Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রাজধানী ঢাকা এবং এর নাগরিক সুবিধা

Advertisement

Icon

নির্মল চক্রবর্তী

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী ঢাকা এবং এর নাগরিক সুবিধা

Advertisement

কান টানলে যেমন মাথা আসে তেমনি রাজধানী ঢাকার প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলেই ঢাকায় অবস্থানরত নাগরিকদের সুবিধা-অসুবিধার কথাটিও এসে যায়। আর তখনই প্রশ্ন হয়ে সামনে দাঁড়ায় নাগরিকদের সুখ-দুঃখ নিয়ে সরকার কিছু ভাবছেন কিনা, ভাবলেও তা কতটা? ১০৪ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে ঢাকার অবস্থান। অথচ ছোট্ট এই পরিসরে দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। আর প্রতিদিন সংখ্যাটি যেমন বাড়ছে, তেমনি ঢাকা সিটির আয়তনও বাড়ছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সুবিধাসংশ্লিষ্ট চাহিদাও বাড়ছে।

চলতি সংসদ অধিবেশনে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে দেশের সব অংশে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের সব সুযোগ-সুবিধা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে। এজন্য সারা দেশ থেকে মানুষ ঢাকামুখী। এর বিকেন্দ্রীকরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় উন্নত চিকিৎসাসেবা ও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। রাজধানীকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি হিসাবে গড়ে তুলতে দুই সিটি করপোরেশন নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান সংসদ নেতা। বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার ও সব বর্জ্যকে জিরো বর্জ্যে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটিতে আগামী ৫ বছরে ৫ লাখ বৃক্ষরোপণ করা হবে। মেট্রোরেলের নিচের খালি অংশে মিরপুর ১২ থেকে ডিওএইচএস পর্যন্ত এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আব্দুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত নিচের অংশে খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে আমরা আশাবাদী হব এটাই স্বাভাবিক। তারপরও কথা থাকে, দৃশ্যমান না হওয়া অবধি আমরা অনেক কিছুই তেমন করে গ্রহণ করতে পারি না। ‘যাহা দেখি না নিজ নয়নে বিশ্বাস করি না’ আমাদের নাগরিকদের মনোভাবটাই এমন। সেখানে দৃশ্যমান পদক্ষেপই বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গাত্মক একটি স্ট্যাটাস পড়েছিলাম। যার শিরোনাম ছিল-‘যে ১০টি সুবিধা ঢাকা বাদে পৃথিবীর আর কোনো শহরে পাবেন না।’ বলা হয়,

পৃথিবীর সব শহরই নাগরিকদের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দেয়। নাগরিক সুবিধার ধরন বিবেচনা করেই উন্নত, উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত শহর নির্ধারণও করা হয়। তবে আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা আমাদের এমন সুযোগ সুবিধা যে, যেগুলো পৃথিবীর সো কল্ড উন্নত শহরগুলো চাইলেও দিতে পারবে না। এমন ১০টি সুবিধার কথাও এ স্ট্যাটাসটিতে তুলে ধরা হয়। ১. পৃথিবীর বুকে ঢাকাই একমাত্র শহর, যেখানে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ২ ঘণ্টা বাস জার্নি করা যায়। ২. হাঁটতে হাঁটতে খোলা ম্যানহোলে পড়ে গেলে একদম ফ্রিতে স্কু বা ডাইভিংয়ের সুযোগ পাচ্ছেন শুধুই ঢাকাতে। ৩. ফুটপাত তো ফুটপাতই। আস্ত রাস্তা দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ এই শহর ছাড়া আর কেউ দেবে না আপনাকে। ৪. পৃথিবীর আর কোনো ওয়াসা একইসঙ্গে আপনার পানি, শরবত আর আমিষের চাহিদা মেটাবে না। তাও শুধু পানির টাকায়। ৫. পৃথিবীর আর কোনো শহরের ট্রাফিক পুলিশকে আপনি দুয়েকশ টাকা দিয়ে কনভিন্স করতে পারবেন না। ৬. তাড়া থাকলে কিংবা তাড়া না থাকলেও পৃথিবীর কোথাও কি আপনাকে উলটো পথে গাড়ি চালাতে দেবে? কিন্তু ঢাকা দেবে। ৭. শুধু কি মানুষ? ঢাকা সুবিধা দেয় মশাদেরও। মশাদের এমন অভয়ারণ্য আর কোন শহরে আছে বলুন। ৮. ৫ তলার পারমিশন নিয়ে ১০ তলা বিল্ডিং তোলার সুযোগ দেবে একমাত্র ঢাকা শহর। ৯. গন্তব্য আসার এক কিলোমিটার আগে নেমে ব্যায়াম করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা একমাত্র ঢাকা শহরেই পাবেন। ১০. ঢাকা আপনাকে দেবে ফ্রিতে কিডনি রোগের ঝুঁকি থেকে মুক্তি। যখন তখন যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে জিপার খুলতে আর কোনো শহরে পারবেন না কিন্তু। স্ট্যাটাসটিতে যে ১০টি পয়েন্ট তুলে ধরা হয়েছে, আসলে এগুলোই হচ্ছে ঢাকার অতিগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যা এ শহরের নাগরিকদের জন্য দুঃখের কারণ হয়ে রয়েছে। এসবের অবসান জরুরি।

