Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দ্বিতীয় কিস্তি

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

Advertisement

Icon

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সংগৃহীত ছবি

Advertisement

ওয়ান-ইলেভেন কীভাবে এলো, তাও আমরা দেখিয়েছি। সেখানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বইয়ের একটা রেফারেন্স ছিল। প্রণব মুখার্জি তার বইয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ভারতে গিয়ে তার কাছে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছিলেন-নির্বাচনের পরে তার কী হবে। প্রণব মুখার্জি তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে তার নিরাপত্তার বিষয়টি তিনি দেখবেন।

কিন্তু ৫ আগস্ট জাদুঘর উদ্বোধনের পর দেখলাম, ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ সেকশন থেকে প্রণব মুখার্জির বইয়ের এ রেফারেন্সটা বাদ পড়েছে। কেন তা আমি জানি না। আমার কাছে এটা আরও বিস্ময়কর, কারণ এ রেফারেন্স তো বিএনপি সরকারের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপিই তো ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী নির্বাচনের ভিকটিম। একই রেফারেন্স আমরা ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’-এর ষোলো বছরের নির্বাচনবিষয়ক অংশেও রেখেছিলাম। সেখানে প্রণব মুখার্জির বইয়ের রেফারেন্সের পাশাপাশি আমরা দেখিয়েছিলাম, ২০০৮-এর নির্বাচনে কীভাবে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় ৮৫ ভাগ ভোট পড়েছিল। এখন দেখছি, দুই জায়গা থেকেই প্রণব মুখার্জির বইয়ের রেফারেন্সটা আর নাই।

লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসির পরেই ফাঁকা মাঠে মেমোরিয়াল করা উচিত-এটা প্রথম দিন বিধ্বস্ত গণভবন ভিজিটের পরেই আমি টিমের সঙ্গে শেয়ার করি। মেমোরিয়ালটা কীরকম হবে, এটা নিয়ে আমরা অনেক ভেবেছি। একদিন মিটিংয়ে বললাম, এ বাড়িতে বসেই একজন ফ্যাসিস্ট ষোলো বছর দেশ চালিয়েছে, অসংখ্য মানুষকে গুম-খুনের হুকুম দিয়েছে। একদিন জনগণের আন্দোলনের মুখে সে পালিয়ে গেছে, জনতা তার বাড়ির দখল নিয়েছে। গণভবন সত্যিকার অর্থে জনতার ভবন হয়ে গেছে। তো যাদের সে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, তারাই যদি এসে তার বাড়ির দখল বুঝে নেয়?

আমি প্রস্তাব করলাম, এই বিশাল মাঠে সারি সারি কবরের আদলে মেমোরিয়াল হোক। চারপাশে লেখা থাকবে সেই মানুষগুলোর নাম। বাড়ির সামনে হাজার হাজার কবর দেখলে আর কাউকে এই বাড়ির ইতিহাস বুঝিয়ে বলতে হবে না। প্রথমে আইডিয়াটা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর লেগেছিল। টিমের মধ্যে একমাত্র তানজিম ওয়াহাব প্রথম থেকেই এটার পক্ষে ছিল। বাকিরা একটু দ্বিধায় পড়েছিল। ধীরে ধীরে অবশ্য সবাই একমত হয়। ষোলো বছরে গুম-খুনের শিকার এবং জুলাইয়ের শহীদ মিলিয়ে আমরা প্রায় ৪,২০০ মানুষের নাম পাই। তালিকা তৈরিতে সহযোগিতা করেছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’। মেরিনা তাবাসসুম আপা সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করে ভাবনাটাকে স্থাপত্যে রূপ দিলেন। চিফ অ্যাডভাইজার প্রফেসর ইউনূসকে ডিজাইন এবং এর পেছনের ভাবনাটা দেখানোর পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘প্লিজ গো অ্যাহেড।’ আজ সেখানে শত শত ভিজিটরকে কবরগুলোর পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হয়, এ মেমোরিয়াল নিয়ে আমাদের দীর্ঘ চিন্তা, তর্ক আর লড়াইটা কাজে লেগেছে। সবশেষে ধন্যবাদ মালিহা নামলাহকে-মেমোরিয়ালের জন্য তার লেখা দুই লাইনের কবিতা আমাদের মূল ভাবনাটাকে রূপ দিয়েছে।

‘দেশপ্রেমীদের রক্ত খেয়ে বাঁচত যাহার সিংহাসন

সব শহীদের দখলে আজ সেই খুনিটার আবাসন’!

