লিভার ক্যান্সার কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে; এটি কি প্রতিরোধ করা যায়?
Advertisement
অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম
অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বব্যাপী অক্টোবর মাস কে ‘লিভার ক্যান্সার সচেতনতা মাস’ হিসাবে পালন করা হয়। এই মাসে লিভার ক্যান্সার ও এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তার বিষয়ে জনসচেতনতা ও শিক্ষা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই মাসের লক্ষ্য হলো মানুষকে লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারন হেপাটাইটিস বি ও সি এবং মেটাবলিক সিনড্রোম, মদ্যপান ও ওজনআধিক্যের মতো ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে অবহিত করা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণকে উৎসাহিত করা এবং লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধে গনসচেতনতা সৃষ্টি ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারার প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।
লিভার ক্যান্সার বর্তমানে বিশ্বে ৫ম সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার এবং ৩য় প্রধান ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর কারণ। বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে লিভার ক্যান্সারের প্রকোপ। হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণ এবং ফ্যাটি লিভার রোগের ক্রমবর্ধমান হার বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে এক বড় উদ্বেগ। চিকিৎসকরা মনে করেন, লিভার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু চিকিৎসার ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিরোধ, সচেতনতা ও প্রাথমিক পর্যায় শনাক্তকরণই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ লাখ মানুষ লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, আর প্রাণ হারান ৮ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পূর্বাভাস দিচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এক মিলিয়নেরও বেশি মৃত্যু হতে পারে লিভার ক্যান্সারে, আর ২০৪০ সালের মধ্যে এর বোঝা ৫৬.৪% বাড়বে। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৭৫% লিভার ক্যান্সারের ঘটনা ঘটছে এশিয়ায়, যার প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা (HCC) দায়ী।বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এই ক্যান্সার উপসর্গ বিহীন থাকে, যা এই ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
লিভার ক্যান্সার বাংলাদেশ পরিপেক্ষিত
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি প্রবণতা প্রায় ৫.৫% এবং হেপাটাইটিস সি প্রায় ০.৬% । ধারনা করা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত । হেপাটাইটিস বি আক্রান্তের ২০% থেকে ২৫% এর রোগের বিভিন্ন পর্যায়ে লিভার সিরোসিস হয় । আক্রান্তদের ১০%-১৫% এর লিভার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া বাংলাদেশে মেটাবোলিক ডিসফাংশন এসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (MAFLD) আক্রান্ত ৪% থেকে ৩৪% এর থেকে ম্যাশ (MASH) জনিত লিভার সিরোসিস হয়, এর থেকে লিভার ক্যান্সার হয়ে থাকে, যার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে । লিভার ক্যান্সার বাংলাদেশে ক্যান্সার জনিত মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ ।
রোগের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী
লিভার ক্যান্সারের মূল ঝুঁকি হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণ (প্রায়৭০% থেকে ৮০%)। এর পাশাশাশি মেটাবোলিক ডিসফাংশন এসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (MAFLD) জনিত লিভার সিরোসিস উল্লেখযোগ্য প্রধান কারণ, যার প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধিপাচ্ছে। ডায়াবেটিস, ওজন আধিক্য, ডিসলিপিডেমিয়ার প্রধান কারণ। এছাড়া মদ্যপান জনিত লিভার রোগ অন্যতম কারণ। তাছাড়া যেকোনো কারণে লিভার সিরোসিস হলে তার থেকে প্রাইমারী লিভার ক্যান্সার (HCC) হতে পারে ।
শনাক্তকরণ ও ডায়াগনস্টিক টুলস
• আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ও আলফা ফেটোপ্রোটিন (AFP) টেস্ট দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ সম্ভব ।
• প্রয়োজনে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করে ।
• রোগীর ফলাফলের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ইমেজিং, এফ,এন,এ,সি ও বায়োপসি প্রয়োজন হতে পারে ।
চিকিৎসার পদ্ধতি
• আরোগ্য লাভকারী চিকিৎসা (সার্জারি ): লিভার রিসেকশন ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট: যা নির্বাচিত রোগীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ফলপ্রসূ হয় । তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে জটিল অবস্থার কারনে সম্ভব হয়না ।
• লোকাল থেরাপি: : লিভার রিসেকশন ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্ভব না হলে, অন্য চিকিৎসা যেমন TACE, TARE, RFA ও MWA—রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয় । এই সকল পদ্ধতি ক্যান্সারের পরিমান (লোড) কমানো এবং লিভার রিসেকশন ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্ভব করার জন্য ডাউন স্টেজিং এবং ব্রিজিং থেরাপি প্রয়োগ করা হয়, যা কার্যকরী ব্যবস্থা হিসাবে গন্য করা হয় ।
• সিস্টেমিক থেরাপি: টার্গেটেড থেরাপি (Sorafenib, Lenvatinib ইত্যাদি) ও ইমিউনোথেরাপি (Nivolumab, Atezolizumab+Bevacizumab) বর্তমানে চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ।
• সহায়ক চিকিৎসা: পুষ্টি সংরক্ষণ, ওজন নিয়ন্ত্রন ও জীবনমান উন্নয়ন সমানভাবে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ।
লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায়
• হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করুন। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ।
• হেপাটাইটিস বি এর টিকা নিন: সব নবজাতক (জন্মের সময় প্রথম ডোজ/ বার্থডোজ), সকল শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা ।
• হেপাটাইটিস সি থেকে রক্ষা পেতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিন (এই ভাইরাসের জন্য এখনো কোনো টিকা নেই) ।
• হেপাটাইটিস বি ও সি-এর চিকিৎসা করান (হেপাটাইটিস সি-এর জন্য সম্পূর্ণ আরগ্য সম্ভব) ।
• মদ্যপান সীমিত করুন বা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন ।
• সুস্থ ওজন বজায় রাখুন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন, এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করুন (ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ)।
• ধূমপান এড়িয়ে চলুন; এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় ।
• টক্সিনের সংস্পর্শ সীমিত করুন: যেমন আফলাটক্সিন (কিছু খাদ্যে পাওয়া যায়) ।
• উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের পরীক্ষা ও চিকিৎসা করান: যাদের দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ, MAFLD, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ও ডিসলিপিডেমিয়া রয়েছে ।
• হেপাটাইটিস বি ও সি, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর পরিবারের প্রত্যেক সদস্য, স্বামী-স্ত্রী এবং যাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন সবারই হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করানো উচিত।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬০% লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য, যদি ভাইরাল হেপাটাইটিস, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং মেটাবলিক ডিসফাংশন-সংযুক্ত স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD)-এর মতো ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে নিরূপন ও যথোপযুক্ত চিকিৎসা, লিভার ক্যান্সার নিয়ে দীর্গদিন বেচে থাকার প্রধান উপায়। আসুন এই “লিভার ক্যান্সার সচেতনতা মাসে” নিজে লিভার ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন হই এবং পরিবার ও সকলকে সচেতন করি। তাই এখনই প্রতিরোধ থেকে আধুনিক চিকিৎসা পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করাই হতে পারে হাজারো প্রাণ রক্ষার উপায়।
লেখক: অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী
মহাসচিব, ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