ঢাকা শহরের নাগরিক সুবিধা বলতে মূলত মেগাসিটির বাসিন্দাদের জন্য উপলব্ধ সেবা, অবকাঠামো এবং সুযোগকে বোঝায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে এ সুবিধাগুলো কখনোই নাগরিকরা ভোগ করতে পারছেন না। শহরের নাগরিক জীবনের জন্য যে সেবাগুলো অপরিহার্য তার মধ্যে রয়েছে-পরিবহণ ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা সুবিধা, ইউটিলিটি সেবা (পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস), পার্ক ও উদ্যান ব্যবস্থাপনা। রমনা পার্ক, জিয়া উদ্যান, এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো উন্মুক্ত সবুজ জায়গাসহ সিটি করপোরেশনে ছোট পার্কগুলো বেড়ানোর জন্য কতটা যথার্থ। ভোরের ঢাকা নাগরিকদের প্রাতঃভ্রমণ বা চলাচলে এখনো কতটা নিরাপদ।

ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর হিসাবে পরিচিত। জাতিসংঘ জনসংখ্যাবিষয়ক সংস্থা ইউএনপিপির তথ্যমতে, ঢাকায় ২ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ বসবাস করেন, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষকে কাজের জন্য ঘরের বাইরে যেতে হয়। যারা মূলত চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শপিং কিংবা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হন। যানজটের কারণে অধিকাংশ মানুষকে বেশির ভাগ সময় রাস্তায় বা গাড়িতে থাকতে হয়। আবার ঢাকা শহরে আসা বা পথচারীদের নানা সমস্যার সঙ্গে একটি কমন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তা হলো-পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের সুযোগের অভাব। নগর জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অভাব শহরবাসীর বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য মারাত্মক ভোগান্তির কারণ। ইউএনপিপির তথ্যমতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে পাবলিক টয়লেট আছে মাত্র ১৬৭টি। অর্থাৎ নগরীতে চলাচল করেন এমন প্রায় সোয়া লাখ মানুষের জন্য পাবলিক টয়লেট আছে একটি। এই শহরে পাবলিক টয়লেট না থাকায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েন নারীরা। অনেক পাবলিক টয়লেট অপরিচ্ছন্ন, নষ্ট ও অনিরাপদ হওয়ার করণে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে উন্নত দেশগুলোর মতো প্রতিটি শহরের পার্ক, শপিংমল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, রেলওয়ে, বাসস্ট্যান্ড বা মেট্রো স্টেশনে পরিচ্ছন্ন ও মানসম্মত টয়লেট দরকার। অবশ্যই এটি নাগরিকদের অধিকার।