এ কবিতার এডিটিংয়ে সহায়তার জন্য ধন্যবাদ হাসান রোবায়েতকে।

মেমোরিয়ালের চারপাশে স্কাল্পচার গার্ডেন : মেমোরিয়ালটা আসলে একটা বিশাল প্লাজার মতো। এখন এ প্লাজার চারপাশে অনেক স্কাল্পচার আছে। অনেকটা স্কাল্পচার গার্ডেনের মতো হয়ে গেছে। জুলাইয়ের বেশ কিছু আইকনিক মোমেন্টকে আমরা স্কাল্পচারে ধরেছি। এর সঙ্গে বিডিআর হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিও একটা স্কাল্পচারে এসেছে। মজার ব্যাপার হলো, এ স্কাল্পচারগুলো শুরুতে এখানে রাখার কথাই ছিল না। স্কাল্পচারের কাজ যখন শুরু করি, আমি তানজিমকে বললাম, যসের (তেজস হালদার যস) স্কাল্পচার আমার খুব ভালো লাগে, আপনার তো ওর সঙ্গে আলাপ আছে, ওকে ডাকেন। যসকে ডেকে জুলাইয়ের অনেক আইকনিক ইমেজগুলো দিলাম। বললাম, এগুলোকে স্কাল্পচারে রূপ দাও। যস একটা রাফ ডিজাইন তৈরি করল। তারপর আমি, তানজিম আর যস একসঙ্গে বসলাম। কোথাও বললাম-আরেকটু চেঞ্জ করো, কোথাও আরেকটু শার্প করো। এভাবে একসময় স্কাল্পচারগুলো রেডি হয়ে মিউজিয়ামে চলে এলো; কিন্তু তখনো আমরা ঠিক করিনি এগুলো কোথায় থাকবে। তানজিম আর্কিটেক্টদের সঙ্গে ভাবছিল, কোথায় কোনটা রাখা যায়। সেই চিন্তাভাবনা চলছিল। আপাতত স্কাল্পচারগুলো এনে মেমোরিয়ালের এক পাশে ডাম্প করে রাখার মতো করে রাখা হলো।

আমি প্রতিদিন মিউজিয়ামে যাই, আসি। প্রতিদিন ওই স্কাল্পচারগুলো দেখি, আবার মেমোরিয়ালটা দেখি। দেখতে দেখতে একটা সময় আমি স্কাল্পচারগুলোর সঙ্গে মেমোরিয়ালের একটা সম্পর্ক দেখতে শুরু করলাম। হঠাৎ মনে হলো-আরে, এগুলো তো অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। এগুলো এ মেমোরিয়ালেরই অংশ। প্লাজার চারপাশে একটা বৃত্তের মতো করে এগুলো থাকা উচিত। আমি কথাটা বলামাত্র তানজিমের খুব পছন্দ হলো। কিন্তু আর্কিটেক্ট সালাহউদ্দিন সাহেব একটু কনফিউজড হয়ে গেলেন। বললেন, না, আমরা তো এখানে এগুলো ভাবিনি। এখানে যাবে না।

আমি হেসে বললাম, না, এখানেই যাবে। আমি জেনেই বলছি। ডোন্ট ওরি অ্যাবাউট ইট। কোনটা কোথায় যাবে, ঠিক করে দিচ্ছি। তারপর একদিন আমি, তানজিমসহ টিমের সবাই দাঁড়াল! যসও তার শ্রমিকদের নিয়ে এলো। একটা একটা করে স্কাল্পচার সরিয়ে জায়গা মেপে প্লেস করতে শুরু করলাম। একটা স্কাল্পচার এক জায়গায় রাখার পর সেটাকে তিনশ ষাট ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেখছি-কোন অ্যাঙ্গেল থেকে কেমন দেখায়, মেমোরিয়ালের সঙ্গে তার সম্পর্কটা কী দাঁড়ায়। আবার সরাচ্ছি, আবার দেখছি।

সারা দিন ধরে এ কাজ করে আমরা একসময় সব স্কাল্পচার প্লেস করলাম। এখন আমার মনে হয়, মেমোরিয়াল এবং এ স্কাল্পচারগুলো একসঙ্গে মিলে একটা অসম্ভব পাওয়ারফুল আর্ট ইনস্টলেশন হয়ে উঠেছে। এবং এর জন্য যস একটা বিরাট ক্রেডিট পাবে। কারণ ওর স্কাল্পচারগুলো এত পাওয়ারফুল যে সেগুলোর সামনে দাঁড়ালে জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো যেন আবার ফিরে আসে।

আনাসের চিঠি : মেমোরিয়াল আর স্কাল্পচার গার্ডেন পার হয়ে আমরা জুলাইয়ের মেইন সেকশনের দিকে যাই। আমরা জুলাইয়ের পুরো ঘটনা থেকে একটা সিঙ্গুলার অবজেক্ট নিতে চাইলাম। কী হতে পারে? জুলাই অনির্বাণ নামে ডকুমেন্টারি বানাতে গিয়ে আনাসের মায়ের কণ্ঠে ওই চিঠিটা শোনার পর থেকেই আমার বুক এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়। তখন থেকেই এ চিঠিটা আমার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে ভারী চিঠি। তখন মিটিংয়ে এটার প্রসঙ্গ তুলতে আমরা সবাই একমত হলাম। প্রথম অবজেক্ট হোক আনাসের চিঠি। এই একটা চিঠিই জুলাই আন্দোলনের গভীরতা, ব্যাপকতা এবং ইমোশনাল ডেপথ বলে দেয়। ফলে আনাসের চিঠিকেই আমরা মেইন মিউজিয়ামে ঢোকার আগে প্রথম সিঙ্গুলার অবজেক্ট হিসাবে রাখলাম।

