হাম সম্পর্কে ১০ জরুরি তথ্য, শিশুদের সুরক্ষায় যা জানা দরকার
ডা. মো. তালহা চৌধুরী
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হাম হলো মিসলস ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। হামকে অনেক সময় সাধারণ জ্বর ও শরীরে র্যাশ হিসেবে দেখা হলেও, এটি মোটেও নিরীহ রোগ নয়।
বিশেষ করে ছোট শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে হাম গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি অত্যন্ত সংক্রামক হলেও কার্যকর টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কীভাবে হাম ছড়ায়?
হাম মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা কথা বলার সময় ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে দেন। অন্য ব্যক্তি সেই বাতাস গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারেন।
আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে একই ঘরে থাকা, ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের সংস্পর্শে এলেও সংক্রমণ হতে পারে।
হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার পর উপসর্গ প্রকাশের আগেও অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। তাই শুধু র্যাশ দেখা দেওয়ার পর রোগীকে আলাদা করলেই সংক্রমণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা যায় না।
হামের ইনকিউবেশন পিরিয়ড কত?
ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর সাধারণত প্রায় ১০–১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। তবে সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
প্রথম দিকে অনেক সময় রোগীকে সাধারণ ভাইরাল জ্বরের রোগী মনে হতে পারে। কয়েক দিন পর মুখ ও শরীরে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ র্যাশ দেখা দিলে হামের সন্দেহ জোরালো হয়।
হামের প্রাথমিক লক্ষণ
হামের শুরুতে সাধারণত দেখা যায়—
•উচ্চমাত্রার জ্বর
•শুকনো কাশি
•নাক দিয়ে পানি পড়া
•চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া
•আলো সহ্য করতে কষ্ট হওয়া
•শরীর দুর্বল ও অবসন্ন লাগা
•ক্ষুধামন্দা
এরপর মুখ ও শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিতে শুরু করে।
কপলিক স্পটস—হামের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ
হামের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ হলো কপলিক স্পটস। এগুলো সাধারণত মুখের ভেতরে, বিশেষ করে গালের ভেতরের অংশে ছোট ছোট সাদা বা নীলচে-সাদা দাগ হিসেবে দেখা যায়। অনেক সময় ত্বকে র্যাশ ওঠার আগেই এগুলো দেখা দিতে পারে।
হামের র্যাশ কেমন হয়?
সাধারণত জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর মুখমণ্ডল বা চুলের গোড়ার দিক থেকে লালচে র্যাশ শুরু হয়। পরে তা ধীরে ধীরে ঘাড়, বুক, পিঠ, হাত-পা ও শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
র্যাশের সঙ্গে সাধারণত জ্বরও থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে র্যাশ ছড়ানোর সময় রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ মনে হতে পারে।
হাম কি শুধু শিশুদের হয়?
না। যেকোনো বয়সের ব্যক্তি হাম আক্রান্ত হতে পারেন যদি তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে বা তিনি পর্যাপ্ত টিকা না নিয়ে থাকেন। তবে শিশুদের মধ্যে, বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
হামের জটিলতা কী কী?
হামের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর সম্ভাব্য জটিলতা। বিশেষ করে ছোট শিশু ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে জটিলতার ঝুঁকি বেশি।
হামের কারণে হতে পারে—
১. নিউমোনিয়া
হামের অন্যতম গুরুতর জটিলতা হলো নিউমোনিয়া। শিশুর শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুক দেবে যাওয়া বা ঠোঁট নীলচে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
২. কানের সংক্রমণ
হামের পরে মধ্যকর্ণে সংক্রমণ হতে পারে এবং এর ফলে কানে ব্যথা বা শ্রবণশক্তির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩. ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
হামের সঙ্গে ডায়রিয়া হলে শিশুর শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বেরিয়ে যেতে পারে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এটি দ্রুত গুরুতর হতে পারে।
৪. অপুষ্টি
হামের সময় ক্ষুধামন্দা ও অসুস্থতার কারণে শিশুর খাবার গ্রহণ কমে যেতে পারে। আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
৫. এনসেফালাইটিস
অত্যন্ত বিরল হলেও হাম মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যাকে এনসেফালাইটিস বলা হয়। এতে খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ, অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব বা অচেতনতার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
৬. দীর্ঘমেয়াদি বিরল জটিলতা
হামের বহু বছর পর খুব বিরল ক্ষেত্রে ‘সুব্যাক্যুট স্ক্রেরোজিং প্যান-এনসেফালাইটিস’ (এসএসপিই) নামের একটি গুরুতর স্নায়বিক রোগ হতে পারে। এটি অত্যন্ত বিরল হলেও একবার হলে গুরুতর ও প্রগতিশীল হতে পারে।
হামের চিকিৎসা কী?
হামের জন্য সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো রুটিন অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগীর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।
চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো—
পর্যাপ্ত তরল:
শিশুকে বারবার পানি, দুধ, স্যুপ বা উপযুক্ত তরল খাবার দিতে হবে। ডায়রিয়া থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওআরএস দিতে হবে।
পুষ্টিকর খাবার:
শিশু খেতে পারলে স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যেতে হবে। অসুস্থতার সময় খাবার সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত নয়।
জ্বরের চিকিৎসা:
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত জ্বরের ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভিটামিন এ:
হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ডাব্লিউএইচও ও অন্যান্য জনস্বাস্থ্য নির্দেশনায় ভিটামিন এ ব্যবহারের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের গুরুতর হাম বা অপুষ্টির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন এ দেওয়া যেতে পারে। ডোজ শিশুর বয়স ও চিকিৎসা নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।
অ্যান্টিবায়োটিক:
হাম ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় সাধারণ হাম চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। তবে ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ বা অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
হামে আক্রান্ত শিশুকে কি আলাদা রাখতে হবে?
অবশ্যই। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত শিশুকে স্কুল, মাদরাসা, ডে-কেয়ার বা অন্য কোনো জনসমাগমে পাঠানো উচিত নয়। পরিবারের অন্য শিশু ও টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে হবে।
বিশেষ করে বাড়িতে যদি কোনো ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি থাকেন, তাহলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
কখন দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে—
•শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
•খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া
•বুক দেবে যাওয়া
•শিশু পানি বা দুধ খেতে না পারা
•বারবার বমি
•তীব্র ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতার লক্ষণ
•অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব
•খিঁচুনি
•অচেতন হয়ে যাওয়া
•ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া
•জ্বরের সঙ্গে শিশুর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হওয়া
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করবেন না।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। সময়মতো টিকা গ্রহণ, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে যথাযথভাবে আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে হামের সংক্রমণ ও জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
লেখক
ডা. মো. তালহা চৌধুরী
কনসালটেন্ট, ফ্যামিলি মেডিসিন
চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬৭৮৮২২৮২২

-6aeb2a6fe01ec.jpg)
-6aec7ca43f93a.jpg)
-6ae9d241d982c.jpg)