ফুসফুসের যক্ষ্মা: কতটা ছোঁয়াচে, কখন বাড়ে সংক্রমণের ঝুঁকি
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস (টিবি) এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংক্রামক রোগ। এটি প্রতিরোধযোগ্য এবং নিরাময়যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন। ফুসফুসের যক্ষ্মা শুধু একজন রোগীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হলে পরিবার ও কাছের মানুষদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গেছেন। একই বছরে বিশ্বের মোট নতুন যক্ষ্মা রোগীর প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বাংলাদেশের ছিল। সবচেয়ে বেশি যক্ষ্মা রোগী রয়েছে এমন আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
যক্ষ্মা কীভাবে ছড়ায়?
ফুসফুসের সক্রিয় যক্ষ্মা মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি, কথা বলা, হাসা বা থুতু ফেলার সময় বাতাসে যক্ষ্মার জীবাণু ছড়াতে পারেন। কাছাকাছি অবস্থানকারী অন্য ব্যক্তি সেই জীবাণুযুক্ত বাতাস শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারেন।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলেই সবাই ছোঁয়াচে নন। সাধারণত সক্রিয় ফুসফুসের যক্ষ্মা, বিশেষ করে জীবাণু বাতাসে ছড়ানোর মতো অবস্থায় থাকা রোগীরাই অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। শরীরে যক্ষ্মার জীবাণু থাকলেও যদি সুপ্ত যক্ষ্মা সংক্রমণ থাকে এবং সক্রিয় রোগ না থাকে, সাধারণত সেই ব্যক্তি অন্যকে সংক্রমিত করেন না।
যক্ষ্মা কতটা ছোঁয়াচে?
এটি সাধারণ সর্দি-কাশির মতো অত্যন্ত দ্রুত ছড়ানো রোগ নয়। সংক্রমণের ঝুঁকি মূলত নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে কতক্ষণ, কতটা কাছাকাছি এবং কী ধরনের বদ্ধ বা অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলকারী পরিবেশে থাকা হচ্ছে তার ওপর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাবিহীন সক্রিয় যক্ষ্মা রোগী এক বছরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন। তবে এটি একটি আনুমানিক জনস্বাস্থ্য পরিসংখ্যান। প্রত্যেক রোগী ঠিক এতজনকে সংক্রমিত করবেন—এমন নয়।
কাশি হলেই কি যক্ষ্মা?
না। দীর্ঘদিনের কাশি মানেই যক্ষ্মা নয়। হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসনালির বাধাজনিত রোগ, ব্রঙ্কিয়েকটেসিস, দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস, পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে আসা বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স রোগ এবং ফুসফুসের ক্যানসারসহ অনেক রোগে দীর্ঘস্থায়ী কাশি হতে পারে।
তবে দীর্ঘদিনের কাশি, ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, রাতে ঘাম, ক্ষুধামন্দা বা কফে রক্ত থাকলে যক্ষ্মাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রোগের কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে যক্ষ্মার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ থাকলে বা রোগী যদি ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করেন, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কীভাবে যক্ষ্মা শনাক্ত করা হয়?
সন্দেহ হলে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বুকের এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানের পাশাপাশি কফভিত্তিক আণবিক পরীক্ষা করা হতে পারে। এর মধ্যে দ্রুত আণবিক রোগনির্ণয় পরীক্ষা, জিনএক্সপার্ট, এএফবি অণুবীক্ষণ পরীক্ষা এবং জীবাণু কালচার উল্লেখযোগ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে যক্ষ্মার উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত আণবিক রোগনির্ণয় পরীক্ষাকে প্রাথমিক রোগনির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে সুপারিশ করে।
বাংলাদেশেও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার জন্য জাতীয় নির্দেশিকা ও কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশিকা রয়েছে।
যক্ষ্মা নিয়ে ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
যক্ষ্মা একটি ছোঁয়াচে রোগ, কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য এবং নিরাময়যোগ্য। তাই যক্ষ্মা রোগীকে লুকিয়ে রাখা বা সামাজিকভাবে বয়কট করা কোনো সমাধান নয়।
বরং দীর্ঘদিনের কাশি বা যক্ষ্মার সন্দেহজনক উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং রোগ শনাক্ত হলে সম্পূর্ণ চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি এমন দেশে ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, অপুষ্টি, ডায়াবেটিস এবং রোগ শনাক্তকরণে দেরি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ২০২৪ সালে যক্ষ্মার প্রকোপ ছিল প্রতি ১ লাখে প্রায় ২০১ জন, যা বৈশ্বিক ১৩১ জনের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশও এই অঞ্চলের যক্ষ্মার উচ্চ প্রকোপের দেশগুলোর একটি।
তাই দীর্ঘদিনের কাশিকে অবহেলা নয়। যক্ষ্মা হলে ভয় নয়, দ্রুত শনাক্তকরণ ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


