সিলেট বিএনপিতে অস্বস্তি স্বতন্ত্র-বিকল্প প্রার্থীরা, দ্বিধাদ্বন্দ্বে মাঠের নেতাকর্মীরা
সংগ্রাম সিংহ, সিলেট
প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে স্বতন্ত্র ও বিকল্প প্রার্থী নিয়ে অস্বস্তিতে সিলেট বিএনপি। কয়েকটি আসনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ছাড়াও স্বতন্ত্র এবং বিকল্প প্রার্থী হিসেবে দলের একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকায় দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি, তৈরি হয়েছে চাপা সংকটও। দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন মাঠের কর্মী ও নেতারা।
মাঠের নেতারা চান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরের আগে স্বতন্ত্র, বিকল্প প্রার্থীর জট খুলে দেওয়ার। নতুবা ঐক্যবদ্ধ স্লোগানের বদলে বিভক্তির স্লোগানে প্রকম্পিত হতে পারে সিলেটের সমাবেশগুলো।
এদিকে যেসব আসনে বিএনপির বিকল্প বা স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন তারা ভোটের মাঠে এখনই আনুষ্ঠানিক প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তা, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অবস্থানের কারণে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন না পেলেও মাঠে তাদের অনেকেরই অবস্থান অত্যন্ত সৃদৃঢ়। এমনকি অনেক আসনে তাদের ইশারা ছাড়া এক পা-ও বাড়ান না তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। অথচ আনুষ্ঠানিক প্রার্থীর আহ্বান বরাবরই এড়িয়ে যাচ্ছেন নানান অজুহাতে।
দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রার্থী হওয়া বিদ্রোহী নেতাদের শিগগিরই ঢাকায় ডাকা হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝানোর চেষ্টা করবেন দলের শীর্ষ নেতারা। দল ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হবে। তাতেও কাজ না হলে সাংগঠনিক কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে।
সিলেট বিভাগে তিনটি আসনে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ছাড়াও বিকল্প প্রার্থী রেখেছে বিএনপি; যা সাংগঠনিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিলেট-৬ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সদস্য ফয়সল আহমদ চৌধুরী মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এবারও তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিকল্প প্রার্থী করা হয়েছে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলকে। যিনি এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হতে এহেন কোনো উদ্যোগ নেই, যা তিনি নেননি। সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেল। যিনি তৃণমূলের একটি বড় অংশের সমর্থন পাওয়ার দাবি করছেন নির্বাচন প্রস্তুতির শুরু থেকেই।
এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত প্রার্থী বিএনপিরই দাপুটে নেতা শেখ সুজাত মিয়া। ভোটের মাঠে তার শক্ত অবস্থানের কারণে এ আসনে ধানের শীষের বিজয় নিয়ে এখনই ভাবিয়ে তুলেছে দলের নেতাকর্মীদের। ড. রেজা কিবরিয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে হলেও স্থানীয় আওয়ামী সমর্থক ভোটাররা তার ওপর ক্ষ্যাপা দল ত্যাগ এবং আওয়ামী লীগ নিয়ে দফায় দফায় নেতিবাচক বক্তব্যের কারণে।
এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ড. রেজা কিবরিয়া। তখনো ধানের শীষ চেয়ে বঞ্চিত হয়েছিলেন শেখ সুজাত। এবারও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ সুজাত সিরিয়াস প্রার্থী। ফলে এ আসনে ভোটের সমীকরণ নিয়ে নানান জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনেও দ্বৈত সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এখানে বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন প্রচারণায় সক্রিয়। একই আসনে মনোনয়নবঞ্চিত নেতা দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন।
তিনি ২০১৮ সালেও নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বদ্বিতা করেছিলেন। সাবেক ছাত্রনেতা ও দীর্ঘদিনের স্থানীয় জনপ্রিয়তা নিয়ে মিজান মাঠে মরণ কামড় দিয়েছেন। ফলে এ আসনে ভোটের ভাগাভাগি শুধু মিলন নয়, বিএনপির জন্যও নেতিবাচক সংকেত হতে পারে।
সিলেট-৫ আসনে সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপি এ আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মনোনয়ন প্রত্যাশী, জেলা বিএনপির প্রথম সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন (চাকসু মামুন) বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকে ইতোমধ্যে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তাতে মামুন থমকে না গিয়ে আরও জ¦লে উঠেছেন। মামুনের কট্টর অবস্থানের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের সাবেক আলোচিত ছাত্রনেতা সিদ্দিকুর রহমান পাপলু এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন জনসভায় পাপলু দাবি করছেন, মামুন জামায়াতের এজেন্ট। আর মামুন বলছেন, কে কী বলল এসবে তিনি কান দেন না।
তার দাবি, এলাকার শতকরা ৯৯ শতাংশ বিএনপি নেতাকর্মী তারই সঙ্গে আছেন। বাকি এক শতাংশ তার বিরুদ্ধে গিয়ে তার জন্যই কাজ করছেন। বিরুদ্ধে গিয়েও কাজ করার সুযোগ থাকে। এদিকে বহিষ্কারের পরও মামুন দমে না যাওয়ায় ভাগে পাওয়া আসন নিয়ে টেনশনে জমিয়ত প্রধান মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।
এবার সিলেট বিএনপিতে বিকল্প ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইস্যুতে যেমন আলোচনা- সমালোচনা রয়েছে; অনেক এলাকায় তারা বিএনপির জন্য কৌশলগত সুবিধাও তৈরি করতে পারে এমন মতও অনেকের। দলের কেউ কেউ মনে করছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াবে। সংগঠনের কর্মীদের সক্রিয় রাখবে। তাতে মাঠে দলের অবস্থান শক্তিশালী হবে, তৃণমূলে মাঠ থাকবে বিএনপির দখলে। আবার অন্যরা বলছেন, দলের পুঁজির ভোটই যদি বিভক্ত হয়ে পড়ে তবে তা বিএনপি বিরোধীদের ভাগ্য খুলে দিতে পারে। আর নির্বাচনে দলে বিভক্তির কূফল দলে দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
অপরদিকে আগামী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা। বিএনপির এ প্রচারণা শুরু হবে সিলেট থেকে। এই লক্ষ্যে ২২ জানুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট আসার কথা। দুই পীরের মাজার জিয়ারত এবং আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভার পাশাপাশি বিভাগের চার জেলার কমপক্ষে একেকটি আসনের সমাবেশে তার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

-69612ac08ca2f.jpg)