিনি বলেন, আমরা কী নিয়ে লাফালাফি করছি, উনি (খালেদা) তো বাঁচবেন না দুই বছরও। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, ওভাবেই ডিজাইন করা আছে। অর্থাৎ এমন করে ডিজাইন করা হয়েছে, উনি ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করবেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন সিনিয়র ডাক্তারের কাছে শুনেছি, বেশি করে বিষপান করলে তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়। কিন্তু একজন ব্যক্তিকে কত দিন পরে হত্যা করা হবে, সেই সময়সীমা নির্ধারণ করে তাকে মৃত্যুর নির্ধারিত দিনের কিছু আগেই হিসাব করে ডোজ দিলে, সেই ব্যক্তির ধীরে ধীরে নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু হয়। মির্জা আব্বাস আরও বলেন, খালেদা জিয়ার আজকের অসুস্থতা স্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে এমন অসুস্থ হয়েছেন। বিগত সরকারের সময় কারাগারে থাকা অবস্থায় আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়াকে স্লো পয়জনিং করা হয়েছিল। আমি দায়িত্ব নিয়ে একথা বলছি।
গত ৪ ডিসেম্বর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকনও একই দাবি করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সুস্থ অবস্থায় কারাগারে গিয়েছিলেন। সেখানে রেখে তাকে স্লো পয়জনিং করে ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।
স্লো পয়জনিং অর্থাৎ ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ করে দেশনেত্রী বেগম জিয়াকে হত্যার অভিযোগ বিএনপির তিনজন অত্যন্ত সিনিয়র নেতার। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এসব অভিযোগকে না সরকার, না সংগঠন হিসাবে বিএনপি কোনো আমলে নেয়নি। নিলেও মানুষ সেটা জানতে পারেনি।
মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক
