ইয়াবা পাচারে কোস্টার বাস, আটকের ৪ ঘণ্টা পর ডিবির তল্লাশি নাটক!
এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামে একটি যাত্রীবিহীন কোস্টার বাস থেকে দুই লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। বাসটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সবশেষ গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ডিবি উত্তর বিভাগের একটি টিম চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া ক্রসিং এলাকার একটি পেট্রোল পাম্প থেকে বাসটি আটক করে। সেখানেই বাস থেকে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। ইয়াবাগুলো গায়েব করতে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয় চালককে।
ঘটনার চার ঘণ্টা পর নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন এলাকায় ‘কথিত’ অস্থায়ী চেকপোস্ট দেখিয়ে মামলা করে ডিবি। যেখানে চার হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। ডিবির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এবং একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন এলাকায় চার হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মামলায় উল্লেখ করা হয়, গত ৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে কোতোয়ালী থানাধীন ফিরিঙ্গী বাজার থেকে নতুন ব্রিজগামী মেরিন ড্রাইভ রোডের আনসার ডিউটি শেডের বিপরীতে অস্থায়ী চেকপোষ্টে ওই কোস্টার বাসটিকে আটক করা হয়। এ সময় কৌশলে জানালা দিয়ে চালক পালিয়ে যায়।
পরে চালকের সিটের নিচ থেকে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা চার হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেয় সিএমপির ডিবি-উত্তর বিভাগের পুলিশ ইন্সপেক্টর আনছারুল করিম। পরবর্তীতে অভিযানে অংশ নেওয়া এসআই মো. শাহজাহান বাদি হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একই টিমের সদস্য উৎফল চক্রবর্তীকে। তিনিও অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম নগরীর কর্ণফুলী থানাধীন পটিয়া ক্রসিং এলাকায় অবস্থিত আমিন উল্লাহ ট্রেডিং করপোরেশন ফিলিং স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৬ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে ওই পেট্রোল পাম্পে চট্টগ্রামগামী দিক থেকে প্রবেশ করছে আলোচ্য কোস্টার বাসটি। একই সময়ে দ্রুত গতিতে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে ওই গাড়ির পাশে গিয়ে অবস্থান নেন এক ব্যক্তি। ৩ সেকেন্ডের মাথায় সেখানে হাজির হয় একটি কালো রংয়ের মাইক্রোবাস। সেটি পার্ক করা হয় বাসের বাম দিকে। এরমধ্যে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মূল সড়ক থেকে তিনজন গাড়ির দিকে হেঁটে যান। এ সময় কালো রংয়ের মাইক্রোবাস থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে দৌড়ে যান কোস্টার বাসের দিকে। রাত ১২ টা ৭ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে একই দিক থেকে ধূসর রংয়ের একটি মাইক্রোবাস এসে ওই বাসের ডান পাশে পার্ক করা হয়। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে ৬টি মোটরসাইকেল আসে। এভাবে ওই কোস্টার বাসকে ঘিরে প্রায় ১৭-১৮ জন ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যায়। সেখানে প্রায় সবার কাঁধেই ব্যাগ ছিল।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখা যায়, ১২টা ২৩ মিনিটে বাসের পেছনের অংশ খোলা হয়। এমনি বাসের নিচের অংশও খুলতে দেখা যায়। সেখান থেকে ব্যাগে করে কিছু একটা নিয়ে কালো মাইক্রোবাসে রেখে আসেন এক ব্যক্তি। আবার বাসের কাছে ছুটে গিয়ে পুনরায় ব্যাগে করে কিছু একটা এনে মাইক্রোবাসের পেছনের অংশে রাখেন তিনি। ১২টা ৪২ মিনিটে মাইক্রোবাসটি চালিয়ে পাম্পের মুখে ধূসর রংয়ের গাড়ির সামনে রাখা হয়। একই সময়ে কোস্টার বাসটি চালিয়ে এনে ধূসর রংয়ের গাড়ির সামনে রাখা হয়। ৩ মিনিট অবস্থানে পর বাসটি চট্টগ্রাম শহরের দিকে চলে আসে। রাত ১২টা ৫৩ মিনিটে বাসটি অতিক্রম করে শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজা। এর চার মিনিটের মধ্যে ১২টা ৫৭ মিনিটে টোল প্লাজা অতিক্রম করে ডিবির ব্যবহৃত ‘সিএমপি-১৩১’ নম্বর গাড়ি। তার পেছনেই ছিল কালো মাইক্রোবাসটি। তিনটি গাড়িই সরকারি গাড়ি পরিচয় দিয়ে টোলের ফি না দিয়ে শহরের দিকে যায়। এর আগে ওইদিন রাত ১১টা ৫৮ মিনিটে বাসটিকে পটিয়ার শাহ আমানত ফিলিং স্টেশনের সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে দেখা যায়। বাসটির পেছনে ডিবির ব্যবহৃত গাড়িটি এবং কালো মাইক্রোবাসটিকে ছুটে চলতে দেখা গেছে।
এদিকে মামলার এজাহারে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা দুই ব্যক্তির পরিচয় জানতে স্থানীয় অন্তত ১০ জন বাসিন্দা ও একাধিক দোকানদারের সঙ্গে কথা বলেও কেউ চিনেন না বলে জানিয়েছেন। স্থায়ী ঠিকানায়ও ওই নামের কাউকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া মোবাইল নম্বরগুলোও বন্ধ পাওয়া যায়।
ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদি এসআই মো. শাহজাহান বলেন, ‘এজাহারে ঘটনাটি যেভাবে উল্লেখ রয়েছে, তাই ঘটেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না।’
তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এসআই উৎপল চক্রবর্তী দাবি করেন, চেকপোস্ট বসানোর আগে ডিবির কোনো টিম শহরের বাইরে যায়নি। তবে পটিয়ার পেট্রোল পাম্পের ফুটেজে ডিবির ব্যবহৃত গাড়ির উপস্থিতি দেখানো হলে তিনি বলেন, ‘পাম্পে মিনিবাস থেকে কোনো ইয়াবা উদ্ধার হয়নি।’ তিনি দাবি করেন, মিনিবাসটি নিয়ে আসার সময় চালক পালিয়ে যান এবং নগরীর ঘটনাস্থল থেকে ৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
তবে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ ইন্সপেক্টর আনছারুল করিম যুগান্তরকে বলেন, ‘কোথায় আটক হয়েছে বা চেকপোস্ট কোথায় হয়েছে, সেটি জানার এখতেয়ার বিজ্ঞ আদালতের। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না।’