জুলাই উইমেন : একটু সামনে গেলেই দ্বিতীয় সেকশন-‘জুলাই উইমেন’। কারণ নারীরা শুধু ১৪ জুলাইয়ের রাতে না, গোটা জুলাই আন্দোলনেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলন যখন থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, নারীরা বারবার সেটাকে জাগিয়ে তুলেছেন। নুসরাত, তামান্না, শহীদ রাব্বির দুই বোন, উত্তরায় শশী, উমামা ফাতেমা, সংগীতশিল্পী শায়ান-এবং আরও অসংখ্য নারী মাঠে, রাস্তায়, আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। এই মুহূর্তে সবার নাম হয়তো আমার মনে আসছে না; কিন্তু আমার কাছে বিষয়টা খুব পরিষ্কার ছিল-জুলাইকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা শুধু অংশগ্রহণই করেননি, নেতৃত্বও দিয়েছেন। ফলে মূল ভবনে ঢোকার আগেই তাদের জন্য আলাদা একটা সেকশন রাখলাম আমরা।

মিউজিয়ামে কোন রুমে কী দেখাব? মেমোরিয়াল, আনাসের চিঠি, জুলাই উইমেন-এই বেসিক জার্নিটা যখন আমাদের দাঁড়িয়ে গেল, তখন সামনে বড় প্রশ্ন-মেইন বিল্ডিংয়ে কোন রুমে কী দেখাব? ষোলো বছরের এত কিছু, আবার জুলাইয়ের এত কিছু-এটাকে কীভাবে সাজাব? স্ট্রাকচারটা কী হবে? এটা ছিল একটা মেজর কিউরেটোরিয়াল ডিসিশন। এসময় আমাদের রিসার্চাররা নিয়মিত মিটিংয়ে বসত। যাদের নাম আগে বলেছি, তাদের পাশাপাশি ড্যানিয়েল রহমানও থাকত অনেক মিটিংয়ে। আবদুল হালিম চঞ্চলও থাকত। অ্যাকচুয়ালি, এই মিউজিয়াম নিয়ে মূল গবেষকদলসহ আমরা কক্সবাজারে একটা ওয়ার্কশপও করেছিলাম। কোন রুমে কী থাকবে, কীভাবে রুম ভাগ হবে-এসব নিয়ে সেখানে কাজ করেছি। ওই ওয়ার্কশপেই একদিন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং আমাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়। ড্যানিয়েল সেই মিটিংয়েও ছিল। এর বাইরেও আরও অনেক মিটিংয়ে ছিল সে। মেইন বিল্ডিং নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন আমরা একটা বেসিক প্রিন্সিপাল ঠিক করলাম। আমি বললাম, দেখুন, আমরা একটা কাজ করি-নিচতলা হবে হাসিনা রেজিমের ষোলো বছরের পুরোটা, আর উপরতলা হবে মেইনলি জুলাই। তবে নিচতলায় একটা জায়গায় আমরা ব্যতিক্রম ঘটাব। তা হচ্ছে হাসিনার অফিস রুম। সেখানে আমরা জুলাইয়ের শহীদদের সবার ছবি রেখে দেব।

টেক্সট, রিসার্চ এবং আমার কাজের ধরন : পুরো মিউজিয়ামের টেক্সট সবচেয়ে বেশি লিখেছে হাসান রোবায়েত এবং কবি রুম্মানা জান্নাত। বাকিরাও অনেক সেকশনের টেক্সট ডেভেলপ করেছে। শুরুর দিকে আমি মুখে মুখে বলে দিতাম-কোন সাবজেক্টে কী থাকতে হবে, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে লিখতে হবে, কী কী তথ্য বা ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। ওরা আমার কথাগুলো অডিও রেকর্ড করে নিত। তারপর সেই অডিও থেকে নিজের মতো করে একটা টেক্সট দাঁড় করাত।

এরপর আবার সেটা আমার কাছে আসত। আমি বসে বসে লাইন ধরে এডিট করতাম। কোথাও কিছু যোগ করতাম, কোথাও কাটতাম, কোথাও ভাষা বদলাতাম, কোথাও আবার পুরো স্ট্রাকচার পালটে দিতাম। অর্থাৎ এখানে আমি শুধু মন্ত্রী বা আর্টিস্টিক ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করিনি। আমি আসলে রিসার্চারদের সঙ্গে প্রায় কর্মী পর্যায়ে নেমে কাজ করেছি। ওদের সঙ্গে বসে রিসার্চ করা, টেক্সট নিয়ে কাজ করা, একেকটা রুমের ন্যারেটিভ দাঁড় করানো-এ কাজগুলো করতে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি। (চলবে)

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী : বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, চলচ্চিত্র নির্মাতা

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম