কারাগারে থেকেও সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি, ওসির দাবি ‘টাইপ মিসটেক’
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম
ভুক্তভোগী হাফিজুর রহমান।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘটনার সময় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারেই ছিলেন তানোরের কলমা ইউনিয়নের চন্দনকোঠা গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে হাফিজুর রহমান (৪০)। তবে তানোর থানা-পুলিশ তাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলার এজাহারে ৯ নম্বর আসামি করেছে। এজাহারে পুলিশ দাবি করেছে, মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের সময় অন্যদের সঙ্গে হাফিজুরও উপস্থিত ছিলেন।
যদিও শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে তানোর থানার ওসি দাবি করেছেন, বিষয়টি টাইপ মিসটেক হতে পারে। তবে ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, এলাকার এক যুবদল নেতার কারসাজিতেই কারাগারে থাকা হাফিজুরকে সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি করা হয়েছে।
হাফিজুরের পরিবার ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার বাবা নুরুল ইসলাম এক দশক আগে আওয়ামী লীগ করতেন। ওই সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় দীর্ঘদিন তিনি রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। কয়েক মাস আগে নুরুল ইসলাম মারা যান। তার ছেলে হাফিজুর চুলের ব্যবসা করেন। চন্দনকোঠা বটতলা মোড়ে তার চুল কেনাবেচার দোকান রয়েছে।
এদিকে গত ৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় যুবদলকর্মী ইমরান আলী হাফিজুরের দোকানে গিয়ে চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ইমরান দলবল নিয়ে হাফিজুরের দোকানটি ভাঙচুর করেন। তাকে বেদম মারধর করা হয়। ওই সময় খবর পেয়ে তানোর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
আহত হাফিজুরকে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে পুলিশ চলে যায়। কিছুটা সুস্থ হয়ে হাফিজুর যুবদলকর্মী ইমরানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে তানোর থানায় একটি অভিযোগ দেন। কিন্তু পুলিশ হাফিজুরের অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করেনি।
এদিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর তানোর থানা-পুলিশের একটি দল গভীর রাতে হাফিজুরের বাড়ির দরজা ভেঙে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ওই দিনই তাকে গত ২৬ জুন দায়ের হওয়া একটি রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। হাফিজুর ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি না হওয়ায় কয়েক দিন আগে আদালত থেকে জামিন পান।
মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে তানোরের পাগলা দেওয়ান সড়কে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি মিছিল হয়। পুলিশের দাবি, ওই মিছিলের সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
পরদিন শুক্রবার বিকালে তানোর থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। এই মামলায় হাফিজুরকে ৯ নম্বর আসামি করা হয়।
পুলিশের মামলায় ঘটনার সময় উল্লেখ করা হয়েছে রাত ৮টা ১০ মিনিট। মামলায় আরও দাবি করা হয়েছে, আসামিরা মিছিল করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন এবং রাষ্ট্র ও জনগণের জানমাল হুমকির মুখে ফেলেছেন। অন্য আসামিদের সঙ্গে হাফিজুরও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার ফৌজিয়া আক্তার ববি জানান, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে শতাধিক আসামি কারাগার থেকে মুক্তি পান। রাত ৯টার দিকে শেষ ব্যাচে হাফিজুরসহ রাজনৈতিক মামলার ছয় আসামি মুক্তির অপেক্ষায় তার কক্ষেই ছিলেন। হাফিজুরসহ ছয় আসামির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে বেশ কিছুটা বেশি সময় লাগে। এ প্রক্রিয়া কারা কর্তৃপক্ষকে সম্পন্ন করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, হাফিজুর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন, এটা নিশ্চিত। তিনি রাত সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে মুক্তি পেয়ে থাকতে পারেন। সিসিটিভি ফুটেজে মুক্তির সময় রয়েছে। এ ছাড়া রেজিস্টার খাতায় আসামির স্বাক্ষর ও সময় উল্লেখ আছে।
এদিকে শনিবার দুপুরে হাফিজুরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পুলিশ বাদী হয়ে আগের দিন রাত ৮টার ঘটনায় তাকে ৯ নম্বর আসামি করেছে। তিনি বলেন, আমি নাকি ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। অথচ ওই দিন রাত ঠিক ৯টা ৪৭ মিনিটে আমি কারাফটক দিয়ে বেরিয়ে আসি। পুলিশ চাইলে কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখতে পারে। ঘটনার সময়ও আমি কারাগারের ভেতরেই ছিলাম। তাহলে মিছিলে অংশ নিলাম কখন, কীভাবে?
হাফিজুরের আরও দাবি, যুবদল নেতা ইমরানই পুলিশকে ভুল বুঝিয়ে তার নাম এজাহারে তুলে দিয়েছেন। একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। চাঁদা না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই এসব করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কারাগারে থাকা একজন আসামি কীভাবে ৩৫ কিলোমিটার দূরের ঘটনাস্থলে মিছিলে অংশ নিলেন— জানতে চাইলে তানোর থানার ওসি মাহমুদুল হাসান বলেন, পুলিশের কাছে ভুল তথ্য আসতে পারে, আবার টাইপ মিসটেকও হতে পারে। তদন্তে যদি প্রমাণ হয় হাফিজুর ঘটনার সময় কারাগারে ছিলেন, তাহলে চার্জশিটে তার নাম বাদ যাবে।
অন্যদিকে গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মির্জা আব্দুল সালাম বলেন, বিষয়টি কীভাবে ঘটেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে কেউ উপস্থিত না থাকলে তার নাম এজাহারে থাকার কথা নয়। কীভাবে এমনটি ঘটেছে, তা তারা তদন্ত করে দেখছেন।
চাঁদা না পেয়ে হাফিজুরকে মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন যুবদলকর্মী ইমরান আলী। তিনি দাবি করেন, পুলিশ কেন তার কথায় মামলা দেবে? এই অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি হাফিজুরের দোকানে গিয়ে চাঁদা চাননি।

-6ad371b825534.jpg)
-6ad3712ab10ff.jpg)