জামায়াত এমপির উদ্যোগে কোটি টাকার ৭৯ পশু কুরবানি নিয়ে প্রশ্ন
তানজিমুল হক, রাজশাহী
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
জামায়াত এমপির উদ্যোগে কোটি টাকার ৭৯ পশু কুরবানির মাংস বিতরণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুলের উদ্যোগে কোটি টাকা মূল্যের ৬৫টি গরু এবং ১৪টি ছাগল কুরবানি দেওয়া হয়েছে। তুরস্কের একটি এনজিওর আর্থিক অনুদান নিয়ে কুরবানির জন্য এ গরু ও ছাগল কেনা হয়েছে বলে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি।
তবে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা বিদেশি এনজিওর অনুদানের অর্থ নিয়মনীতির মাধ্যমে যথার্থভাবে দেশে এসেছে কিনা- সেটি নিয়ে তুলেছেন প্রশ্ন।
তারা বলছেন, এমপি বুলবুল জামায়াতের এনজিও সাফা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অথবা ব্যক্তিগতভাবে বিদেশি অনুদান নিয়েছেন, সেটির প্রক্রিয়া কী- খতিয়ে দেখা দরকার।
তাদের অভিযোগ, কুরবানির মাংস তালিকা করে শুধুমাত্র জামায়াত সমর্থকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এজন্য তারা দীর্ঘ সময় নিয়ে তালিকা তৈরি করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের দরিদ্র মানুষকে মাংস দেওয়া হয়নি।
জামায়াতের স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এমপি বুলবুল তার নির্বাচনি এলাকাসহ পার্শ্ববর্তী আরও দুইটি উপজেলায় প্রায় চার হাজার মানুষের মাঝে দুই কেজি করে মাংস বিতরণ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের দিন সকাল থেকে শনিবার (৩০ মে) পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহ নেয়ামতউল্লাহ কলেজ মাঠ, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
তুরস্কের তুর্কি দানিয়েত ভাকফি নামের একটি এনজিওর আর্থিক অনুদানে ৬৫টি গরুর মধ্যে ৪৯টি গরু কুরবানি দেওয়া হয়েছে। আর বাকি ১৬টি গরু এবং ১৪টি ছাগল কিনতে এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকদের কাছে আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছেন বলে তিনি নিজেই গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে সাক্ষাৎকারে বলেছেন।
এসব আয়োজনে এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আমির আবু জার গিফারী, তুরস্কের এনজিও প্রতিনিধি ব্রাদার লোকমান সাইসহ স্থানীয় জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মাংস বিতরণ অনুষ্ঠানে এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা ত্যাগ ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। সেই জায়গা থেকেই মানুষের কল্যাণে এ ধরনের উদ্যোগ। এটি অব্যাহত থাকবে।’
এদিকে অন্য একটি দেশের প্রায় কোটি টাকা অনুদানে কুরবানির মাংস বিতরণ নিয়ে স্থানীয় বিএনপি এবং জামায়াতবিরোধী মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে নানান আলোচনা।
তবে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের মাঝে মাংস বিতরণ করা হয়েছে।
জামায়াতের স্থানীয় আয়োজকদের বক্তব্য, ত্যাগ এবং কুরবানির মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে স্থানীয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা গরু কেনা এবং তালিকা তৈরিতে ঈদের আগে কয়েক দিন ধরে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। গরু এবং ছাগলের মাংস প্যাকেটজাত করে প্রায় চার হাজার অসহায় ও নিম্নআয়ের পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, বিদেশি এনজিওর টাকা নিলে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন আছে। সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথভাবে এ অনুদান এসেছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। আর এ মাংস শুধুমাত্র জামায়াতের নেতাকর্মীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, তালিকা করে শুধুমাত্র জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চিহ্নিত করে মাংস বিতরণ করা হয়েছে। তারা (জামায়াত) দলমত না দেখে মাংস বিতরণের যে দাবি করছেন, সেটি সঠিক না। জামায়াতের মধ্যে যারা অসহায় ও দরিদ্র শুধু তাদেরই মাংস দেওয়া হয়েছে। এটা শতভাগ সঠিক। এ কথার মধ্যে কোনো ভেজাল নেই।
এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুলের দুইটি নম্বরে ফোন দেওয়া হয়। তিনি ফোন না ধরায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম বলেন, অনুদানের টাকা কিভাবে এসেছে সেটা বলতে পারব না। ঈদের আনন্দ থেকে কোনো পরিবার যেন বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই মাংস বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে মাংস বিতরণের যে অভিযোগ বিএনপির নেতারা করছেন- সেটি মিথ্যাচার। যারা দরিদ্র, কুরবানি দিতে পারেননি- তাদের মধ্যে মাংস বিতরণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত বা আওয়ামী লীগ আমরা বিবেচনা করিনি। সবার মধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই আমাদের এ প্রচেষ্টা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও এই আসনের সাবেক এমপি বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ বলেন, তুরস্কের অনুদান হতেই পারে না। সরকারের অনুমোদন ছাড়া দেশে অর্থ আসবে না। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার। কুরবানির গরু কিভাবে ডোনেশন হয়? এটি ব্যক্তির নামে হতে হবে।
তিনি বলেন, এমপি বুলবুল নির্বাচনে যে হলফনামা দিয়েছেন, তাতে নয় লাখ টাকা বার্ষিক আয়ের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ৬৫টি গরু ও ১৪টি ছাগলের দাম অন্তত কোটি টাকা। আর চার হাজার পরিবারকে যে মাংস দেওয়া হয়েছে বলা হচ্ছে- এটা সম্পূর্ণ জামায়াতের তালিকাভুক্ত কর্মী। সাধারণ গরিব দুস্থ মানুষ এর মধ্যে নেই।
এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের এমপি ও রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির ড. কেরামত আলীর উদ্যোগেও ২১টি গরু কুরবানি দেওয়া হয়েছে। গত ২৮ ও ২৯ মে শিবগঞ্জ ইসলামী একাডেমি প্রাঙ্গণে আড়াই হাজার পরিবারের মাঝে মাংস বিতরণ করা হয়েছে। এমপি কেরামতের ২১টি গরু কেনার অর্থের উৎস নিয়েও উঠেছে নানান প্রশ্ন।
