পর্যটন মৌসুমে জমজমাট রাঙামাটি, কাটেনি অবকাঠামোর সংকট
Advertisement
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
কাপ্তাই হ্রদের পানিতে এখনো প্রায় ৮ ইঞ্চি তলিয়ে রয়েছে সেতুটি। চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা উপেক্ষা করে সেতুতে ওঠার চেষ্টা করছেন কিছু পর্যটক।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্ষা শেষে রাঙামাটিতে পুরোদমে শুরু হয়েছে পর্যটন মৌসুম, পাহাড়ি উপত্যকায় লেগেছে স্নিগ্ধতার ছোঁয়া। কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশি, পাহাড়ের সবুজ, ঝরনার কলতান ও মেঘের আনাগোনায় প্রকৃতিপ্রেমীদের হাতছানি দিচ্ছে পাহাড়ি এ জনপদ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটছেন রাঙামাটিতে। অনেকে যাচ্ছেন বাঘাইছড়ির মেঘের রাজ্য সাজেকেও। মৌসুমের শুরুতেই পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে মানুষের আনাগোনা।
তবে পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও এ খাতে রয়েছে নানা সংকট। অবকাঠামো, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। কয়েকটি বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। রাঙামাটি পর্যটন মোটেলে নতুন ভবন নির্মিত হলেও সুইমিংপুল, শিশুদের বিনোদন পার্ক, ক্যাবলকার, মানসম্মত ওয়াশরুম ও নিরাপদ নৌঘাটের মতো সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশসংক্রান্ত কঠোর নীতিমালার কারণেও সম্ভাবনাময় এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কঠোর নীতিমালার কারণে আগ্রহ থাকলেও অনেকে রাঙামাটি ভ্রমণ করতে পারেন না বলে জানান পর্যটনসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নীতিমালা সহজ করা গেলে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়তে পারে।
রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী ঝুলন্ত সেতুটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। তবে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে সেতুটি এখনো প্রায় ৮ ইঞ্চি পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। এ কারণে সেতুতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরপরও কিছু পর্যটক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সেতুতে ওঠার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে পর্যটন কর্তৃপক্ষ। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হচ্ছে।
তবে সেতু ঘিরে পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স এলাকায় পর্যটকদের ভিড় কমেনি। পলওয়েল পার্ক, আরণ্যক, কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণ, সুবলং ঝরনা, পেদা টিংটিং, চাংপাং ও বরগাঙসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও বাড়ছে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। বর্ষার কারণে ঝরনাগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। পাহাড়, হ্রদ ও মেঘের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকরা।
পর্যটক বাড়ায় স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। বোটচালক, হস্তশিল্প বিক্রেতা এবং হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক মাসের মন্দার পর এখন বুকিং বাড়ছে। স্থানীয় তাঁতশিল্প, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও খাবারের প্রতিও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব রাঙামাটির (টোয়ার) সভাপতি ও গর্বা সংস্থার স্বত্বাধিকারী মো. বাদশা ফয়সাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাঙামাটির পর্যটনের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও সে অনুযায়ী নতুন আকর্ষণ গড়ে ওঠেনি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সঠিক পরিকল্পনা ও সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অনেকেই এগোতে পারছেন না। দীর্ঘদিনেও ঝুলন্ত সেতু ছাড়া উল্লেখযোগ্য নতুন আকর্ষণ গড়ে ওঠেনি।
তিনি বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিদ্যমান নীতিমালা সহজ করা, কাপ্তাই হ্রদ খনন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শহরের প্রবেশমুখের ময়লার ভাগাড় অপসারণ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান।
রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, রাঙামাটিতে পর্যটন খাতে সরকারি উদ্যোগ একেবারেই নেই, এমন নয়। বর্তমানে জেলা পরিষদের সহায়তায় রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সে কিছু সংস্কারকাজ চলছে। তবে বরাদ্দের কারণে আপাতত কাজ বন্ধ রয়েছে। সুইমিংপুল, ক্যাবলকারসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বড় কয়েকটি সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাঙামাটি সদরে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ‘অ্যাক্সক্লুসিভ পর্যটন জোন’ প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পর্যটন বোর্ডের ৬৩০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০২২ সালে একটি দল রাঙামাটি পরিদর্শন করলেও পরে এর অগ্রগতি জানা যায়নি।
এছাড়া রাঙামাটি সদরে ‘লুসাই পাহাড়ে পর্যটন উন্নয়ন’ নামে তিন কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরুর কথা থাকলেও সেখানে দৃশ্যমান কাজ না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ ভুয়া বিলের মাধ্যমে উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। তবে প্রকল্পটি বাতিল হয়নি এবং চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কান্তি দেওয়ান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কাপ্তাই হ্রদ, পাহাড়, ঝরনা ও পাহাড়ি সংস্কৃতিকে ঘিরে রাঙামাটিতে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, হ্রদের নাব্যতা ও পরিবেশ রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং আধুনিক পর্যটনসেবা নিশ্চিত করা গেলে এ সম্ভাবনা আরও বিকশিত হতে পারে।

-6abf656f88429.jpg)