কতদিন পরপর ‘ইমারজেন্সি পিল’ খেলে নিরাপদ? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা বলছে
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এড়াতে অনেক নারী জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি বা ‘ইমারজেন্সি পিল’ ব্যবহার করেন। তবে একবার পিল খাওয়ার পর কত দিন বিরতি দিতে হবে, একই মাসে দুবার খেলে কোনো ক্ষতি হবে কি না কিংবা ঘন ঘন সেবনে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের ক্ষমতা কমে যায় কি না— এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসের (এসিওজি) তথ্য অনুযায়ী, জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি একই মাসিক চক্রে একাধিকবার ব্যবহার করা যায়। এ ক্ষেত্রে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো নির্দিষ্ট বিরতির নিয়ম নেই। তবে বারবার ব্যবহারে মাসিকের অনিয়মসহ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে। তাই এটিকে নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কত দিন পরপর পিল খাওয়া যাবে?
জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৭ দিন, ১৫ দিন বা এক মাসের বিরতি বাধ্যতামূলক—এমন কোনো সাধারণ চিকিৎসাবিধি নেই। অনিরাপদ যৌনমিলনের পর আবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রয়োজনে একই মাসিক চক্রে পুনরায় জরুরি গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা যায়।
তবে কোন বড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ির প্রচলিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে লেভোনরজেস্ট্রেল ও ইউলিপ্রিস্টাল অ্যাসিটেট। এ দুই ধরনের বড়ির ব্যবহারের সময়সীমা এবং পরবর্তী হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শুরুর নিয়ম এক নয়। তাই পুনরায় পিল নেওয়ার আগে বড়ির নাম ও উপাদান যাচাই করে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
২০২৫ সালে প্রকাশিত জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ির পুনর্ব্যবহার নিয়ে একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে, একই মাসিক চক্রে একাধিকবার ব্যবহারে সামগ্রিকভাবে নতুন কোনো নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে গবেষণার সংখ্যা সীমিত এবং প্রমাণের নিশ্চয়তা কম। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঘন ঘন ব্যবহারের সব ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায়নি।
ঘন ঘন খেলে কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে?
জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি ব্যবহারের পর সবার একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় না। কারও ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা যায় না। আবার কারও ক্ষেত্রে সাময়িক কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
মাসিক নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে হওয়া।
মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে সামান্য রক্তপাত বা স্পটিং।
বমিভাব কিংবা বমি।
মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা ক্লান্তি।
পেটে অস্বস্তি কিংবা তলপেটে ব্যথা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত মৃদু ও সাময়িক। তবে ঘন ঘন জরুরি পিল ব্যবহারে মাসিকের অনিয়ম বেশি হতে পারে। অনিয়মিত রক্তপাত দীর্ঘস্থায়ী হলে, তীব্র তলপেটব্যথা হলে কিংবা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পিল খেলে কি ভবিষ্যতে মা হতে সমস্যা হয়?
জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি নিয়ে প্রচলিত উদ্বেগগুলোর একটি হলো, বারবার সেবনে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে কি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতা নষ্ট করে— এমন প্রমাণ নেই। বড়ি ব্যবহারের পরও প্রজননক্ষমতা দ্রুত ফিরে আসতে পারে।
অর্থাৎ, জরুরি পিল খাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে বন্ধ্যত্ব হবে— এমন দাবি বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সমর্থিত নয়। তবে পিল খাওয়ার পর মাসিকের সময় পরিবর্তিত হতে পারে। মাসিক দেরি হলে শুধু পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভেবে বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়; গর্ভধারণের সম্ভাবনাও যাচাই করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এসিওজিও জানিয়েছে, জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি ব্যবহারের পরবর্তী মাসিক প্রত্যাশিত সময়ের এক সপ্তাহের বেশি দেরি হলে গর্ভধারণ পরীক্ষা করা উচিত।
অনিরাপদ যৌনমিলনের কতক্ষণ পর পিল খেতে হবে?
জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সময় গুরুত্বপূর্ণ। অনিরাপদ যৌনমিলনের পর যত দ্রুত সম্ভব এটি গ্রহণ করা উচিত। বড়ির ধরন অনুযায়ী ব্যবহারের সময়সীমায় পার্থক্য রয়েছে।
লেভোনরজেস্ট্রেলযুক্ত বড়ি সাধারণত যৌনমিলনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, ইউলিপ্রিস্টাল অ্যাসিটেটযুক্ত বড়ি ১২০ ঘণ্টা বা পাঁচ দিনের মধ্যে নেওয়া যায়। তবে সময় যত গড়ায়, বিশেষ করে লেভোনরজেস্ট্রেলের ক্ষেত্রে, কার্যকারিতা কমতে পারে। তাই দেরি না করে উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেওয়া জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জরুরি গর্ভনিরোধের আরেকটি পদ্ধতি হলো কপার আইইউডি। অনিরাপদ যৌনমিলনের পাঁচ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে এটি স্থাপন করা হলে গর্ভধারণ প্রতিরোধে এর কার্যকারিতা ৯৯ শতাংশের বেশি। এটি পরবর্তী সময়েও দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
একবার পিল খেলে কি পরবর্তী যৌনমিলনেও সুরক্ষা পাওয়া যায়?
জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি খাওয়ার পর একই মাসিক চক্রে পরবর্তী সময়ে আবার অনিরাপদ যৌনমিলন হলে নতুন করে গর্ভধারণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ, এই বড়ি মূলত ডিম্বস্ফোটন বিলম্বিত বা প্রতিরোধ করে কাজ করে; এটি ভবিষ্যতের সব যৌনমিলনের জন্য স্থায়ী সুরক্ষা দেয় না।
তাই জরুরি পিল খাওয়ার পরও গর্ভধারণ এড়াতে পরবর্তী যৌনমিলনে উপযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কনডম, নিয়মিত গর্ভনিরোধক বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট বা আইইউডির মতো পদ্ধতি বিবেচনা করা যায়।
তবে ইউলিপ্রিস্টাল অ্যাসিটেটযুক্ত জরুরি পিল নেওয়ার পর হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কখন শুরু করতে হবে, সে বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। তাই বড়ির ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে?
জরুরি পিল নেওয়ার পর মাসিক প্রত্যাশিত সময়ের এক সপ্তাহের বেশি দেরি হলে গর্ভধারণ পরীক্ষা করা উচিত। সর্বশেষ অনিরাপদ যৌনমিলনের তিন সপ্তাহ পরও গর্ভধারণের বিষয়ে সন্দেহ থাকলে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এ ছাড়া তীব্র বা স্থায়ী তলপেটব্যথা, অস্বাভাবিক রক্তপাত কিংবা গর্ভধারণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। পিল খাওয়ার পরপরই বমি হলে আরেকটি ডোজ প্রয়োজন কি না, তা ওষুধের ধরন ও বমি হওয়ার সময়ের ওপর নির্ভর করে; এ বিষয়ে প্যাকেটের নির্দেশনা অনুসরণ করে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণই কেন ভালো বিকল্প?
জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির তুলনায় এটি কম নির্ভরযোগ্য হতে পারে এবং প্রতিবার ব্যবহারের পরও গর্ভধারণের কিছু ঝুঁকি থেকে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এসিওজি— উভয় সংস্থাই জরুরি পিল বারবার প্রয়োজন হলে নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছে। ব্যক্তির স্বাস্থ্য, প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী পদ্ধতি নির্বাচন করা উচিত।

-6ae2ec61f212f.jpg)