একটি পরিকল্পিত শহরের ৬০ শতাংশ জায়গায় সড়ক, জলাশয়, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়। আর ৪০ শতাংশ জায়গায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ নগরবাসীর প্রয়োজনের আলোকে অবকাঠামো গড়ে ওঠে। ৪০০ বছরের পুরোনো শহর ঢাকায় সড়ক, জলাশয়, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান আছে কি? পরিকল্পিত শহরের প্রতি একরে সর্বোচ্চ ১২০ জন বসবাস করে থাকেন। আর ঢাকায় বর্তমানে প্রতি একরে বসবাস করছেন গড়ে ২৫০ জন। অর্থাৎ ঢাকা অবকাঠামোর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চাপ নিয়ে চলছে। ঢাকার উন্মুক্ত জায়গা বাড়ানো তো দূরের কথা যেগুলো আছে সেগুলোও টিকিয়ে রাখতে পারছে না সরকার। বড় শহর গৌরবের বিষয় নয়, গৌরবের বিষয় হলো শহরগুলোকে ম্যানেজ করতে পারা। ঢাকাকে হেলাফেলা করে যেখানে নিয়ে আসা হয়েছে, এখনি এর লাগাম টেনে ধরা জরুরি। না হয় ভবিষ্যতে এই ঢাকা আরও মহা দুর্ভোগের হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে ঢাকায় জলাভূমি ও উন্মুক্ত জায়গার পরিমাণ কমেছে ১৩৪ বর্গকিলোমিটার। আর এসময় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কংক্রিট। ইতোমধ্যে ঢাকার দুই সিটি এলাকার প্রায় ৮২ ভাগ কংক্রিট-আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছে। এখনি পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে না পারলে আগামীর ঢাকার জন্য আরও দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

আমরা যারা এ শহরে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছি, তারা শহরের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা প্রত্যক্ষ করছি। বায়ুদূষণেও আমরা সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছি। যানজট, বৃষ্টি এলেই জলাবদ্ধতা আমাদের শহুরে জীবনকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। শব্দদূষণের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ শহরের একটি ঢাকা। পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত সিটি করপোরেশনের লোকজনও এ শহরের বর্জ্য স্তূপ অনেক জনবহুল দুর্গন্ধযুক্ত করে রেখেছে। কেউ কারও কথা শুনছে না। প্রশাসনকেও এরা তোয়াক্কা করছে না, সেখানে নাগরিকরা তো কিছুই না। পরিকল্পিত ঢাকা চাই আমাদের। চাই সবুজে ভরা উন্মুক্ত নিশ্বাস ফেলার স্থান। আমরা প্রাণভরে নির্ভেজাল শ্বাস নিতে চাই। মনে রাখা দরকার বাসযোগ্য শহরের ক্ষেত্রে উন্নত গণপরিবহণ অপরিহার্য। আমরা বাসযোগ্য ঢাকা চাই। অপরিকল্পিত নগরায়ণে সৃষ্ট বিপদ থেকে আমরা মুক্তি চাই।

নির্মল চক্রবর্তী : কবি ও সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ঢাকার ২০ জোনে গঠিত হচ্ছে বিশেষ তদারকি কমিটি

ঢাকার ২০ জোনে গঠিত হচ্ছে বিশেষ তদারকি কমিটি

নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে ৫ শিশু আহত, আইসিইউতে ভর্তি এক

নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে ৫ শিশু আহত, আইসিইউতে ভর্তি এক

ঢাকা-কক্সবাজার রুট: মহানগর এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রি শুরু আজ

ঢাকা-কক্সবাজার রুট: মহানগর এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রি শুরু আজ

স্বর্ণের চেইন ছিনতাইয়ে বাধা, বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা

স্বর্ণের চেইন ছিনতাইয়ে বাধা, বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা

ঢাকার ফুটপাতে বয়স্ককে মারধর-কান ধরে ওঠবস, প্রকৃত ঘটনা কী?

ঢাকার ফুটপাতে বয়স্ককে মারধর-কান ধরে ওঠবস, প্রকৃত ঘটনা কী?

স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গ্রেফতার, ছাড়াতে গেলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা!

স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গ্রেফতার, ছাড়াতে গেলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা!

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম